মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি : সাটুরিয়া উপজেলা অডিটোরিয়ামের দ্বিতীয় তলায় ১৯৯৩ সালে স্থাপন করা হয় সাটুরিয়া পাবলিক লাইব্রেরি। তত্ত্বাবধানের জন্য ইউএনওকে সভাপতি করে গঠিত হয় কমিটি। মাঝেমধ্যে মিলেছে সরকারি অনুদানও। তবে লাইব্রেরিটির খোঁজ রাখেননি কেউ। তালাবদ্ধ পড়ে থেকে চুরি হয়ে গেছে সব বই, আসবাব, জানালার গ্রিল। গতকাল মঙ্গলবার সরেজমিন গিয়ে এমন করুণ চিত্র দেখা গেছে।
লাইব্রেরির ভেতরে দুর্গন্ধে টেকা যায় না। বইয়ের ভাঙাচোরা আলমারিতে ইঁদুর, উইপোকার বসতি। আছে কবুতরের বাসাও। মেঝেতে পুরো হয়ে পড়ে আছে কবুতরে বিষ্ঠা। মৃত কবুতরের কঙ্কালও পড়ে থাকতে দেখা যায়। লাইব্রেরির সামনেও ময়লা আবর্জনার স্তূপ। ছাদে জন্মেছে বড় বড় বট গাছ। সেগুলোর শেকড় পুরো ভবনে ছেয়ে গেছে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ভবনটি বেহাল পড়ে আছে। পুরো ভবনই জরাজীর্ণ। বন্ধ হয়ে গেছে অডিটোরিয়ামও।
সাটুরিয়ার ইউএনও কাজী মোহাম্মদ অনিক ইসলাম ও সহকারী কমিশনার-ভূমি মাহমুদুল হক গতকাল বিকেলে লাইব্রেরিটি পরিদর্শনে যান। জং ধরা তালা ভেঙে ভেতরে ঢুকে তারা দেখেন লাইব্রেরির মূল্যবান বই ও আসবাব সব চুরি হয়ে গেছে। এমনকি জানালার গ্রিলও উধাও। লাইট ফ্যান কিছুই নেই।
স্থানীয়রা জানান, পাবলিক লাইব্রেরি চালুর শুরুতে জমজমাট থাকলেও কিছুদিন পরই ধীরে ধীরে কমতে থাকে পাঠকের সংখ্যা। এক পর্যায়ে সংশ্লিষ্টরা মনোযোগ হারান। মাঝে মধ্যে সরকারি অনুদান এলে তদারকি কমিটি চাঙ্গা হয়। এরপর আর খোঁজ থাকে না। সবশেষ ২০১৮ সালের দিকে এক লাখ ২০ হাজার টাকা অনুদান এসেছিল। তখন কিছু বই কেনা হয়। একটি সূত্র জানায়, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর একটি তদারকি কমিটি করা হয়েছিল। এরপর আর কোনো নতুন কমিটি হয়নি, ফলে কাগজে-কলমে সেটিই চলছে এখনও। পদাধিকারবলে কমিটির সভাপতি স্থানীয় ইউএনও। তাঁর অফিসের প্রশাসনিক কর্মকর্তা জানান, কমিটি সংক্রান্ত কোনো তালিকা তাঁর কাছে নেই।
ওই কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন উপজেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. গোলাম হোসেন। তিনি জানান, লাইব্রেরিতে কোনো পাঠক না আসায় সাটুরিয়া সরকারি আদর্শ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আব্দুল খালেককে দেখভালের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তিনি শুনেছেন লাইব্রেরির সব বই ও আসবাব চুরি হয়ে গেছে।
গতকাল সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, জানালার গ্রিল ভেঙে বই ও আসবাব সব চুরি হয়ে গেছে। ইঁদুর ও উইপোকার খাওয়া কিছু নষ্ট বই পড়ে আছে। আলমারির ভেতরে বাসা বেঁধেছে অসংখ্য কবুতর। তাদের বিষ্ঠা মেঝেতে স্তূপ হয়ে আছে। বিষ্ঠার দুর্গন্ধে ভেতরে টেকা দায়।
লাইব্রেরির পাশেই সরকারি ডাকবাংলো এবং সাটুরিয়া সরকারি আদর্শ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়। ডাকবাংলোতে আসা অতিথিরা ওই লাইব্রেরি থেকে বই নিয়ে পড়তেন। স্কুলের ছাত্রছাত্রীরাও এক সময় বই পড়ত। বিকেলে স্থানীয় অনেকে এসে বই পড়তেন।
সাটুরিয়ার ইউপি চেয়ারম্যান মো. আনোয়ার হোসেন পিন্টু বলেন, ২০২৪ সালের শুরুর দিকে লাইব্রেরিটি ফের চালু করতে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। কিন্তু লাইব্রেরির তদারকির দায়িত্বে থাকা কয়েকজনের সঙ্গে কথা বললে তারা বিষয়টি এড়িয়ে যান। ফলে বিষয়টি আর এগোয়নি। তিনি আরও বলেন, যখন সরকারি অনুদান আসে, টাকা খরচ করার মানুষ পাওয়া যায়, কিন্তু দেখভাল করার মানুষ নেই।
সাটুরিয়া পাবলিক লাইব্রেরির সভাপতি ও সাটুরিয়ার ইউএনও কাজী মোহাম্মদ অনিক ইসলাম বলেন, আমি যে এ লাইব্রেরির সভাপতি, তা আমি নিজেই জানি না। আমাকে কেউ জানায়নি। আজ (গতকাল) দেখতে এসে জানতে পারলাম, দেখভাল করার যাদের দায়িত্ব ছিল তারা তা করেননি।
লাইব্রেরির অবস্থা দেখে হতবাক হয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে অডিটোরিয়ামটি সংস্কার করে পুনরায় পাবলিক লাইব্রেরি চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
