স্টাফ রিপোর্টার : মাদক পাচার ও এর অপব্যবহার রোধে জিরো টলারেন্সনীতির আওতায় কার্যক্রম জোরদার করেছে সরকার। তরুণ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষায় কঠোর আইন প্রয়োগ, আইনি সংস্কার, আধুনিক শনাক্তকরণ প্রযুক্তি এবং চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সুবিধা সম্প্রসারণের সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির অংশ হিসেবে সরকার বিদ্যমান মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ সংশোধন করে এর পরিবর্তে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) আইন, ২০২৬ প্রণয়ন করেছে।
নতুন আইনে অনলাইনে মাদক পাচারের জন্য কঠোর শাস্তি, মাদক অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার বিধান, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) প্রয়োগক্ষমতা বৃদ্ধি ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
সংশোধিত আইনে অনলাইনে মাদক পাচারের দায়ে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা জরিমানা ও কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। এ ছাড়া সংঘবদ্ধ অপরাধ বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘটিত মাদক অপরাধের নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
নির্দিষ্ট কিছু মাদকদ্রব্য-সংশ্লিষ্ট গুরুতর অপরাধের জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। মাদক অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সম্পদও বাজেয়াপ্ত করা যাবে। তরুণদের সুরক্ষায় সরকার মাদক শনাক্তকরণ সুবিধা, পুনর্বাসনসেবা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদক প্রতিরোধ কর্মসূচি সম্প্রসারণ করছে।
জিরো টলারেন্সনীতি বাস্তবায়নে নতুন আইন প্রণয়নের পাশাপাশি আধুনিক সরঞ্জাম, ডগ স্কোয়াড, উন্নত পরীক্ষাগার ও গ্রেপ্তারের পর আটক আসামিদের জন্য উন্নত আটককেন্দ্রের মাধ্যমে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে আরো শক্তিশালী করা হচ্ছে।
রাসায়নিক পরীক্ষার নির্ভুলতা ও নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানো ও পরীক্ষায় জালিয়াতি ঠেকাতে সরকার দেশের প্রতিটি জেলায় উন্নত রাসায়নিক পরীক্ষাগার স্থাপনের পরিকল্পনাও করছে।
সরকারের কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো আন্তঃসীমান্ত পাচার নেটওয়ার্ক, আর্থিক পৃষ্ঠপোষক ও মাদক ব্যবসার নেপথ্যে থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তিদেরসহ পুরো সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে দেওয়া।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সরকার মাদক পাচার নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে এবং এর মূল পরিকল্পনাকারী, অর্থদাতা ও বড় কারবারিদের বিচারের আওতায় আনতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। শুধু রাস্তার খুচরা বিক্রেতা ও বাহকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মধ্যে অভিযান সীমাবদ্ধ রাখা হবে না।
মন্ত্রী বলেন, মাদক ব্যবসার অর্থ দিয়ে অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে নতুন আইনে কঠোর বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, মাদক পাচারকারী গোষ্ঠীগুলো তরুণদের লক্ষ্যবস্তু করতে এবং অবৈধ কার্যক্রম সমন্বয়ে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়াচ্ছে।
তার মতে, মাদক-সংশ্লিষ্ট আর্থিক অপরাধে বেনামি সিমকার্ড, একবার ব্যবহারযোগ্য পাসওয়ার্ড (ওটিপি), হোয়াটসঅ্যাপ ও মোবাইল আর্থিক সেবার (এমএফএস) ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে।
এ পরিস্থিতিতে সন্দেহজনক লেনদেন ও অর্থপাচার শনাক্ত করতে জাতীয় টেলিযোগাযোগ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের (এনটিএমসি) কারিগরি পরামর্শে আইনি কাঠামো আরো শক্তিশালী করার কাজ চলছে।
তিন মাসে মাদক-সংশ্লিষ্ট অভিযোগে গ্রেপ্তার ৩০ হাজারের বেশি
২০২৬ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর দেশব্যাপী বিশেষ অভিযানের পরিসংখ্যানে মাদক সমস্যার ব্যাপকতা উঠে এসেছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ওই তিন মাসের অভিযানে মাদক পাচার, অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসবাদ, কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা ও অন্যান্য অভিযোগে মোট ৪৪ হাজার ২৮৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এর মধ্যে মাদক বিক্রি ও পাচারের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন ৩০ হাজার ১৮৭ জন, যা মোট গ্রেপ্তারের প্রায় ৬৮ দশমিক ২ শতাংশ।
ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এ সময়ে ৬ হাজার ২৮৯ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের মধ্যে মাদক বিক্রি ও পাচারের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন ৪ হাজার ২৫১ জন।
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি) মোট ২ হাজার ৪৩৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের মধ্যে মাদক-সংশ্লিষ্ট মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন ৮০৮ জন।
এসব পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বড় ধরনের অভিযানে মাদকসংশ্লিষ্ট অপরাধ অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে রয়েছে।
সরকারের শূন্য সহনশীলতানীতি বাস্তবায়নে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সমন্বিতভাবে দেশব্যাপী অভিযান পরিচালনা করছে।
একই সঙ্গে ক্রমেই জটিল হয়ে ওঠা মাদক কারবার শনাক্ত ও প্রতিহত করতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর কারিগরি সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকার উত্তরা এলাকায় কেটামিন উৎপাদনের একটি পরীক্ষাগার শনাক্তের ঘটনাকে অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর ক্রমবর্ধমান উন্নত কৌশল ব্যবহারের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন। কেটামিন একটি শক্তিশালী অবেদনকারী ওষুধ, যার অপব্যবহারের ঝুঁকি রয়েছে।
মাদক পাচার ও সংশ্লিষ্ট অপরাধ মোকাবেলায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), কোস্ট গার্ড, স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) ও পুলিশের যৌথ প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন তিনি।
সিনথেটিক, সেমি-সিনথেটিক মাদক ও নতুন ধরনের সাইকোঅ্যাকটিভ পদার্থের বিস্তারও দেশের মাদক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমকে আরো জটিল করে তুলছে।
প্রশিক্ষিত মাদক শনাক্তকারী কুকুর মোতায়েন এবং পরীক্ষাগার সম্প্রসারণের পরিকল্পনার লক্ষ্য হলো মাদক শনাক্তকরণ, তদন্ত ও অপরাধের প্রমাণ সংগ্রহের সক্ষমতা বাড়ানো।
চিকিৎসা ও পুনর্বাসনেও গুরুত্ব
কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সরকার চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ওপরও বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। মাদকাসক্তিকে গুরুতর জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের শুধু অপরাধী হিসেবে না দেখে চিকিৎসা ও সহায়তার মাধ্যমে সুস্থ হয়ে ওঠার প্রয়োজন রয়েছে, এমন রোগী হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
সরকার ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা ব্যয়ে দেশের সাতটি বিভাগীয় শহরে ২০০ শয্যাবিশিষ্ট আধুনিক মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসনকেন্দ্র নির্মাণ শুরু করেছে।
এ ছাড়া ঢাকার কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের শয্যাসংখ্যা ২৫০টিতে উন্নীত করার পাশাপাশি দেশের অন্যান্য স্থানে চিকিৎসাসুবিধা বাড়ানোর কাজ চলছে।
এসব উদ্যোগের লক্ষ্য হলো চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ বাড়ানো, মাদকাসক্তির সামাজিক ক্ষতি কমানো ও আক্রান্ত ব্যক্তিদের সুস্থ ও উৎপাদনশীল জীবনে ফিরতে সহায়তা করা।
তরুণদের মাদক অপব্যবহার থেকে দূরে রাখতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাদক ও জুয়া প্রতিরোধে কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং শিক্ষার্থীদের মাদক ও জুয়াসংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ড থেকে সুরক্ষিত রাখাই এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য।
মাদকবিরোধী বৃহত্তর সামাজিক আন্দোলনে পরিবার, শিক্ষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় নেতা, নাগরিক সমাজের সংগঠন, বেসরকারি সংস্থা ও স্বেচ্ছাসেবীদের যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া কোনো একক দেশ, সংস্থা বা সংগঠনের পক্ষে মাদকের ভয়াবহতা নির্মূল করা সম্ভব নয়।
সরকারের সামগ্রিক উদ্যোগে তাই মাদক পাচারকারীদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ, কঠোর আইন, আধুনিক তদন্ত সরঞ্জাম, আর্থিক লেনদেন অনুসরণ, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনসেবা এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমকে সমন্বিত করা হয়েছে।
