স্টাফ রিপোর্টার : গত বছরের জুলাই-আগস্টে গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে আন্দোলন ও পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে পুলিশের জনবল, অবকাঠামো, থানা, যানবাহন ও সরঞ্জামের বড় ধরনের ক্ষতি হয়। ফলে মাঠ পর্যায়ে পুলিশের কার্যক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে; আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে। নির্বাচনকেন্দ্রিক সার্বিক নিরাপত্তা জোরদার করতে পুলিশের জন্য বড় কেনাকাটার আয়োজন চলছে।
বিভিন্ন সরঞ্জাম কেনাকাটার প্রয়োজনে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে পুলিশের জন্য অতিরিক্ত এক হাজার ৪৭৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়ার সুপারিশ করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগে পাঠানো হয়েছে। মূল বাজেটে পুলিশের পরিচালন খাতে ১৩ হাজার ৮৯০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। সংশোধিত বাজেটে বরাদ্দ প্রায় ১১ শতাংশ বাড়িয়ে ১৫ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রস্তাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, বর্তমান বাস্তবতায় পুলিশের সক্ষমতা দ্রুত পুনরুদ্ধার না হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। জাতীয় নির্বাচন ও সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির কল্পে অতিরিক্ত বরাদ্দের বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনায় রেখেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। চলতি মাসের শেষ নাগাদ বরাদ্দ চূড়ান্ত হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে পুলিশ সদরদপ্তর জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত সরঞ্জাম পুনঃস্থাপন, আধুনিকায়ন এবং জনবল নিরাপত্তা জোরদারে নতুন করে যানবাহন, যোগাযোগ যন্ত্র, দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জাম, অস্ত্র ও সুরক্ষা সামগ্রী কেনা প্রয়োজন। মোট ৩৪টি অর্থনৈতিক কোডে বাড়তি বরাদ্দের প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ে এসেছে। থানা ও ইউনিট পর্যায়ে নতুন ডাবলকেবিন পিকআপ, প্রিজনার্স ভ্যান, মোটরসাইকেল, হেলমেট, টিয়ার শেল, ওয়্যারলেস সেট ও নজরদারি সরঞ্জাম কেনার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা জোরদারে বিশেষ সরঞ্জাম কেনার প্রস্তাব রয়েছে।
অর্থ বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের পূর্বশর্ত হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা। নির্বাচনের আগে ও পরে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের পাশাপাশি সাধারণ জনগণের জানমালের নিরাপত্তায় পুলিশের অপারেশনাল কার্যক্রমে গতি আনা প্রয়োজন। তাই অর্থ মন্ত্রণালয় এ খাতে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাব ইতিবাচকভাবে দেখছে। সম্প্রতি অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, নির্বাচন আয়োজনের জন্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখাসহ অন্যান্য খাতে প্রয়োজনীয় অর্থ দেওয়া হবে। এসব ক্ষেত্রে খরচের ব্যাপারে চিন্তা করার কিছু নেই।
মতামত জানতে চাইলে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মুহাম্মদ নুরুল হুদা বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কিনতে অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়া যেতে পারে। নিরাপত্তা খাতের বরাদ্দকে সরকারের সাধারণ খরচ না ভেবে বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে। তবে শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, বরং গোয়েন্দা কার্যক্রমের পাশাপাশি অর্পিত অন্যান্য দায়িত্ব পুলিশসহ সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে যথাযথভাবে পালন করতে হবে। এসব নিশ্চিত করা গেলেই দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকবে।
গাড়ি কেনায় অতিরিক্ত প্রয়োজন ৫৪৩ কোটি টাকা
চলতি অর্থবছরের বাজেটে পুলিশের গাড়ি কেনার বরাদ্দ রয়েছে ২৫৭ কোটি টাকা। তবে আসন্ন নির্বাচন ও এর পরবর্তী সময়ে সার্বিক নিরাপত্তায় আরও গাড়ি কেনা প্রয়োজন বলে মনে করছে পুলিশ সদরদপ্তর। ইতোমধ্যে ৯০ কোটি টাকায় ৪২২টি বিভিন্ন ধরনের মোটরযান কেনার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। আরও ৩৬৪টি ডাবল কেবিন পিকআপ কেনার বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টা সম্মতি দিয়েছেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ৫৬টি প্রিজনার্স ভ্যান এবং অকেজো ঘোষিত মোটরযানের বিপরীতে গাড়ি কেনার অনুমতি দিয়েছে। এসব কারণে এ খাতে অতিরিক্ত ৫৪৩ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।
জলযান কিনতে দ্বিগুণ বরাদ্দের প্রস্তাব
মূল বাজেটে পুলিশের জলযান কিনতে বরাদ্দ রয়েছে প্রায় ছয় কোটি ৯০ লাখ টাকা। ১০ বছরের বেশি পুরোনো ও অকেজো ঘোষিত জলযানের প্রতিস্থাপক হিসেবে প্রায় সাত কোটি টাকায় আটটি স্পিডবোট, তিনটি রেসকিউ বোট ও ১০টি কান্ট্রি বোট কেনার বিষয় প্রক্রিয়াধীন। তবে নৌ পুলিশের জন্য আরও ৩৪টি কান্ট্রি বোট কেনার জন্য বাড়তি ছয় কোটি ৮০ লাখ টাকা প্রয়োজন। তাই সব মিলিয়ে এ খাতে বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ করে ১৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
খুচরা যন্ত্রাংশ
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কোটাবিরোধী আন্দোলন ও পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ঘটনায় পুলিশের প্রায় ৫৫০ যানবাহন ভাঙচুর, প্রায় সাড়ে ৪০০ গাড়ি ভস্মীভূতসহ মোট এক হাজার গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ছাড়া পুলিশের গাড়িগুলো অনেক পুরোনো হওয়ায় যথাযথভাবে অপারেশন পরিচালনায় ঘন ঘন মেরামত ও যন্ত্রাংশ পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়। তাই এ খাতে বরাদ্দ ১৪৩ কোটি থেকে বাড়িয়ে ১৯৪ কোটি টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে।
সীমান্তবর্তী জেলায় বেতার যোগাযোগ
সীমান্তবর্তী জেলা চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, খাগড়াছড়ি, সিলেট, নওগাঁ, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট ও দিনাজপুরের বেতার যোগাযোগ সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন করা হচ্ছে। এর আওতায় ১৫০ থেকে ২০০ ফুট সেলফ সাপোর্টেড টাওয়ার স্থাপনের জন্য ৪৯১ কোটি থেকে বাড়িয়ে ৫০৬ কোটি টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
নিরাপত্তা সমগ্রী
অ্যান্টি রিয়াত হেলমেট ও বুলেটপ্রুভ বডি আর্মার ভেস্ট কেনার জন্য বাড়তি ৩৫ কোটি টাকা চাওয়া হয়েছে। পুলিশের অপারেশনের জন্য এ দুটি সরঞ্জাম খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া হ্যান্ডকাফ ও কয়েকটি কোডের আওতায় টিয়ার শেলসহ বিভিন্ন ধরনের নিরাপত্তা সমগ্রী কিনতে বাড়তি বরাদ্দের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।
ওয়্যারলেস ও বেতার সামগ্রী
ক্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ওয়্যারলেসের মাধ্যমে যোগাযোগের জন্য আনুমানিক ৪৮২টি সাব-কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হবে। এ জন্য পাইপ মাস্ট, মেইনটেন্যান্স ফি, ব্যাটারি, এসিপিএসইউ, ফিডার কেবল, ব্যাটারি চার্জারসহ প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ কেনাকাটার জন্য এ খাতে বরাদ্দ ১৪ কোটি থেকে বাড়িয়ে প্রায় ১৮ কোটি টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া ওয়াকিটকিসহ মোবাইল সেট কেনা বাবদ বরাদ্দ ৪৩ কোটি থেকে বাড়িয়ে ৬৫ কোটি টাকা করার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সরঞ্জাম
পুলিশের ডেটা সেন্টারের হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার, সিকিউরিটি ইকুইপমেন্টসহ এ ধরনের অন্যান্য কেনাকাটায় বাড়তি পাঁচ কোটি টাকা চাওয়া হয়েছে। এর আওতায় রয়েছে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর সিস্টেমের উন্নয়ন। এ ছাড়া কয়েকটি কোডে কম্পিউটার-সংক্রান্ত কেনাকাটায় অতিরিক্ত প্রায় ৭০ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে।
গোয়েন্দা কার্যক্রম বাড়ানো
মূল বাজেটে পুলিশের গোয়েন্দা কার্যক্রম খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩১০ কোটি টাকা। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালীন ও নির্বাচন-পরবর্তী আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এ খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে ৩৪১ কোটি টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। গোয়েন্দা কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে লুণ্ঠিত অস্ত্র-গোলাবারুদ ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও মানবাধিকার সুরক্ষা। পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বজায়, পুলিশের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করতে বিভিন্ন মহলের অপতৎপরতা প্রতিরোধ, সাইবার অপরাধ, বৈশ্বিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে অভ্যন্তরীণ সমস্যা মোকাবিলার পাশাপাশি প্রথাগত অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা নিয়মিত গোয়েন্দা কার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত।
এ ছাড়া প্রশিক্ষণ, ভ্রমণ ও যাতায়াত ব্যয়, পোশাক ক্রয়, চিকিৎসা ও শল্যচিকিৎসা, অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জামসহ নানা ধরনের কেনাকাটায় অতিরিক্ত প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছে পুলিশের সদরদপ্তর।
