৫০ বছরের অধিক হলো বাংলাদেশ এবং ভিয়েতনাম স্বাধীনতা অর্জন করেছে। বর্তমানে ভিয়েতনামের রপ্তানি আয় ৪০০
বিলিয়ন ডলারের অধিক। আর বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ৫০ বিলিয়ন ডলারের আশেপাশে ঘোরাঘুরি করছে। ভিয়েতনামের সফলতার পেছনে কারণ কী? কারণ হলো অর্থনৈতিক সংস্কার। ভিয়েতনাম ১৯৮৬ সালে 'ডয়ময়' অর্থনৈতিক সংস্কার করে। এ সংস্কারের মাধ্যমে ভিয়েতনামে রাতারাতি বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে। বেড়েছে রপ্তানি। অর্থনীতি হয়েছে বহুমুখী। অথচ বাংলাদেশে উলটো চিত্র দেখা গেছে । বাংলাদেশে বেড়েছে দুর্নীতি, বেড়েছে অর্থ পাচার । দিনে দিনে দেশের ঋণমান অবনমন হয়েছে । যার প্রভাব পড়েছে বিদেশি বিনিয়োগের ওপর। ভিয়েতনামে প্রতি বছর বিদেশি বিনিয়োগ আসে ২০ বিলিয়ন থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলার । আর বাংলাদেশে প্রতি বছর বিদেশি বিনিয়োগ আসে এক থেকে দেড় বিলিয়ন ডলার। উল্লেখ্য, ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত প্রতি বছর গড়ে ২৫ শতাংশ অর্থ (বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্ত মুনাফা) বিনিয়োগকারীরা বিদেশে নেয়। এখন এ হার বেড়ে দাঁড়ায় ৬৪ শতাংশ ।
সত্য যে সামষ্টিক অর্থনীতি এখন ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছে। এর অন্যতম কারণ হলো, অর্থনীতিতে বিনিয়োগ বাড়ছে না। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ প্রবাহ থেমে আছে। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি এখন ৬ দশমিক ৩৫ শতাংশে নেমে এসেছে। দেশি বিনিয়োগ না বাড়লে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে ১৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। আবার ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে। হ্যাঁ, বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে । কিন্তু প্রকৃত বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে কি না সেটা দেখতে হবে? আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, তিনটি উপকরণ বিদেশি বিনিয়োগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় (১) পুঁজি হিসেবে বিদেশ থাকা আনা অর্থ (২) দেশে বিদেশি কোম্পানিগুলো ব্যবসা করে অর্জিত মুনাফা বিদেশে না পাঠিয়ে পুনরায় বিনিয়োগ করে (৩) এক কোম্পানি থেকে অন্য কোম্পানি ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করে। এগুলোর সমন্বয়ে গ্রস বা মোট বিনিয়োগ বলে। এর মধ্যে প্রকৃত বিনিয়োগ হলো যে, পুঁজি হিসেবে বিদেশ থাকা আনা অর্থ অথবা ইক্যুইটি মূলধন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মোতাবেক, ২০২৪- ২৫ অর্থবছরে ইক্যুইটি মূলধন কমেছে ১৭ শতাংশ, পুনঃবিনিয়োগ (অর্জিত মুনাফা থেকে বিনিয়োগ) বেড়েছে ২৩ দশমিক ৩০ শতাংশ, আন্তঃকোম্পানি ঋণ বেড়েছে ১৮০ দশমিক ৬৬ শতাংশ । এ তথ্য থেকে বলা যায় যে, বাংলাদেশে প্রকৃত বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ছে না। কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করার জন্য গ্রস বা মোট বিদেশি বাড়লে হবে না, প্রকৃত বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
বিদেশি বিনিয়োগের জন্য যে পরিবেশ এবং যে নীতিমালা দরকার, বাংলাদেশে সেটা নেই। বাংলাদেশ তার সমকক্ষ অর্থনীতি এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো থেকে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে। ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে ভারতে বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে ১ দশমিক ৯ শতাংশ, বাংলাদেশে কমেছে ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ, নেপালে কমেছে ২৩ শতাংশ । আর এ সময়ে পাকিস্তানে বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে ২৫ দশমিক ৪ শতাংশ, মালদ্বীপে ৫ দশমিক ১ শতাংশ, শ্রীলংকায় ৬ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ভুটানে বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে ৬১৪ শতাংশ। পাকিস্তান, শ্রীলংকা, ভুটান বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে পারলেও বাংলাদেশে কেন বিদেশি বিনিয়োগ বাড়েনি? এর উত্তর অনেক সহজ। বিনিয়োগ ঝুঁকি এবং সহনশীলতা সূচকে বিশ্বের ২২৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৯৩তম। অর্থাৎ বাংলাদেশ সর্বোচ্চ বিনিয়োগ ঝুঁকির দেশে পরিণত হয়েছে। বৈশ্বিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান—হেনলি অ্যান্ড পার্টনার কর্তৃক প্রকাশিত “গ্লোবাল ইনভেস্টমেন্ট রিস্ক অ্যান্ড রেসিল্যান্স' সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান উঠে এসেছে। এ রিপোর্টে একটা দেশ বসবাস এবং বিনিয়োগের জন্য উপযোগী কি না সেটা উঠে আসে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এ সূচকে ভুটান এগিয়ে আছে । ২২৬ দেশের মধ্যে ভুটনের অবস্থান। এ কারণে ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে ভুটানে বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে ৬১৪ শতাংশ। দুঃখজনক যে, ‘গ্লোবাল ইনভেস্টমেন্ট রিস্ক অ্যান্ড রেসিল্যান্স' সূচকে আফ্রিকার দেশ উগান্ডা (১২২তম) থেকে বাংলাদেশ ( ১৯৩তম)
অনেক পিছিয়ে রয়েছে।
সত্য যে সামষ্টিক অর্থনীতি এখন ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছে । এর অন্যতম কারণ হলো, অর্থনীতিতে বিনিয়োগ বাড়ছে না । দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ প্ৰবাহ থেমে আছে । বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি এখন ৬ দশমিক ৩৫ শতাংশে নেমে এসেছে
২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশে যুক্তরাজ্যের বিদেশি বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি কমেছে ৪০ দশমিক ৭ শতাংশ, চীনের কমেছে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ, দক্ষিণ কোরিয়ার কমেছে ১২ দশমিক ৩ শতাংশ, ভারতের কমেছে ২০ দশমিক ৩ শতাংশ । অন্যদিকে একই সময়ে সিংগাপুরের বিনিয়োগে বেড়েছে ৭১ দশমিক ৬ শতাংশ এবং নেদারল্যান্ডের বেড়েছে ১ হাজার ৮৫৫ শতাংশ ।
বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে অন্তর্বর্তী সরকার নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে । এর অংশ হিসেবে এ বছরে ৫ কোটি টাকা ব্যয় করে বিনিয়োগ সম্মেলন এর আয়োজন করেছে। এ সম্মেলনে ৫০টি দেশ থেকে বিনিয়োগকারী এসেছিল । বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) প্রধান বলছে যে, ৩ হাজার ১০০ কোটি টাকার নতুন বিনিয়োগ আসবে। এছাড়াও, বিডা ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস'- এর সেবার খাত বাড়িয়েছে। এখন ১৪২টি সেবা দেওয়া হচ্ছে। উল্লেখ্য, বিডা সম্প্রতি 'ইনভেস্টমেন্ট ম্যাচমেকিং' পোর্টাল চালু করেছে। এটা ভালো উদ্যোগ । এ পোর্টাল স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সংযোগ স্থাপন করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে ।
উল্লেখ্য, বিনিয়োগ সম্মেলনে অনেক বিনিয়োগকারী বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু চিরন্তন সত্য যে, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা অন্তর্বর্তী সরকার এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় চূড়ান্ত বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে না । বিনিয়োগকারীরা সাধারণত একটা রাজনৈতিক সরকারের সঙ্গে বিনিয়োগ চুক্তি করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। অন্তর্বর্তী সরকার এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংস্কার কাজকে গুরুত্ব দেয়, যা ভবিষ্যতে অর্থনীতিকে প্রাণবন্ত করে তোলে । হ্যাঁ, বিডা যে সংস্কারকাজ করছে তার ফলাফল আসবে রাজনৈতিক সরকারের সময়। সংস্কার কাজের ফলাফল সঙ্গে সঙ্গে দেখা যায় না। বিনিয়োগ পরিবেশ সৃষ্টিতে এবং বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) দেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেপজা) এবং বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা), জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। এছাড়াও, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি, অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালকে এগিয়ে আসতে হবে। বেশি বেশি অর্থনৈতিক করিডোর, আঞ্চলিক সংযোগ স্থাপন বাড়াতে হবে । ভুটানের গেলেফু করিডোর ব্যবহার করে আঞ্চলিক সংযোগ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা বাড়ানো সম্ভব। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, নেদারল্যান্ড ভুটানের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বাড়াতে হবে । অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে গ্যাস, বিদ্যুৎ, উন্নয়ন অবকাঠামো, উন্নয়ন যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়াও, বাংলাদেশে ঘন ঘন নীতি পরিবর্তন হয়। এটা বিনিয়োগকারীরা ভালোভাবে নেয় না। বিগত কয়েক বছর ধরে আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী প্রতিষ্ঠান—মুডিস, ফিচ, এস অ্যান্ড পি গ্লোবাল বাংলাদেশের ক্রেডিট রেটিং অবনমন করছে, যা বিদেশি বিনিয়োগে প্রভাব পড়ছে । তবে বাংলাদেশ ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের কাতার থেকে উত্তরণ হয়ে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেলে, দেশের মর্যাদা বাড়বে। তখন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের ওপর আস্থা বাড়বে। প্রকৃত বিনিয়োগ বাড়ার সম্ভাবনা কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। একটা অর্থনীতিতে বিনিয়োগ বাড়লে উৎপাদন এবং কর্মসংস্থান বাড়ে । বিগত রাজনৈতিক সরকারের সময় বিদেশি বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান বাড়ানোর লক্ষ্যে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হয়েছে। এখন অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো বিদেশি বিনিয়োগ পাচ্ছে না । অর্থাৎ, অর্থনীতি গতিশীল হতে পারছে না। অর্থনীতি গতিশীল করতে প্রকৃত (ইক্যুইটি ক্যাপিটাল) বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। প্রশ্ন হলো ভিয়েতনামে অর্থনীতি গতিশীল করতে বিদেশি বিনিয়োগ যে ভূমিকা রেখেছে, বাংলাদেশে কি সেটা পেরেছে?
