স্টাফ রিপোর্টার : সাভারে ঢাকা-আরিচা মহসড়কের পাশে পার্কিং করা একটি বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় সাভার মডেল থানায় ৭০ জনকে আসামী করে বিস্ফোরক আইনে একটি মামলা দায়ের হয়েছে। মামলায় বাসের মালিক, সাংবাদিকসহ ৪০ জনের নাম উল্লেখ করার পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও ২০ থেকে ৩০ জনকে আসামি করা হয়েছে। গত সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) রাতে সাভার মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আব্বাস উদ্দিন বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, আসামিরা সবাই স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, শ্রমিক লীগের নেতা-কর্মী ও সমর্থক। আসামিদের মধ্যে আছেন হাবিবুর রহমান ওরফে হৃদয় (২৫)। এজাহারে তাঁকে সাভার পরিবহনের মালিক, আওয়ামী লীগ সমর্থক এবং আওয়ামী লীগের নেতা ঢাকা-১৯ (সাভার) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মুরাদ জংয়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া সাংবাদিক মো. কামরুজ্জামান খানকে আসামি করা হয়েছে। তিনি ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) স্থায়ী সদস্য, সাভার প্রেসক্লাবের সদস্য ও টাইমস অব বাংলাদেশের সিনিয়র রিপোর্টার। মামলায় তাঁকে সাভার উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে সাংবাদিক কামরুজ্জামান খান জানান, তিনি ঢাকায় থাকেন। ঢাকায় সাংবাদিক হিসেবে ক্যারিয়ার গঠন করছেন। এক সময়ে তাঁর সাভার উপজেলা আওয়ামী লীগের কমিটিতে পদ (প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক) ছিল। তবে তিনি সক্রিয় ছিলেন না। গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় তাঁর জড়িত থাকার প্রশ্নই আসে না। তাঁকে অযথা হয়রানী করতে আসামি করা হয়েছে। তিনি এ ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।
মামলার এজহারে উল্লেখ করা হয়েছে, গত সোমবার রাত ২টা ৪০ মিনিটে সাভারের রেডিও কলোনি ইউটার্ণে অবস্থান করছিলেন সাভার মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আব্বাস উদ্দিন। স্থানীয় লোকজনের কাছে থেকে রেডিও কলোনি স্টাফ কোয়াটারের অদূরে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের ঢাকামুখী লেনে ছাত্রলীগের লোকজন জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে পেট্রলবোমাসহ একটি বাসে আগুন দেওয়ার লক্ষ্যে জড়ো হয়েছেন বলে জানতে পারেন। খবর পেয়ে পুলিশসহ তিনি সেখানে গিয়ে দেখতে পান ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের নামে বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে ৬০ থেকে ৭০ জন একটি বাসে পেট্রলবোমা মেরে অগ্নিসংযোগ করছেন। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে অধিকাংশ আসামি মোটরসাইকেল ও মাইক্রোবাসে করে, অন্য আসামিরা আশপাশের বিভিন্ন রাস্তা দিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যান। কয়েকজন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীকে চিনতে পারেন তিনি। আগুন নেভানোর জন্য খবর দেওয়া হলে ফায়ার সার্ভিস দ্রুত ঘটনাস্থলে এসে আগুন নেভায়। পরে ঘটনাস্থলে উপস্থিত স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় তিনি আসামিদের শনাক্ত করেন।
এজহারে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, স্থানীয় লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদে ও গোপন সূত্রে জানা যায়, আসামি হাবিবুর রহমান অসৎ উদ্দেশ্যে তাঁর সাভার পরিবহন বাসটির ইঞ্জিন ও গিয়ার বক্স ছাড়া রাস্তার পাশে ফুটপাতে পার্কিং করে রেখেছিলেন। সাভারের সাবেক এমপি ও আওয়ামী লীগ নেতা মুরাদ জং এবং বিরুলিয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান সেলিম মণ্ডলের নির্দেশে, সহায়তায় ও পৃষ্ঠপোষকতায় হাবিবুর রহমান অন্য আসামিদের জড়ো করে বাসটিতে অগ্নিসংযোগ করেছেন।
পুলিশ জানায়, ঘটনার রাতেই সাভারের বিরুলিয়া ইউনিয়নের আকরাইন বাজার এলাকা থেকে সাভার সদর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি সোহেল রানাকে (৩০) গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি বাসে পেট্রলবোমা নিক্ষেপ করে অগ্নিসংযোগের কথা স্বীকার করেছেন।
সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল আলম বলেন, বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় বিস্ফোরক আইনে ৪০ জনের নাম উল্লেখসহ ২০-৩০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে থানায় মামলা হয়েছে। আসামিদের মধ্যে কেউ ঘটনার সঙ্গে জড়িত না থাকলে তিনি নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন। তদন্তের পর জড়িত থাকার প্রমাণ না পাওয়া গেলে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে।
ডিআরইউ’র নিন্দা
বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় সাংবাদিক কামরুজ্জামানকে আসামি করায় নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ)। বুধবার এক বিবৃতিতে সংগঠনটির কার্যনির্বাহী কমিটির পক্ষে সভাপতি আবু সালেহ আকন ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান বলেন, মামলার এজাহারে কামরুজ্জামানের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও তাঁর কথিত সম্পৃক্ততার বিষয়ে কী ধরনের তথ্য-প্রমাণ রয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। কোনো সাংবাদিককে হয়রানি বা পেশাগতভাবে চাপে ফেলার উদ্দেশ্যে মামলা ব্যবহার করা হলে, তা স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য উদ্বেগজনক।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, কামরুজ্জামান খান দীর্ঘদিন ধরে সাভারে বসবাস করেন না। এ অবস্থায় সাভারে সংঘটিত একটি ঘটনায় তাঁকে আসামি করার বিষয়টি যথাযথভাবে তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ও যাচাইযোগ্য তথ্য-প্রমাণ ছাড়া হয়রানিমূলক পদক্ষেপ না নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি তাঁরা আহ্বান জানান।
