রবিবার, ১১ জানুয়ারী ২০২৬
MENU
#
দলগুলোর প্রাথমিক প্রার্থী মনোনয়নে নারীরা উপেক্ষিত
daily-fulki

দলগুলোর প্রাথমিক প্রার্থী মনোনয়নে নারীরা উপেক্ষিত

স্টাফ রিপোর্টার : জুলাই জাতীয় সনদে সই করা রাজনৈতিক দলগুলো জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কমপক্ষে ৫ শতাংশ আসনে নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়ার অঙ্গীকার করলেও তা রক্ষা করছে না। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সংসদের ৩০০ আসনের জন্য নারী প্রার্থী রাখতে হবে অন্তত ১৫ জন। কিন্তু বিএনপির ঘোষণা করা প্রাথমিক মনোনয়ন তালিকার ২৭২ প্রার্থীর মধ্যে নারী মাত্র ১১ জন। জামায়াতে ইসলামী একজনও নারী প্রার্থী দেয়নি। অন্য যেসব দল সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করেছে, তারাও সনদ অনুযায়ী নারী প্রার্থী দেয়নি।

জুলাই সনদ প্রণয়নের সংলাপে ১৫ শতাংশ আসনে নারী প্রার্থী মনোনয়নের প্রস্তাব করা এনসিপি এখনও প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করেনি। দলটির প্রার্থী হতে আগ্রহী দেড় হাজার মনোনয়নপ্রত্যাশীর মধ্যে ৭৬ জন নারী। দলটি জানিয়েছে, চূড়ান্ত মনোনয়নে নারী প্রার্থী ৫ শতাংশের বেশি থাকবে। 
জুলাই সনদ প্রণয়নে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ করা জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের (বিলুপ্ত) সদস্য ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংস্কারে অঙ্গীকার রক্ষার নজির নেই। তাই কমিশন চেয়েছিল ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে নারীদের জন্য ১০০ আসন নিশ্চিত করতে। দলগুলোই তখন বলেছিল নারীদের সরাসরি নির্বাচনে অংশগ্রহণের পরিবেশ এখনও তৈরি হয়নি। তারাই প্রস্তাব দিয়ে ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়নের ‘জেন্টলম্যান অ্যাগ্রিমেন্ট’ করেছিল। যদি তারা তা রক্ষা না করে, তবে অঙ্গীকার ভঙ্গের সংস্কৃতিতেই আটকে থাকল বাংলাদেশ।


যা বলা হয়েছে জুলাই সনদে
সংবিধান সংস্কার এবং নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে সংসদের আসন ৪০০ করার প্রস্তাব করেছিল। সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব ছিল, প্রতি তিনটি সাধারণ আসন নিয়ে একটি সংরক্ষিত নারী আসন থাকবে; যা থেকে নারী প্রার্থীরা নির্বাচিত হবেন। নারী কমিশনের প্রস্তাব ছিল, সংসদের আসন হবে ৬০০; যার মধ্যে ৩০০ সংরক্ষিত থাকবে নারীর জন্য।

তবে প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐকমত্য কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে প্রস্তাব করে, ৪০০ আসনের মধ্যে ১০০ আসন ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে ২০ বছরের জন্য সংরক্ষিত থাকবে নারী প্রার্থীদের জন্য। এর ফলে পরবর্তী চারটি নির্বাচনে সব আসনেই নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হবে। ২০ বছর পর থেকে আর সংরক্ষিত আসন থাকবে না।

বিএনপি, জামায়াতসহ অধিকাংশ দল এই প্রস্তাবে রাজি হয়নি। এনসিপি এবং কয়েকটি বামপন্থি দল রাজি হলেও, তিন দিনের সংলাপের পর প্রস্তাবটি বাতিল হয়। বিএনপির প্রতিনিধিত্ব করা দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ প্রস্তাব করেন, নারীদের ৫ শতাংশ আসনে মনোনয়ন দেওয়া হবে। 
জুলাই সনদে প্রস্তাব করা হয়েছে, সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে বিদ্যমান সংরক্ষিত ৫০টি আসন বহাল থাকবে। সনদ স্বাক্ষরের পরবর্তী নির্বাচনে প্রতিটি দল ন্যূনতম পাঁচ শতাংশ আসনে নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেবে। তবে এবার তা সংবিধানে উল্লেখ থাকবে না। 
ইসলামী আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস এবং নেজামে ইসলাম পার্টি বাদে বাকি ২৭ দল এই প্রস্তাবে একমত হয়। অঙ্গীকার করে ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন থেকেই ৫ শতাংশ আসনে নারীদের মনোনয়ন দেওয়া হবে। জামায়াত, খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মতো ধর্মভিত্তিক দলও তা মেনে নেয়।

কমিশন একে ‘জেন্টলম্যান অ্যাগ্রিমেন্ট’ বলে আখ্যা দেয়। সনদে বলা হয়েছে, চতুর্দশ সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলো ন্যূনতম ১০ শতাংশ আসনে নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেবে। ৩৩ শতাংশ আসনে নারী প্রার্থী মনোনয়নের লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে প্রতিটি নির্বাচনে ৫ শতাংশ হারে মনোনয়ন বাড়াবে রাজনৈতিক দলগুলো।

বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ ২৭টি দল এই প্রস্তাবে একমত হয়েছে। আগামী ফেব্রুয়ারিতে গণভোটে হ্যাঁ জয়ী হলে, জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, নারীদের সরাসরি আসনে মনোনয়নে বাধ্যবাধকতা তৈরি করা হবে সংবিধান সংস্কারের মাধ্যমে। 
অঙ্গীকার রক্ষা হচ্ছে না

বিএনপি ১৩টি আসনে ১১ নারী প্রার্থী দিয়েছে, যা দলটি ঘোষিত ২৭২ আসনের ৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ। দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া একাই তিনটি আসনে নির্বাচন করবেন। তিনি দিনাজপুর-৩, বগুড়া-৭ ও ফেনী-১ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। 
ঘোষিত তালিকায় অন্য নারী প্রার্থীরা হলেন নাটোর-১: ফারজানা শারমিন, যশোর-২: মোছা. সাবিরা সুলতানা, ঝালকাঠি-২: ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টু, শেরপুর-১: সানসিলা জেবরিন, মানিকগঞ্জ-৩: আফরোজা খান রিতা, ঢাকা-১৪: সানজিদা ইসলাম তুলি, ফরিদপুর-২: শামা ওবায়েদ, সিলেট-২: মোছা. তাহসিনা রুশদীর, ফরিদপুর-৩: নায়াব ইউসুফ কামাল, মাদারীপুর-১: নাদিরা মিঠু।

অঙ্গীকার রক্ষার বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, বিএনপি যেসব প্রতিশ্রুতি দেয় তা পূরণে তারা সবসময় সংকল্পবদ্ধ। এবারও ব্যতিক্রম ঘটবে না। সম্ভাব্য প্রার্থীর মধ্যে ১১টি আসনে নারী প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। এখনও ২৮টি আসন খালি রয়েছে। আবার চূড়ান্ত তালিকাতেও চমক আসতে পারে, যা ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী পূরণ করতে পারে।

জামায়াতের তালিকায় একজনও নারী নেই
জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরায় এবার ৯১ জন নারী নেতা নির্বাচিত হয়েছেন; যা মোট নির্বাচিতের ৪২ শতাংশ। কিন্তু দল সংসদ নির্বাচনে একজনও নারী প্রার্থী দেয়নি। যদিও এই দল জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে সবচেয়ে বেশি সরব। এ দাবিতে লাগাতার আন্দোলন করছে জামায়াত ও তার মিত্র দলগুলো। সনদ বাস্তবায়নে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জেতাতে গতকাল সোমবারও প্রচারের কর্মসূচি দিয়েছে আট দল।

জামায়াত একজনও নারী প্রার্থী না দেওয়ার মাধ্যমে অঙ্গীকার লঙ্ঘন করল কিনা–এ প্রশ্নে দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আযাদবলেন, এখনও সময় শেষ হয়ে যায়নি। মিত্র দলগুলোর সঙ্গে আসন সমঝোতার পর প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করার পর বলা যাবে। 
দলীয় ইতিহাসে প্রথমবারের মতো হিন্দু ধর্মাবলম্বী প্রার্থী দেওয়া জামায়াতের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, নারী প্রার্থীও দেওয়া হবে। নির্বাচনে জয়ী হতে পারে এমন প্রার্থীর খোঁজ চলছে। ঢাকা-১৮ আসনে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী মারদিয়া মমতাজকে দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী করা হতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবির যেভাবে অন্যান্য সংগঠন এবং ইসলামী ছাত্রীসংস্থা থেকে নারী প্রার্থী করেছে নিজেদের প্যানেলে, জামায়াতও একই কৌশল নেবে। তবে এই সংখ্যা চার-পাঁচজনের বেশি হওয়ার সম্ভাবনা কম। ৫ শতাংশ আসনে নারী প্রার্থী মনোনয়নের অঙ্গীকার জামায়াত নাও করতে পারে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।

অন্য দলগুলোর চিত্র
শাপলা কলির প্রার্থী হতে চাওয়া দেড় হাজার মনোনয়নপ্রত্যাশীর ৭৬ জন নারী। এনসিপি সূত্রে জানা যায়, আগামী দু’এক দিনের মধ্যে প্রথম ধাপে ১০০ জন মনোনীত প্রার্থীর তালিকা ঘোষণা করবে দলটি। তবে এই তালিকায় কতজন নারী থাকবেন– তা এখনও ঠিক হয়নি। 
তারা জানান, প্রথম ধাপের তালিকা ইতোমধ্যে দলের আহ্বায়ক ও সদস্য সচিবের কাছে পাঠানো হয়েছে। দলটির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ও যুগ্ম সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট হুমায়রা নূর জানান, প্রথম ধাপের ১০০ প্রার্থীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী প্রার্থী থাকবেন। তবে শুধু নারী হিসেবে নয়, সংশ্লিষ্ট আসনের যোগ্য প্রার্থী হিসেবেই তাদের মনোনয়ন দেওয়া হবে।

এনসিপির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন ঢাকা-১৩ আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী। ঢাকা-৯ আসনে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব তাসনিম জারা এবং নাহিদা সারোয়ার নিভা ঢাকা-১২ আসনে নির্বাচন করতে চান।
এবি পার্টি ১০৯ জন প্রার্থীর তালিকা ঘোষণা করেছে, তাদের মধ্যে ৪ জন নারী। জেএসডির ঘোষিত ১৭০ প্রার্থীর ১০ জন নারী। ইসলামী আন্দোলনের ৩০০, খেলাফত মজলিসের ৭৫ প্রার্থীর তালিকায় একজনও নারী নেই। 
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেছেন, জনসংখ্যার ৫০ শতাংশের বেশি নারী হলেও, রাজনৈতিক দলগুলো সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোতে নারীর প্রতিনিধিত্ব নিয়ে উদাসীন। গণতান্ত্রিক ও সমতাভিত্তিক সমাজের কথা বলা হলেও সংসদসহ গুরুত্বপূর্ণ ফোরামে নারীর প্রাপ্য প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতে দলগুলোর প্রত্যাশিত মনোযোগ নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক শেহরীন আমিন ভূঁইয়া মোনামী বলেন, নারীরা ভোটার তাই রাজনৈতিক দলগুলো ইশতেহারে নারীর ক্ষমতায়ন, সুরক্ষা ও অংশগ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু সংকট দেখা দেয় বাস্তবায়নে, যা দুঃখজনক বৈপরীত্য। গণঅভ্যুত্থানে নির্ণায়ক বাঁক এসেছে মেয়েরা রাস্তায় নামায়। এত অবদানের পরও আন্দোলনের পরের কাঠামো বা পরিসরে নারীর যথাযথ উপস্থিতি নেই। 
 

সর্বাধিক পঠিত