স্টাফ রিপোর্টার : ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ড এলাকা এখন কার্যত জনসাধারণের চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। মহাসড়কের দুই পাশের ফুটপাত ও সার্ভিস লেন দখল করে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ভাসমান দোকান। শুধু তাই নয়, সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ড এলাকার তিনটি ফুটওভার ব্রিজও অবৈধভাবে দখল করে সেখানে হকাররা দোকান বসিয়েছে। ফলে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
সাভার বাসস্ট্যান্ড এলাকা শুধু একটি যাতায়াত কেন্দ্রই নয়, এটি আশপাশের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের সংযোগস্থল। বিরুলিয়া রোড, চাপাইন রোড, বাজার রোডসহ ছোট বড় একাধিক শাখা সড়কের মুখে ভাসমান দোকান বসিয়ে রাখার কারণে সারাক্ষণ যানজট লেগেই থাকে।
সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এই এলাকায় স্বাভাবিকভাবে চলাচল করা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। অথচ পরিস্থিতি এতটাই নাজুক হলেও পৌরসভা বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো উচ্ছেদ অভিযান চোখে পড়ছে না।
সরজমিনে সাভার বাসস্ট্যান্ড এলাকা ঘুরে দেখা যায়, পূর্ব পাশে সাভার নিউ মার্কেটের সামনে থেকে শুরু করে আরএস টাওয়ার পর্যন্ত ফুটপাত ও মহাসড়কের ওপর কোথাও দুই লাইন, কোথাও আবার চার লাইনে ভাসমান দোকান বসানো হয়েছে। ফলশ্রুতিতে যানবাহনের জন্য নির্ধারিত লেন সংকুচিত হয়ে গেছে। এতে করে ছোটখাটো যানজট থেকে শুরু করে দীর্ঘ যানজট নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মহাসড়কের পশ্চিম পাশেও একই চিত্র। মনসুর মার্কেটের সামনে থেকে শুরু করে জাতীয় মাশরুম ইনস্টিটিউটের সামন পর্যন্ত ফুটপাত ও সার্ভিস লেন দখল করে বসানো হয়েছে অসংখ্য ভাসমান দোকান। সবজি, ফল, পোশাক, জুতা থেকে শুরু করে ভাসমান খাবারের দোকানে ঠাসা পুরো এলাকা। এতে করে পথচারীদের ফুটপাত ব্যবহার করার কোনো সুযোগ থাকছে না। বাধ্য হয়ে মানুষকে মহাসড়কের ওপর দিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে কয়েকগুণ।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক অবস্থা সাভার বাসস্ট্যান্ড এলাকার তিনটি ফুটওভার ব্রিজে। এসব ব্রিজ মানুষের নিরাপদ পারাপারের জন্য তৈরি হলেও বর্তমানে সেগুলো হকারদের দখলে। ব্রিজের ওপর দোকান বসানো থাকায় প্রতিনিয়ত মানুষের ভিড় লেগেই থাকে।
বিশেষ করে জাতীয় অন্ধ কল্যাণ সংস্থা মার্কেটের সামনের ফুটওভার ব্রিজের দুই পাশে সবচেয়ে বেশি যানজট দেখা যায়। ব্রিজে উঠতে ও নামতে গিয়ে মানুষকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়, যা শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য মারাত্মক কষ্টকর।
বিরুলিয়া রোডের দুই পাশে ভাসমান খাবারের দোকান, জুতা ও বিভিন্ন পণ্যের দোকান বসানো থাকায় এই সড়কে প্রায় সব সময় যানজট লেগে থাকে। একই অবস্থা চাপাইন রোড, বাজার রোড, চৌরঙ্গী মোড়, ইউসুফ টাওয়ার, দিলকুশা মার্কেট ও সাভার নিউ মার্কেটের সামনের এলাকায়।
অন্যদিকে মনসুর মার্কেটের সামনে, বাজার রোডের মুখ, রাজ্জাক প্লাজা ও সাভার সিটি সেন্টারের সামনেও যানজট যেন নিত্যসঙ্গী।
স্থানীয়দের মতে, এসব যানজটের মূল কারণ একটাই—ফুটপাত ও সার্ভিস লেন দখল করে অবৈধভাবে ভাসমান দোকান বসানো। নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান না থাকায় দিন দিন এই দখল আরও বিস্তৃত হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রভাব খাটিয়ে একটি চক্র প্রতিদিন ভাসমান দোকান থেকে মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায় করছে।
এই চাঁদাবাজির কারণে কোনো না কোনো অদৃশ্য শক্তির ছত্রছায়ায় হকাররা টিকে থাকছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও বিভিন্ন সময় হাইওয়ে থানা ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে উচ্ছেদ অভিযানের ঘোষণা দেওয়া হয়, তবে অজ্ঞাত কারণে সেসব অভিযান মাঝপথেই বন্ধ হয়ে যায়। কেউ কেউ অভিযোগ করেন, এই চাঁদার একটি অংশ প্রশাসনের কিছু অসাধু ব্যক্তির পকেটেও যায়। ফলে সাধারণ মানুষের এত দুর্ভোগের পরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে বিভিন্ন সময় সাংবাদিকরাও হেনস্তার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ফুটপাত দখল ও চাঁদাবাজি নিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে হকার ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের বাধার মুখে পড়তে হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মারমুখী আচরণও করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মাঝে মাঝে সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করতে গেলে হকার ও তাদের পৃষ্ঠপোষকরা সংঘবদ্ধভাবে তাদের ওপর চড়াও হন। এতে করে সাধারণ মানুষ ক্রমেই অসহায় হয়ে পড়ছে।
তারা মনে করেন, প্রশাসনের কঠোর ও নিয়মিত হস্তক্ষেপ ছাড়া এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।
সাভার বাসস্ট্যান্ড এলাকার সচেতন নাগরিকরা দ্রুত ফুটপাত ও সার্ভিস লেন দখলমুক্ত করা, ফুটওভার ব্রিজগুলো হকারমুক্ত করা এবং চাঁদাবাজ চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
তাদের মতে, সাভার একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও শিল্পাঞ্চল হওয়ায় এখানে সুশৃঙ্খল যান চলাচল নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় জনদুর্ভোগ আরও বাড়বে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকিও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।
