স্টাফ রিপোর্টার : সাভারে দিন দিন বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। সকাল থেকেই ডেঙ্গু আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিতে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ভিড় করছেন রোগীরা। এতে হাসপাতালগুলোতে বাড়তি রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকরা। কিন্তু ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে নেই তেমন উল্লেখযোগ্য কোন কার্যকরী ব্যবস্থা।
সাভারের বিভিন্ন অপরিষ্কার ড্রেন, ডোবা-নালা, ময়লা আবর্জনার ভাগাড়, খালি বা পরিত্যক্ত প্লটে পানি, জমে এডিস মশার বিস্তার লাভে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এই এডিস মশা মানুষকে কামড়ালে ডেঙ্গু জ্বর হতে পারে। সাধারণ মানুষের কাছে এডিস মশা এখন ডেঙ্গু মশা হিসেবে পরিচিতি লাভ করছে। প্রজনন কার্যক্রম চলছে। কিন্তু ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সাভার পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদগুলোর পক্ষ থেকে কোন উল্লেখযোগ্য কার্যকরী পদক্ষেপ নেই।
সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে হাসপাতালে ২২ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন। এছাড়া গত সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ১৭৩ জন।
অন্যদিকে, সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বর্তমানে প্রায় ৮০ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি আছেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, গত এক মাসে সেখানে ডেঙ্গুর চিকিৎসা নিয়েছেন প্রায় ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার রোগী।
সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি মাত্র ৫০ শয্যাবিশিষ্ট হওয়ায় বাড়তি রোগীর চাপ সামলাতে চিকিৎসকদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। পর্যাপ্ত শয্যা না থাকায় অনেক রোগীকেই বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিৎসা নিতে যেতে হচ্ছে। এতে নিম্নআয়ের রোগী ও তাদের স্বজনদের ওপর বাড়ছে অতিরিক্ত চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ।
ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে থাকায় সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসা সক্ষমতা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও স্বজনরা। তাদের দাবি, বর্তমান ৫০ শয্যার হাসপাতালটিকে ২০০ শয্যায় উন্নীত করা হলে ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় স্থানীয় মানুষের ভোগান্তি অনেকটাই কমবে।
এডিস মশা মানুষকে কামড়ালে ডেঙ্গু হয়। এই এডিস মশা সাধারণত শুকনো ছায়াযুক্ত নিরাপদ স্থানে বিশ্রাম নেয়। এই মশাটি যেকোনো জমে থাকা পানিতে ডিম পাড়ে। সাধারণত পাত্রের কিনারার দিকে ডিম পেড়ে থাকে।
জমে থাকা পানি পরিষ্কার বা নোংরা কিনা সেটা বিষয় নয়। পানিটি টানা কয়েকদিন স্থির থাকলে সেখানে ডিম ছাড়তে পারে এডিস মশা।
স্বাস্থ্য বিশেজ্ঞদের মতে, পুরোন টায়ার, ড্রাম, বালতি বা ফেলে দেয়া বোতল বা পাত্র, নারিকেলের খোলে জমা পানি, চৌবাচ্চা, নির্মাণাধীন ভবনে জমে থাকা পানি, ফুলের টব, ইটের গর্ত এমনসব স্থানে এডিস মশার লার্ভা থাকে। এ লার্ভা থেকেই এডিস মশার জন্ম হয়। যেসব স্থানে মশা ডিম পাড়ে বা শূককীট বেড়ে ওঠে, সেগুলোকে ধ্বংস করতে হবে। তাই বাড়ির আঙিনা ও ঘরের ভেতরে যেকোনো পাত্রে জমে থাকা পানি তিন দিন অন্তর ফেলে দিতে হবে।’
এ ছাড়া প্লাস্টিকের নানা ধরনের পাত্র, কোমল পানীয়ের বোতল, কলাপসিবল গেটের নিচের অংশ, ফেলে দেওয়া টায়ারের অংশ, দইয়ের ফেলে দেওয়া পাত্র, ছাদবাগানের ফুলের টব, পানির মিটারের কাছের গর্ত, ডাবের খোসা, অব্যবহৃত কর্কশিট, সিরামিকের পাত্র, সিঁড়ির পাশের ভাঙা হাতল, যানবাহনের অংশ, গাড়ির গ্যারেজসহ অনেক কিছুতেই ডেঙ্গু মশার লার্ভা থাকে। এসব জায়গায় জমে থাকা পানি পরিষ্কার করা জরুরি।’
ভেষজ কিছু গাছ আছে, যেগুলো ঘরে টবের মধ্যে সাজিয়ে রাখলে মশার আনাগোনা কমে। যেমন রোজমেরি, পুদিনা, ভুঁইতুলসী, ক্যাটনিপ, রসুনগাছ ইত্যাদি।
এছাড়া মশার কয়েল, স্প্রে, ত্বকে লাগানোর লোশন, কীটনাশক, পাওয়ার গার্ড মেশিন, কিলার ব্যাট, ম্যাজিক মশারি, কিলিং ল্যাম্প ইত্যাদি।
তবে মেডিসিন বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ব্যবহারে থাকতে হবে সতর্ক। কারণ, মশা তাড়াতে ব্যবহৃত বেশির ভাগ অ্যারোসল স্প্রেতে পাইরিথোয়েড নামের রাসায়নিক উপাদান থাকে। এটা বাষ্পীভূত হয়ে বাতাসে মেশে ও মশা তাড়ায়।
এমনিতে এর খুব ক্ষতিকর প্রভাব না থাকলেও একাধিক গবেষণায় দেখা যায়, এ ধরনের স্প্রের ব্যবহার হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস রোগীদের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আর কয়েলের ধোঁয়ায় ফরমালডিহাইড, হাইড্রোকার্বনসহ আরও কিছু উপাদান থাকে, যেগুলোর নির্দিষ্ট পরিমাণের বাইরে গেলে তা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। তবে শিশুদের ধারে-কাছে কয়েল না জ্বালানোই ভালো।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনামতে, মশা তাড়ানোর স্প্রে বা ইলেকট্রিক কয়েল ঘরে দেওয়ার পর সেখানে পরবর্তী ২০ মিনিট মানুষকে থাকতে নিষেধ করা হয়। কারণ, ওই স্প্রেতে ছড়ানো কীটনাশকের ড্রপলেটস মাটিতে নেমে আসতে ২০ মিনিট সময় লাগবে। ফলে তখন সেখানে মানুষ থাকলে তিনি সরাসরি কীটনাশকের সংস্পর্শে আসবেন, যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি, সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততা বাড়ানো, পরিস্থিতি মোকাবিলায় কৌশলগত অগ্রাধিকার ঠিক করা, স্বাস্থ্যব্যবস্থায় দক্ষতা বাড়ানো, হাসপাতালে রোগী ব্যবস্থাপনায় সৃজনশীল উদ্যোগ, মশা নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ব্যবস্থাপনা চালু, মশারি বিতরণ, মশার ওপর নিয়মিত নজরদারি এবং সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে নিয়মিত ও জোরালো তদারকির মাধ্যমে ডেঙ্গুর প্রভাব কমানো সম্ভব বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
সাভারে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠলেও রোগীর চাপের তুলনায় সরকারি চিকিৎসা সক্ষমতা এখনও অত্যন্ত সীমিত। তাই ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত হাসপাতালের শয্যা, চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সুবিধা বাড়ানোর দাবি জোরালো হচ্ছে।
