ফুলকি ডেস্ক : পবিত্র শবে মেরাজের রাতে মহান আল্লাহ তায়ালার হুকুমে আল্লাহর প্রিয় নবী ও রসুল হজরত মুহাম্মদ (সা.) আরশে আজিম পর্যন্ত ঊর্ধ্বলোক গমনের সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন। এ সময় তিনি মহান আল্লাহ রব্বুল আলামিনের দিদার লাভ করেন এবং আল্লাহর কাছ থেকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের বিধান নিয়ে একই রাতে আবার দুনিয়াতে ফিরে আসেন। এ কারণেই রাতটি মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র।
মুসলমানরা এ মহিমান্বিত রাতটি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত, নফল নামাজ আদায়, জিকির-আসকার, দোয়া-দরুদ ও ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে পালন করবেন।
শবে বরাতের নফল নামাজ ও ইবাদত: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, এ রাতে নফল ইবাদত করবে ও দিনে রোজা পালন করবে। (ইবনে মাজাহ)। ইবাদতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলো নামাজ; সুতরাং নফল ইবাদতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলো নফল নামাজ। প্রতিটি নফল ইবাদতের জন্য তাজা অজু বা নতুন অজু করা মোস্তাহাব।
বিশেষ ইবাদতের জন্য গোসল করাও মোস্তাহাব। ইবাদতের জন্য দিন অপেক্ষা রাত শ্রেয়তর।
হজরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেছেন, এ রাত যখন আসে, তখন তোমরা এ রাতটি ইবাদত-বন্দেগিতে কাটাও এবং দিনের বেলায় রোজা রাখো; কেন না, এদিন সূর্যাস্তের পর আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার আসমানে নেমে আসেন এবং আহ্বান করেন; কোনো ক্ষমাপ্রার্থী আছ কি? আমি ক্ষমা করব; কোনো রিজিকপ্রার্থী আছ কি? আমি রিজিক দেব; আছ কি কোনো বিপদগ্রস্ত? আমি উদ্ধার করব। এভাবে ভোর পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা মানুষের বিভিন্ন প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করে আহ্বান করতে থাকেন।
(ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৩৮৪)।
শবে মেরাজ ও এর রোজা সম্পর্কে কোরআন-হাদিস কী বলে?
মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তাআলা কোরআনুল কারিমে শবে মেরাজ বা লাইলাতুল মেরাজ সম্পর্কে ইরশাদ করেন, سُبۡحٰنَ الَّذِیۡۤ اَسۡرٰی بِعَبۡدِهٖ لَیۡلًا مِّنَ الۡمَسۡجِدِ الۡحَرَامِ اِلَی الۡمَسۡجِدِ الۡاَقۡصَا الَّذِیۡ بٰرَكۡنَا حَوۡلَهٗ لِنُرِیَهٗ مِنۡ اٰیٰتِنَا ؕ اِنَّهٗ هُوَ السَّمِیۡعُ الۡبَصِیۡرُ
অর্থ: ‘পরম পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা তিনি, যিনি স্বীয় বান্দাকে রাত্রি বেলায় ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যান্ত-যার চার দিকে আমি পর্যাপ্ত বরকত দান করেছি যাতে আমি তাঁকে কুদরতের কিছু নিদর্শন দেখিয়ে দেই। নিশ্চয়ই তিনি পরম শ্রবণকারী ও দর্শনশীল। (সূরা: বনি ইসরাইল, আয়াত: ১)
শবে মেরাজের বিশেষ কোনো রোজা বা নামাজ নেই। মেরাজের রাতে নফল নামাজ আদায় করা বা শবে মেরাজ উপলক্ষে রোজা রাখার বিশেষ কোনো ফজিলতের কথা গ্রহণযোগ্য সূত্রে বর্ণিত কোনো হাদিসে পাওয়া যায় না।
শবে মেরাজের নামাজ-রোজার ফজিলত সম্বলিত কিছু হাদিস প্রচার করা হয় যেগুলোর কোনো ভিত্তি নেই।
ইসরা ও মেরাজ বিশ্বনবী রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ও মুজিজা। এক রাতে রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে তাকে প্রথম মসজিদুল আকসায় নিয়ে যাওয়া হয়, মসজিদুল আকসা থেকে উর্ধ্বজগত ভ্রমণে নিয়ে যাওয়া হয়। মক্কা থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর রাতের ভ্রমণ ইসরা নামে এবং মসজিদুল আকসা বা বাইতুল মুকাদ্দাস থেকে উর্ধ্বাজগত ভ্রমণ মেরাজ নামে পরিচিত।
ইসরা ও মেরাজের রাতে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়াতাআলা তার প্রিয় হাবিব রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে তার কিছু বড় নিদর্শন দেখিয়েছিলেন এবং তাকে অনেক নেয়ামতও দান করেছিলেন। তাই এ রাতটি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর নবুয়্যতের জীবনে অত্যন্ত স্মরণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ রাত ছিল তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এ রাতটিকে বিশেষভাবে পালন করেছেন এ রকম কোনো প্রমাণ হাদিসে ও সাহাবিদের বক্তব্যে পাওয়া যায় না।
মেরাজের ঘটনা ঘটেছিল হিজরতের এক বা দেড় বছর আগে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর মক্কী জীবনে। এরপর তিনি আরো অন্তত ১ বছর মক্কায় ছিলেন। তারপর হিজরত করে মদিনায় যান এবং আরো ১০ বছর বেঁচে থাকেন। কিন্তু এ দীর্ঘ সময়ে তিনি নিজে মেরাজের রাতটির স্মরণে বিশেষ কোনো আমল করেছেন বা কাউকে বিশেষ কোনো আমল করতে বলেছেন বলে গ্রহণযোগ্য সূত্রে এ রকম কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না।
এমনকি সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈ বা তাবে-তাবেঈদের যুগেও মেরাজের রাতটিকে বিশেষভাবে পালন করার প্রচলন ছিল না।
আমাদের দেশে ২৬ রজব দিবাগত রাত বা ২৭ রজবের রাতটিকে ‘শবে মেরাজ’ হিসেবে পালন করা হয়। কিন্তু মেরাজের ঘটনা রজবের ২৭ তারিখে হয়েছিল-এ কথাও বিশুদ্ধ সূত্রে প্রমাণিত নয়। এই তারিখটি শুধু এমন একটি বর্ণনায় পাওয়া যায়, যার সনদ বিশুদ্ধ নয়।
মেরাজ কবে হয়েছিল সে সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য সনদে শুধু এটুকু পাওয়া যায় যে, তা হিজরতের এক বা দেড় বছর আগে সংঘটিত হয়েছিল। কিন্তু কোন দিন, মাস বা তারিখে সংঘটিত হয়েছে এ ব্যাপারে নির্ভরযোগ্য সূত্রে কিছুই নেই। তাই এই তারিখকে নিশ্চিতভাবে মেরাজের রাত হিসেবে ধরে নেওয়াও ঠিক নয়।
এ বিষয়ে আলেম ও ইসলামী বিশেষজ্ঞদের স্পষ্ট বক্তব্য হলো, ইসরা ও মিরাজের স্মরণে ইসলামে কোনো নির্দিষ্ট উৎসব, বিশেষ নামাজ বা রোজার বিধান নেই। কোরআন কিংবা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর সুন্নাহতে কোথাও এর আনুষ্ঠানিক পালনের নির্দেশ পাওয়া যায় না।
পরবর্তীকালে বিভিন্ন দেশে মুসলমানরা নিজেরা উদ্যোগ নিয়ে মিলাদ মাহফিল, আলোচনা সভা, কাসিদা বা কবিতা পাঠ, মিষ্টি বিতরণসহ নানা আয়োজন শুরু করেছেন। এগুলো মূলত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উদ্যোগ।
উল্লেখ্য, শবে মেরাজ নিঃসন্দেহে ইসলামের ইতিহাসে এক অনন্য ও বিস্ময়কর অধ্যায়। এ ঘটনা থেকে ঈমান দৃঢ় করা, নামাজের গুরুত্ব অনুধাবন করা এবং মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তাআলার কুদরতের প্রতি গভীর বিশ্বাস স্থাপন করাই একজন মুমিন মুসলমানের মূল করণীয়। তবে নির্দিষ্ট দিন ধরে উৎসব বা বিশেষ ইবাদত চালু করা ইসলামী শরিয়তের বাধ্যতামূলক অংশ নয়।
