শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ রাত
MENU
#
সারাদেশের ৭০ লাখ ৪০ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য বড় সুখবর
daily-fulki

সারাদেশের ৭০ লাখ ৪০ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য বড় সুখবর


স্টাফ রিপোর্টার : দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় গুণগত পরিবর্তন আনতে একগুচ্ছ সুপারিশ করেছে জাতীয় সংসদের শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি। এর অংশ হিসেবে ২০২৬ সালে গোল্ডেন জিপিএ অর্জনকারী প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষার্থীকে ল্যাপটপ এবং ৭০ লাখ ছাত্রীকে ৪ হাজার কোটি টাকার বৃত্তির আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পাশাপাশি প্রায় ৭০ হাজার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীর দীর্ঘদিনের বকেয়া পাওনা সরাসরি ব্যাংক হিসাবে পাঠানোর কার্যক্রম শুরু হয়েছে।


গত ১০ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠকের কার্যবিবরণীতে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
বৈঠকে শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে প্রচলিত মূল্যায়ন পদ্ধতির সংস্কার, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের শিখনফল মূল্যায়ন, কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণ এবং শিক্ষা খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।


কমিটির সদস্যরা মনে করেন, কেবল পাসের হার বাড়ানোর প্রতিযোগিতা দিয়ে শিক্ষার প্রকৃত অগ্রগতি নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। এজন্য বছরভিত্তিক সুনির্দিষ্ট মূল্যায়ন পদ্ধতি চালুর পাশাপাশি আধুনিক ও যুগোপযোগী শিক্ষাক্রম প্রণয়ন জরুরি।


৪০ হাজার শিক্ষার্থী পাচ্ছে ল্যাপটপ, বৃত্তির আওতায় ৭০ লাখ ছাত্রী
 

বৈঠকে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সচিব আবদুল খালেক জানান, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের জন্য ৫৭ হাজার ৩০১ কোটি ৬৮ লাখ টাকার প্রস্তাবিত বাজেট নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি আগের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ৪২ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি।
শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও মেধা বিকাশের লক্ষ্যে ২০২৬ সালে গোল্ডেন জিপিএ অর্জনকারী প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষার্থীকে একটি করে ল্যাপটপ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে নারী শিক্ষার প্রসার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ঝরে পড়া রোধে দেশের ৭০ লাখ ছাত্রীকে ৪ হাজার কোটি টাকার বৃত্তি কর্মসূচির আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
 

৭০ হাজার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকের বকেয়া সরাসরি ব্যাংকে


শিক্ষক-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকট নিরসনেও বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
সংসদীয় কমিটির কার্যবিবরণী অনুযায়ী, প্রায় ৭০ হাজার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীর বকেয়া পাওনা ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (ইএফটি) ও আইবাস+ পদ্ধতিতে সরাসরি তাঁদের ব্যাংক হিসাবে পাঠানোর কার্যক্রম শুরু হয়েছে।


প্রাথমিক পর্যায়ে প্রত্যেক শিক্ষককে গড়ে পাঁচ লাখ টাকা করে দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। 
এ ছাড়া অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের কল্যাণ ট্রাস্ট ও অবসর সুবিধাসংক্রান্ত সংকট নিরসনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দুই হাজার কোটি টাকার বিশেষ আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন বলে বৈঠকের কার্যবিবরণীতে উল্লেখ করা হয়।


এ উদ্যোগের জন্য সংসদীয় কমিটির সদস্যরা সর্বসম্মতিক্রমে প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান।
পাশাপাশি হজযাত্রী ও দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের বকেয়া দ্রুত পরিশোধে পৃথক তালিকা তৈরির সুপারিশ করা হয়েছে।
 

পাসের হার নয়, গুরুত্ব পাবে শিক্ষার প্রকৃত মান


বৈঠকে দেশের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সদস্যরা বলেন, শিক্ষার সাফল্য শুধু পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। বরং শিক্ষার্থীরা প্রকৃতপক্ষে কতটা শিখছে এবং অর্জিত জ্ঞান বাস্তব জীবনে কতটা কাজে লাগাতে পারছে, সেটিই হওয়া উচিত মূল্যায়নের মূল ভিত্তি।
এ বিষয়ে সংসদীয় কমিটির সভাপতি মো. সেলিম ভূঁইয়া বলেন, বিগত সরকার শিক্ষার গুণগত মানের পরিবর্তে পাসের হার ও সংখ্যাগত সাফল্যকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। বর্তমান সরকার সেই ধারা থেকে বেরিয়ে প্রকৃত মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে চায়।


তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে দেশের শিক্ষার্থীদের সামঞ্জস্যপূর্ণ করে গড়ে তুলতে বছরভিত্তিক মূল্যায়ন ও আধুনিক শিক্ষাক্রম চালুর বিকল্প নেই।
শুধু বার্ষিক মূল্যায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে তিন বা ছয় মাস অন্তর শিক্ষার্থীদের শিখনফল যাচাইয়ের ব্যবস্থাও চালু করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
কমিটির সভাপতি আরও জানান, শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে পরবর্তী বৈঠকগুলোতে বিস্তারিত সুপারিশ করা হবে। একই সঙ্গে শিক্ষা খাতের ভবিষ্যৎ রোডম্যাপ তুলে ধরতে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হবে।
 

শিক্ষানীতিতে স্থিতিশীলতা আনার প্রস্তাব


সংসদীয় কমিটির বৈঠকে মালয়েশিয়ার শিক্ষা ব্যবস্থার আদলে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী জাতীয় শিক্ষা পরিকল্পনা প্রণয়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়।
কমিটির সদস্যদের মতে, সরকার কিংবা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তি পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষানীতি, পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তকের মৌলিক কাঠামোয় ঘন ঘন পরিবর্তন আনা উচিত নয়।


এতে শিক্ষা ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয় এবং শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়।
কমিটির সদস্য রেজা কিবরিয়া বলেন, গণিত ও বিজ্ঞানের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে দেশের শিক্ষার্থীদের অবস্থান শক্তিশালী করতে সুনির্দিষ্ট বছরভিত্তিক মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করা জরুরি।
 

দ্রুত এমপিওভুক্তির সুপারিশ


বৈঠকে এমপিওভুক্তির সব শর্ত পূরণকারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং দীর্ঘদিন ধরে বিনা বেতনে শিক্ষকতা করা প্রবীণ শিক্ষকদের দ্রুত এমপিওভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়।
কমিটির সদস্য মোছা. তাহসিনা রুশদী ও মো. মুজিবুর রহমান এ বিষয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
তাঁরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক জটিলতা ও ফাইল নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা দূর করে শিক্ষকবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন।
এ ছাড়া অতীতে রাজনৈতিক কারণে বৈষম্যের শিকার হওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়।
 

মাধ্যমিকে শিক্ষার্থী কমছে কেন, হবে গবেষণা


দেশের মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়ার বিষয়টি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংসদীয় কমিটি।
বৈঠকে বলা হয়, বিগত সময়ে মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। তবে এসব শিক্ষার্থী কোথায় যাচ্ছে, কেন তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়ছে এবং বর্তমানে কী করছে, তা নির্ভরযোগ্য গবেষণার মাধ্যমে চিহ্নিত করা প্রয়োজন।


এ জন্য একটি সমন্বিত গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার সুপারিশ করা হয়েছে।
গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে শিক্ষার্থী ঝরে পড়া রোধ এবং মাধ্যমিক শিক্ষায় অংশগ্রহণ বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
 

২০৩০ সালের মধ্যে কারিগরি শিক্ষায় ভর্তির লক্ষ্য ৩০ শতাংশ


কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণেও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে সংসদীয় কমিটি।


বৈঠকে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব (রুটিন দায়িত্ব) সামসুর রহমান খান জানান, ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশে কারিগরি শিক্ষায় ভর্তির হার ১৯ দশমিক ১৬ শতাংশে পৌঁছেছে।
সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে এ হার পর্যায়ক্রমে ৩০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।
কর্মমুখী শিক্ষার প্রসার, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং দেশের শ্রমবাজারের চাহিদা পূরণে কারিগরি শিক্ষাকে আরও আধুনিক ও যুগোপযোগী করার প্রয়োজনীয়তার ওপর বৈঠকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।


শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করবেন সংসদ সদস্যরা


শিক্ষা খাতে বরাদ্দকৃত অর্থের যথাযথ ব্যবহার, অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং শিক্ষার মান পর্যবেক্ষণে সংসদীয় কমিটির সদস্যরা সরাসরি বিভিন্ন স্কুল-কলেজ পরিদর্শন করবেন।
এ ছাড়া কমিটির পরবর্তী বৈঠকগুলোতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষা বোর্ড এবং সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর ও দপ্তরগুলোর প্রধানদের সশরীরে উপস্থিতি নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষার মানোন্নয়নে সাত দফা সুপারিশ


বৈঠকে শিক্ষা ব্যবস্থার সার্বিক উন্নয়নে সাত দফা সুপারিশ করেছে সংসদীয় কমিটি।
সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বছরভিত্তিক শিক্ষার মান পরিমাপ পদ্ধতি তৈরি, শিক্ষা খাতের বরাদ্দের স্বচ্ছ ব্যবহার নিশ্চিত করা, সংসদীয় কমিটির সদস্যদের মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরপ্রধানদের উপস্থিতিতে নিয়মিত কার্যক্রম পর্যালোচনা।
এ ছাড়া হজযাত্রী ও দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত শিক্ষকদের বকেয়া পরিশোধে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং বাজেটের সংস্থান অনুযায়ী অবসর সুবিধা ও অন্যান্য বকেয়া ভাতা দ্রুত পরিশোধের সুপারিশ করা হয়েছে।


সংসদীয় কমিটির মতে, এসব উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন, শিক্ষক-কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।

 

সর্বাধিক পঠিত