মাসুম বাদশাহ, (সিংগাইর, মানিকগঞ্জ) প্রতিনিধি : মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলায় পল্লী বিদ্যুতের ট্রান্সফরমার চুরি উদ্বেগজনক আকার ধারণ করেছে। ২০২৫ সালে উপজেলাজুড়ে বিভিন্ন ক্ষমতার মোট ৬১টি ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি দিবাগত রাতে উপজেলার ধল্লা এলাকায় ট্রান্সফরমার চুরি করতে গিয়ে ঘটনাস্থলেই এক চোরের মৃত্যু হয়।
পুলিশ জানায়, নিহত ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকায় প্রথমে ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত করতে সমস্যা হয়। পরে পরিবারের সদস্যরা লাশ শনাক্ত করেন। নিহতের নাম মিনহাজ উদ্দিন (৩২)। তিনি ময়মনসিংহ জেলার গৌরীপুর থানার বাঙ্গুর হাটি গ্রামের অসীম উদ্দিনের ছেলে।
পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রতিটি ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনায় থানায় এফআইআর দায়ের করা হয়েছে। তবে এসব চুরির কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন পল্লী বিদ্যুতের গ্রাহকরা, বিশেষ করে প্রান্তিক ও শেষ প্রান্তের গ্রাহকরা।
পল্লী বিদ্যুৎ অফিস সূত্রে জানা যায়, আবাসিক গ্রাহকদের ক্ষেত্রে প্রথমবার ট্রান্সফরমার চুরি হলে অর্ধেক ভর্তুকি দেওয়া হয়। কিন্তু সেচ গ্রাহকদের পুরো অর্থই বহন করতে হয়। এতে কৃষক ও সেচনির্ভর গ্রাহকরা মারাত্মক আর্থিক চাপের মুখে পড়ছেন।
ধল্লা ইউনিয়নের মেদুলিয়া গ্রামের সেচ গ্রাহক মো. মাসুম মিয়া জানান, তার চুরি হওয়া ৫ কেভিএ ট্রান্সফরমারের মূল্য ধরা হয়েছে ৫৭ হাজার টাকা, যা পরিশোধ করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। এতে বোরো ধান চাষ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন তিনি। ভাকুম গ্রামের আরেক গ্রাহক মো. আমিনুর রহমান জানান, টানা তিনবার সেচের ট্রান্সফরমার চুরি হওয়ায় প্রায় তিন লাখ টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে।
ভুক্তভোগী গ্রাহকদের অভিযোগ, পল্লী বিদ্যুৎ সংশ্লিষ্ট কেউ জড়িত না থাকলে এভাবে একের পর এক ট্রান্সফরমার চুরি সম্ভব নয়।
তবে এ অভিযোগ নাকচ করে সিংগাইর পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের ডিজিএম গোলাম রাব্বানী বলেন, দক্ষ ইলেকট্রিশিয়ান বা বাইরের কেউ এই চুরির সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে, তবে পল্লী বিদ্যুতের কোনো কর্মচারীর পক্ষে এ কাজ করা সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, তার দীর্ঘ চাকরি জীবনে এ এলাকায় এত বেশি ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনা আগে দেখেননি। চুরি রোধে ধল্লা ও জামির্তা এলাকায় মাইকিং কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
সিংগাইর পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের এজিএম দেবব্রত ভৌমিক জানান, গত বছর চুরি হওয়া ৬১টি ট্রান্সফরমারের ঘটনায় থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে ভুক্তভোগী গ্রাহকদের নাম-ঠিকানা জানতে চাইলে তিনি বলেন, অফিসিয়ালি আবেদন করলে প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া হবে।
অন্যদিকে থানা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, তাদের রেকর্ড অনুযায়ী ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনায় মাত্র দুটি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে একটি ধল্লা এলাকায় ইত্যাদি অনুষ্ঠানের উপস্থাপক হানিফ সংকেতের বাসার ট্রান্সফরমার চুরি এবং অপরটি কাশিমনগরের একটি ঘটনা।
এ বিষয়ে সিংগাইর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. মাজহারুল ইসলাম বলেন, তিনি সম্প্রতি থানায় যোগদান করেছেন। এই সময়ে যে কয়টি অভিযোগ পাওয়া গেছে, তার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। শীতকালের ঘন কুয়াশার সুযোগ নিচ্ছে চোরেরা। পুলিশ তৎপর রয়েছে এবং কুয়াশা কমলে চুরির ঘটনাও কমবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
ক্রমবর্ধমান ট্রান্সফরমার চুরির এই ঘটনা এখন শুধু বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘ্নই নয়, বরং জননিরাপত্তা ও আর্থিক ক্ষতির বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
