বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
MENU
#
সাভার কমিউনিটি সেন্টারে ৪ মাসে ৫ খুন, সিসিটিভি ফুটেজ দেখে খুনি আটক
daily-fulki

সাভার কমিউনিটি সেন্টারে ৪ মাসে ৫ খুন, সিসিটিভি ফুটেজ দেখে খুনি আটক


স্টাফ রিপোর্টার : সাভার পৌর কমিউনিটি সেন্টারে একের পর এক লাশ উদ্ধারের ঘটনায় যখন পুরো এলাকা আতঙ্কে থমকে গেছে, ঠিক তখনই তাৎক্ষণিক অভিযানে রহস্যের জট খুলে দিল পুলিশ। ভবঘুরের ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়ানো এক নীরব ঘাতক-মশিউর রহমান খান সম্রাট ওরফে ‘সাইকো সম্রাট’-কে রবিবার বিকেল সাড়ে ৩ টায় আটক করেছে সাভার মডেল থানা পুলিশ।


এরআগে রোববার (১৮ জানুয়ারী) দুপুরে পরিত্যক্ত ভবনটির একটি কক্ষে সদ্য পোড়া দুটির লাশ পড়ে থাকার খবর পায় পুলিশ। বিকালে সিআইডির ফরেনসিক টিমের সদস্যরা এসে আলামত সংগ্রহের পর পুলিশ লাশ দুটো উদ্ধার করে।


প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সাভার সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের সামনে এই কমিউনিটি সেন্টারটি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। তারপর থেকে ভবনটি পরিত্যক্ত।


রোববার দুপুরের দিকে এক শিক্ষার্থী ভবনের ভেতরে প্রবেশ করলে পোড়া মরদেহ দেখতে পেয়ে জরুরিসেবা ৯৯৯ নাম্বারে ফোন দেন।


খবর পেয়ে ঢাকা জেলা উত্তর গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যরা ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। আলামত সংগ্রহ করেন সিআইডির ফরেনসিক টিম।


সিআইডি ক্রাইম সিনের এসআই কামরুল ইসলাম বলেন, “একটি লাশ সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে। আরেকটি লাশ বোঝা যাচ্ছে যে ১৫ বছরের কোনো মেয়ের। সম্পূর্ণ পুড়ে যাওয়া লাশটির বয়সও ২২ থেকে ২৫ বছর হবে। সেটিও কোনো নারীর লাশ হতে পারে।


ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাভার মডেল থানার এসআই মো. সাখাওয়াত ইমতিয়াজ বলেন, ধারণা করা হচ্ছে যাদের হত্যা করা হয়েছে তারাও মানসিক ভারসাম্যহীন। ভবনটির নিচেই তারা থাকতো।


সাভার মডেল থানার পরিদর্শক (অপারেশন) হেলাল উদ্দিন বলেন, দুর্বৃত্তরা এমনভাবে লাশগুলোকে পুড়িয়ে হত্যা করে যে তাদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। এরআগে একই ভবন থেকে আরও তিনটি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। একজনেরও পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।


এ নিয়ে গত ৪ মাসে এই ভবনটি থেকে উদ্ধার করা হয়েছে পাঁচটি লাশ। তবে কোনো লাশেরই পরিচয় শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ।


রবিবার (১৮ জানুয়ারি) দুপুরে কমিউনিটি সেন্টারের দ্বিতীয় তলা থেকে নতুন করে জোড়া লাশ উদ্ধারের পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তদন্ত শুরু করে। প্রথম দেখায় যাকে দেখে কেউই সন্দেহ করবে না-সেই ভবঘুরে বেশে ঘুরে বেড়ানো সম্রাটই যে একের পর এক ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডগুলোর পেছনের মূল হোতা, তা ছিল কল্পনারও বাইরে। কিন্তু স্থানীয় এক সাংবাদিকের আগের দিনের করা একটি ভিডিও ও হত্যাকাণ্ডের দিনের একটি সিসিটিভি ফুটেজই বদলে দেয় সবকিছু।


সম্রাট সাভার থানার আশপাশে বেশ কয়েক বছর ধরে ঘোরাফেরা করেন। সে ভবঘুরে হলেও ‘সিরিয়াল কিলার’ হতে পারে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ভবনের সামনে লাগানো সিসি ক্যামেরার ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করে তাকে আটক করা হয়েছে।


এরআগে গত বছরের ১৯ ডিসেম্বর দুপুরে পরিত্যক্ত এই ভবনের দ্বিতীয় তলার টয়লেটের ভেতর থেকে মরদেহ উদ্ধার করে সাভার মডেল থানা পুলিশ।


১১ অক্টোবর রাতে উদ্ধার করা হয় অজ্ঞাত (৩০) এক নারীর অর্ধনগ্ন গলিত মরদেহ। এছাড়া ২৯ অগাস্ট রাতে একই স্থান থেকে হাত-পা বাঁধা অজ্ঞাত এক যুবকের অর্ধ গলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল।
পুলিশ সূত্র জানায়, একটি ভিডিও ও কমিউনিটি সেন্টারের আশপাশের একটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে সন্দেহজনকভাবে এক ব্যক্তিকে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। তার চলাফেরা, সময় ও অবস্থান মিলিয়ে তদন্তকারীদের সন্দেহ গিয়ে পড়ে ওই ভবঘুরে ব্যক্তির দিকেই। এরপরই তাৎক্ষণিকভাবে অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করা হয়। আটক ব্যক্তি মশিউর রহমান খান সম্রাট ওরফে ‘সাইকো সম্রাট’।
পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে একই জায়গায় রবিবারের দু’টি হত্যাকাণ্ড, পূর্বের পৃথক তিনটিসহ মোট পাঁচটি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে সে। বর্তমানে তাকে থানায় রেখে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। সোমবার (১৯ জানুয়ারী) তাকে আদালতে নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশের একটি সূত্র।


একটি দায়িত্বশীল পুলিশ সূত্র জানায়, “লাশ উদ্ধারের পরপরই আমরা দ্রুত ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করি। ফুটেজ বিশ্লেষণ করেই সন্দেহভাজনকে শনাক্ত করা হয় এবং দুই ঘণ্টার মধ্যেই তাকে আটক করা সম্ভব হয়।”


এলাকাবাসী জানায়, সম্রাটকে সবাই ভবঘুরে হিসেবেই চিনত। কখনো রাস্তায়, কখনো কমিউনিটি সেন্টারের আশপাশে ঘোরাঘুরি করত। তার মধ্যে যে এমন ভয়ংকর নৃশংসতা লুকিয়ে আছে, তা কেউ কল্পনাও করেনি।


একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “প্রতিদিন যাকে দেখি রাস্তায় হাটাহাটি করতে, চুপচাপ বসে থাকতে, কখনো বিড়বিড় করে কথা বলতে, সেই লোক যে একের পর এক মানুষ হত্যা করেছে-এটা ভাবতেই গা শিউরে উঠছে।”


পরপর লাশ উদ্ধারের ঘটনায় যখন সাভারজুড়ে আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠা চরমে, তখন পুলিশের দ্রুত ও সাহসী অভিযানে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন এলাকাবাসী। তারা দাবি জানিয়েছেন-এই নৃশংস খুনির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।


এ ব্যাপারে সাভার মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আরমান আলী বলেন, “ঘটনাটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও নৃশংস। লাশ উদ্ধারের সঙ্গে সঙ্গেই আমরা সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ শুরু করি। ফুটেজ ও পারিপার্শ্বিক তথ্যের ভিত্তিতে সন্দেহভাজনকে শনাক্ত করে দ্রুত আটক করা সম্ভব হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে একাধিক হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। আমরা বিষয়টি গভীরভাবে তদন্ত করছি এবং আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাকে সর্বোচ্চ শাস্তির আওতায় আনা হবে।”


সাভার পৌর কমিউনিটি সেন্টারটি একসময় ছিল আনন্দ ও মিলনের ঠিকানা, সেই জায়গাই এখন সাক্ষী রইল একের পর এক ৫টি নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিভীষিকা।
 

সর্বাধিক পঠিত