আশুলিয়া প্রতিনিধি : আশুলিয়ায় মাদ্রাসায় হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের সেই মাদ্রাসার নতুন অ্যাডহক কমিটি গঠন করা হয়েছে। এসব সহিংসতার ঘটনায় দায়ের করা একাধিক মামলার এজাহারনামীয় আসামির নাম রয়েছে নতুন গঠন করা এডহক কমিটিতে।
আদালতের সুনির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা, চলমান দেওয়ানি মামলা ও ক্যাম্পাসে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে সাভারের আশুলিয়ার শ্রীপুর এলাকার ঐতিহ্যবাহী তাহফিযুল কুরআনিল কারিম ফাযিল (স্নাতক) মাদ্রাসার কমিটির অনুমোদন দিয়েছে ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়। এ ঘটনায় তৈরি হয়েছে বহুমুখী সংকট।
আশুলিয়ার শ্রীপুর এলাকার তাহফিযুল কুরআনিল কারিম ফাযিল (স্নাতক) মাদরাসা ও আসিয়া আশরাফ মহিলা মাদ্রাসার নিয়ন্ত্রণ, ট্রাস্টের মালিকানা ও সম্পত্তি দখলকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ ও আইনি লড়াই চলে আসছে। মাদরাসার সার্বিক পরিস্থিতি ও সম্পত্তি সুরক্ষার স্বার্থে এর আগে ঢাকার ২য় যুগ্ম জেলা জজ আদালতে আশরাফ চ্যারিটেবল ট্রাস্টের পক্ষ থেকে একটি নিষেধাজ্ঞার দেওয়ানি মামলা দায়ের করা হয়। উক্ত দেওয়ানি মোকাদ্দমার প্রেক্ষিতে চলতি বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর আদালত উভয় পক্ষকে নালিশী তফসিলভুক্ত সম্পত্তির বর্তমান দখল, অবস্থান, প্রকৃতি ও ব্যবহার সম্পর্কে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ‘স্থিতাবস্থা’ বজায় রাখার জন্য নিষেধাজ্ঞা ও অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞা প্রদান করেন। এমনকি আদালতের এই নিষেধাজ্ঞার নোটিশ ও সাইনবোর্ড মাদরাসার মূল ফটকে টানিয়ে দেওয়া হলেও তা তোয়াক্কা করা হয়নি।
স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, গত এক বছর ধরে এই মাদ্রাসার নিয়ন্ত্রণসহ সম্পত্তি দখলকে কেন্দ্র করে দফায় দফায় হামলা, ভাংচুর ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় একাধিক ফৌজদারি মামলা হয়েছে। গত বছরের ২৫ জুন ডা. মোহাম্মদ সালেহউদ্দীন সাঈদের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতা ও তহবিল তছরুপের অভিযোগ এনে তাকে ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়। এর জেরে ওই বছরের ২২ সেপ্টেম্বর হামলা ও লুটের অভিযোগে আশুলিয়া থানায় একটি মামলা দায়ের করেন ট্রাস্টের সেক্রেটারীর সহকারী এস.এ.টি নুরুজ্জামান। পরবর্তীতে চলতি বছরের ০৯ মার্চ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা, ভাঙচুর ও চাঁদা দাবির অভিযোগ এনে উপ-পরিচালক প্রশাসন সৈয়দ সানজিদ আরেকটি মামলা করেন। এছাড়ও গত ২৭ই সেপ্টেম্বর ভাঙচুর ও লাখ লাখ টাকা লুটের অভিযোগে আরও একটি মামলা দায়ের করা হয়।
মামলার তথ্য সূত্রে জানা যায়, মাদ্রাসার নিয়ন্ত্রণ ও সম্পত্তি দখলকে কেন্দ্র করে সহিংসতার ঘটনায় দায়েরকৃত ফৌজদারি মামলাগুলোতে নতুন কমিটির বিদ্যোৎসাহী প্রতিনিধি হিসেবে স্থান পাওয়া প্রফেসর ডা. মোহাম্মদ সালেহ উদ্দিন সাঈদ তিনটি মামলার এজাহারনামীয় আসামি। যার মধ্যে গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে একটি মামলার ৩ নম্বর এজাহারনামীয় আসামি তিনি। এছাড়াও এ বছরের দুটি মামলার ১১ মার্চের এজাহারে ৮ ও ২৮ সেপ্টেম্বর দায়ের করা এজাহারে ৭ নম্বর আসামী তিনি।
এদিকে, এমন উত্তেজনাকর পরিস্থিতি গত ১১ অক্টোবর ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (অ.দা.) অধ্যাপক ড. এ. কে. মোহা. নুরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে মাদ্রাসার জন্য ছয় মাসের মেয়াদে নতুন অ্যাডহক কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়। এনিয়ে উত্তেজনা ছড়িয়েছে একাধিক বার, একাধিক গ্রুপের মধ্যে। যেকোন সময় ঘটে যেতে পারে হতাহতের মত ঘটনা। যার ফলে এতোমধ্যেই আতংকে মাদ্রাসা ছেড়েছে একাধিক শিক্ষার্থী।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ৫ সদস্য বিশিষ্ট এই নতুন কমিটিতে সভাপতি হিসেবে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে মো. ফজলুল করিমকে। এছাড়া কমিটিতে বিদ্যোৎসাহী প্রতিনিধি হিসেবে রয়েছেন প্রফেসর ডা. মোহাম্মদ সালেহ উদ্দিন সাঈদ। শিক্ষক প্রতিনিধি হিসেবে সদস্য পদে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন দেলোয়ার বিন গাজী ও প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছে প্রফেসর ড. মো. আব্দুল করিমকে। পাশাপাশি মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ পদাধিকারবলে এই কমিটিতে সদস্য-সচিবের দায়িত্ব পালন করবেন। প্রজ্ঞাপনের শর্ত অনুযায়ী, আগামী ৬ মাসের মধ্যে এই কমিটিকে পূর্ণাঙ্গ গভর্নিং বডি গঠনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে ও এই মেয়াদের মধ্যে অন্য কোনো বড় নীতিগত কার্য সম্পাদন করতে পারবে না।
নতুন কমিটি গঠনের বিষয়ে ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (অ.দা.) অধ্যাপক ড. এ. কে. মোহা. নুরুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ট্রাস্ট কর্তৃক পরিচালিত বিভিন্ন মাদ্রাসায় অভ্যন্তরীণ বিরোধ বা একাধিক পক্ষ থাকতে পারে। তবে আদালত কর্তৃক কোনো সুনির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা বা আইনি বাধা সংক্রান্ত ফাইলের বিষয়ে তিনি বলেন, ফাইল বা নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি খতিয়ে দেখতে হবে এবং এ ধরনের আদেশের কপি হাতে পেলে তা যাচাই করে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মানুযায়ী পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
মামলার পক্ষে কাজ করা সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আব্দুর রউফ মিয়ার সাথে কথা বলে জানা যায়, যে ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে আদালতে সুনির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা ও গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের মামলা চলমান রয়েছে এবং আদালত থেকে এখনও কোনো আইনি নিষ্কৃতি বা আদেশ পাওয়া যায়নি, তাদের নিয়ে এভাবে নতুন কমিটি গঠন করা আইনসম্মত নয়।
এ বিষয়ে সাভার উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মোঃ সাইফুল ইসলাম জানান, “কমিটি একটা আসছে আমি শুনছি। সেই কমিটি যারা আনছে তাদের এইটাই বলে দিছি, “যে আমরা যা আছে করেনি আগে। আইনি সিচুয়েশন বুঝে নেই, তোমরা আর কোনো মিটিং করতে পারবে না। আর এখন পূজার সময়, এগুলা শেষ হোক। এরপরে কোনোরকম গোলমাল চাই না, কোনো ঝামেলা চাই না।”
আইনশৃঙ্খলা অবনতি না হয়, আইন-শৃঙ্খলার যাতে সুষ্ঠু সমাধান হয়, আমরা সপ চেষ্টাই করতেছি বলে জানান তিনি।
