মাসুম বাদশাহ, সিংগাইর (মানিকগঞ্জ) থেকে : শেরশাহ্ সূরির গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড উপমহাদেশের ইতিহাসে শাসন, শৃঙ্খলা ও পরিকল্পিত যোগাযোগ ব্যবস্থার এক উজ্জ্বল নিদর্শন। অথচ সেই ঐতিহাসিক পথের সঙ্গে সংযুক্ত হেমায়েতপুর-সিংগাইর-–মানিকগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়ক আজ পরিণত হয়েছে এক নীরব মৃত্যুফাঁদে। এখানে দুর্ঘটনা এখন আর ব্যতিক্রম নয়, বরং নিত্যদিনের বাস্তবতা। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে-এই রক্তাক্ত পরিস্থিতির পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের অবহেলা, ভুল পরিকল্পনা, দখলবাজি ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা।
মাত্র ২৪ ফুট প্রশস্ত দুই লেনের এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন চলাচল করছে হাজার হাজার যানবাহন। ভারী ট্রাক, বাস, সিএনজি, অটোবাইক, হ্যালো বাইক ও মোটরসাইকেল একই সড়কে একসঙ্গে চললেও নেই কোনো ডিভাইডার, ফুটপাত বা নির্ধারিত পথচারী পারাপারের ব্যবস্থা। ফলে মানুষ ও যানবাহনের চলাচল প্রায়ই মুখোমুখি সংঘর্ষে রূপ নিচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কয়েক বছর আগে সড়ক ও জনপথ বিভাগ (আরএইচডি) প্রায় ২৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে সড়কটির আংশিক প্রশস্তকরণ করলেও তা ছিল বাস্তব প্রয়োজনের তুলনায় সম্পূর্ণ অপ্রতুল। উপরন্তু ঢাকা–-আরিচা মহাসড়কের পাটুরিয়া ঘাটগামী ভারী যানবাহন দূরত্ব কমাতে এই পথ ব্যবহার শুরু করায় সড়কের ওপর চাপ কয়েকগুণ বেড়েছে। ভারী যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না থাকায় ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে।
এই অব্যবস্থাপনার ফল ভয়াবহভাবে ফুটে উঠেছে দুর্ঘটনার পরিসংখ্যানে। ১২ অক্টোবর ২০২৩ রাতে জয়মন্টপ এলাকায় মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে নিহত হন শাহিদুল ইসলাম (৩৫)। ৮ জানুয়ারি ২০২৪ সকালে ঋষিপাড়া এলাকায় বালুবোঝাই ড্রাম ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে একটি সিএনজি অটোরিকশা দুমড়ে-মুচড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান জসিম তালুকদার (৪৫), তাঁর পাঁচ বছরের নাতি ইয়াসিন এবং শাহীন মোল্যা (৪২)। ২১ আগস্ট ২০২৪ ভোররাতে ধল্লা ইউনিয়নের বিন্নাডাঙ্গী এলাকায় বাস ও ইটবোঝাই ট্রাকের সংঘর্ষে অন্তত ১২ জন আহত হন, যাদের মধ্যে তিনজন পরে ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। সর্বশেষ ১৫ মে ২০২৫ গাড়াদিয়া বাসস্ট্যান্ড এলাকায় দ্রুতগতির মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হয় ১৭ বছরের কিশোর আশিক মিয়া।
স্থানীয়দের দাবি, নথিভুক্ত এসব ঘটনার বাইরেও ২০২৫ সালেই এই সড়কে শতাধিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। অনেক দুর্ঘটনা থানায় নথিভুক্ত না হওয়ায় প্রকৃত চিত্র আরও ভয়াবহ। এসব ঘটনায় প্রাণহানির পাশাপাশি সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
দুর্ঘটনার পর উদ্ধার ব্যবস্থাও চরম ঝুঁকিপূর্ণ বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। সড়কের দক্ষিণ পাশে সেফটি স্লোপ বা ঢালাই সিঁড়ি না থাকায় খাদে পড়ে যাওয়া যানবাহন থেকে আহতদের উদ্ধার করতে গিয়ে উদ্ধারকারীদেরও জীবনের ঝুঁকি নিতে হচ্ছে।
আরও উদ্বেগজনক তথ্য হলো-সড়কের দক্ষিণ পাশে জেলা পরিষদের জমি লিজ দিয়ে গড়ে ওঠা দোকানপাট ও স্থাপনা। এসব স্থাপনা সড়কের দৃষ্টিসীমা মারাত্মকভাবে সংকুচিত করেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সড়ক ও জনপথ বিভাগের ‘রাইট অব ওয়ে’ নীতিমালা উপেক্ষা করেই এসব লিজ দেওয়া হয়েছে, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়েছে।
এ বিষয়ে মানিকগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. আব্দুল কাদের জিলানী বলেন, “এই লিজ বন্ধ হলে সড়ক উন্নয়ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের জন্য সহজ হবে। বিষয়টি জেলা পরিষদকে বারবার জানানো হয়েছে।”
জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদী হাসান বলেন, “জেলা পরিষদ একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। তবে কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, বিগত সরকার আমলে স্থানীয় সাবেক সংসদ সদস্য মমতাজ বেগম এই সড়ককে চার লেনে উন্নীত করার জন্য একাধিকবার চিঠি দিলেও তা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ‘লাল ফিতায়’ আটকে থাকে। ফলে প্রয়োজনীয় উন্নয়ন আর বাস্তবায়ন হয়নি।
একসময় যে গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড ছিল শাসন ও পরিকল্পনার প্রতীক, আজ সেই পথ ঘিরে মানুষের মুখে মুখে ফিরছে নির্মম ব্যঙ্গ- “কেউ যদি যেতে চাও নরকে, চালাও গাড়ি সিংগাইর সড়কে।”
সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনার ধারাবাহিকতা নয়; বরং পরিকল্পনাহীন সড়ক নকশা, ডিভাইডার ও ফুটপাতের অভাব, অবৈধ স্থাপনা এবং ভারী যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত চলাচলের ফল- যা একটি স্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার চিত্র তুলে ধরে।
তাঁদের মতে, দ্রুত চার লেনে উন্নীতকরণ, ডিভাইডার ও ফুটপাত নির্মাণ, ভারী যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ এবং অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ না হলে শেরশাহ্ সূরির ঐতিহাসিক পথ ভবিষ্যতেও শোকযাত্রার সঙ্গী হয়েই থাকবে।
