শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ রাত
MENU
#
বাড়ি নির্মাণে কতটুকু জায়গা ছাড়তে হবে, কী বলছে আইন?
daily-fulki

বাড়ি নির্মাণে কতটুকু জায়গা ছাড়তে হবে, কী বলছে আইন?


স্টাফ রিপোর্টার : বাড়ি নির্মাণের সময় জমির চারপাশে কতটুকু জায়গা ফাঁকা রাখতে হবে, তা নিয়ে অনেকেরই স্পষ্ট ধারণা নেই। অথচ ভবনের নকশা অনুমোদন, আলো-বাতাস চলাচল, অগ্নিনিরাপত্তা ও প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষায় নির্দিষ্ট পরিমাণ জায়গা ছেড়ে দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। নিয়ম না মেনে বাড়ি নির্মাণ করলে জরিমানা, মামলা এমনকি ভবনের অবৈধ অংশ ভেঙে ফেলার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।

 

বাড়ি নির্মাণের আগে জমির মালিকানা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাইয়ের পাশাপাশি ভবনের নকশা অনুমোদন এবং নির্মাণসংক্রান্ত বিধিবিধান মেনে চলা জরুরি। বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) অনুযায়ী ভবন নির্মাণে নিরাপত্তা, আলো-বাতাস, অগ্নিনির্বাপণ ও খোলা জায়গার বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখতে হয়।

বাড়ি নির্মাণের বিভিন্ন আইনি দিক নিয়ে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী ইশরাত হাসান বিস্তারিত জানিয়েছেন।

বাড়ি নির্মাণের আগে যেসব বিষয় জরুরি

আইনজীবী ইশরাত হাসানের মতে, প্রথমেই জমির দলিল, খতিয়ান, নামজারি ও খাজনা পরিশোধের কাগজপত্র সঠিক আছে কি না, তা যাচাই করতে হবে। এরপর অনুমোদিত স্থপতি বা প্রকৌশলীর সহায়তায় ভবনের নকশা তৈরি ও অনুমোদন নিতে হবে।

 

ভবনের কাঠামো তৈরির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড-২০২০-এর নিরাপত্তা, আলো-বাতাস চলাচল, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, অগ্নিনিরাপত্তা ও ভূমিকম্প সহনশীলতার বিধান অনুসরণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, ড্রেনেজ ও সেপটিক ট্যাংকের ব্যবস্থাও পরিকল্পনায় রাখতে হবে।

শহর ও গ্রামে নিয়ম কি এক?

বাড়ি নির্মাণের নিয়ম শহর ও গ্রামাঞ্চলে পুরোপুরি এক নয়। ঢাকায় রাজউক, চট্টগ্রামে সিডিএ এবং রাজশাহীতে আরডিএসহ সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেয়। অন্যান্য শহরাঞ্চলে পৌরসভা বা সংশ্লিষ্ট স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এ দায়িত্ব পালন করে।

শহরাঞ্চলে ভবনের চারপাশে খোলা জায়গা, রাস্তা থেকে দূরত্ব, উচ্চতা ও নিরাপত্তার বিষয়ে নির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। গ্রামাঞ্চলেও বাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রে স্থানীয় অনুমতি, পর্যাপ্ত খোলা জায়গা, পানি নিষ্কাশন এবং প্রতিবেশীর জমিতে অনধিকার প্রবেশ না করার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ।

বাড়ি নির্মাণে কতটুকু জায়গা ছাড়তে হবে?

আইনজীবী ইশরাত হাসানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড-২০২০ অনুসারে ভবন নির্মাণের সময় জমির চারপাশে নির্দিষ্ট পরিমাণ খোলা জায়গা বা সেটব্যাক রাখতে হয়।

সাধারণভাবে সামনের দিকে ৫ থেকে ১০ ফুট, পেছনে ৪ থেকে ৬ ফুট এবং দুই পাশে ৩ থেকে ৫ ফুট জায়গা ফাঁকা রাখার কথা উল্লেখ করেছেন তিনি। বহুতল ভবনের ক্ষেত্রে এই দূরত্ব আরও বেশি হতে পারে। এ ছাড়া মোট জমির অন্তত ৩০ শতাংশ খোলা রাখার কথাও বলা হয়েছে, যাতে আলো-বাতাস চলাচল, পানি নিষ্কাশন ও অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।

জায়গা না ছাড়লে কী হতে পারে?

নির্ধারিত জায়গা না রেখে বা অনুমোদিত নকশা অনুসরণ না করে বাড়ি নির্মাণ করলে সেটি অবৈধ নির্মাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে রাজউক, পৌরসভা বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ভবনের অবৈধ অংশ ভেঙে দেওয়ার ব্যবস্থা নিতে পারে। পাশাপাশি মামলা, জরিমানা কিংবা বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার মতো পদক্ষেপও নেওয়া হতে পারে।

ভবনের কারণে প্রতিবেশীর জমিতে অনধিকার প্রবেশ বা আলো-বাতাস চলাচলে বাধা সৃষ্টি হলে প্রতিবেশী আদালতের আশ্রয় নিতে পারেন। পর্যাপ্ত খোলা জায়গা না থাকলে অগ্নিকাণ্ড বা ভূমিকম্পের সময় উদ্ধারকাজও ব্যাহত হতে পারে।

অনুমোদন ছাড়া বাড়ি করলে বৈধ করার সুযোগ আছে?

কিছু ক্ষেত্রে অনুমোদন ছাড়া নির্মিত ভবন পরবর্তী সময়ে নিয়মিতকরণ বা রেগুলারাইজেশনের সুযোগ পেতে পারে। তবে তা নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিধিবিধান ও ভবনের অবস্থার ওপর। এ জন্য জরিমানা পরিশোধ এবং স্থপতি বা প্রকৌশলীর মাধ্যমে সংশোধিত নকশা জমা দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।

তবে রাস্তা বা সরকারি জমি দখল করে কিংবা নির্ধারিত সেটব্যাক না মেনে নির্মাণ করা ভবন নিয়মিতকরণের সুযোগ পাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। এসব ক্ষেত্রে অবৈধ অংশ অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হতে পারে।

ভবনের উচ্চতা ও তলা নির্ধারণ হয় কীভাবে?

ভবনের উচ্চতা বা তলার সংখ্যা নির্ভর করে এলাকার ধরন, রাস্তার প্রস্থ, জমির আয়তন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত ফ্লোর এরিয়া রেশিওর (এফএআর) ওপর। সরু রাস্তার পাশে ভবনের উচ্চতা সীমিত হতে পারে। অন্যদিকে বড় রাস্তা বা বাণিজ্যিক এলাকায় তুলনামূলক উঁচু ভবন নির্মাণের সুযোগ থাকতে পারে।

তাই জমির আকার বা রাস্তার প্রস্থ বিবেচনা না করে নির্দিষ্ট সংখ্যক তলা নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।

পানি নিষ্কাশন ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা

ভবন নির্মাণের সময় সেপটিক ট্যাংক, সোক ওয়েল ও বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখতে হবে। শহরাঞ্চলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়ম অনুযায়ী ওয়াসা বা পৌর ড্রেনের সঙ্গে সংযোগের প্রয়োজন হতে পারে। এসব ব্যবস্থা না থাকলে ভবনের অনুমোদন ও পরিবেশগত ছাড়পত্রসংক্রান্ত জটিলতা তৈরি হতে পারে।

নির্মাণকাজ চলাকালে শ্রমিকদের নিরাপত্তায় হেলমেট, সুরক্ষাজুতা ও সেফটি বেল্ট ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। ভবনে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, জরুরি নির্গমনপথ ও প্রয়োজনীয় সিঁড়ির ব্যবস্থাও রাখতে হবে। একই সঙ্গে নির্মাণকাজের কারণে আশপাশের মানুষের নিরাপত্তা যেন বিঘ্নিত না হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে। এ ছাড়া পর্যাপ্ত আলো-বাতাস, সবুজ জায়গা, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থা রাখলে ভবনটি পরিবেশবান্ধব করা সম্ভব।

 

সর্বাধিক পঠিত