স্টাফ রিপোর্টার : সরকারি কেনাকাটার নিয়মে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। সরকারি দরপত্রে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের পূর্ব অভিজ্ঞতা ও বার্ষিক টার্নওভারের বাধ্যতামূলক শর্ত শিথিল করার পাশাপাশি দরপত্র মূল্যায়নে টেকসই, পরিবেশগত প্রভাব ও শক্তি দক্ষতার মতো বিষয় যুক্ত করা হয়েছে।
অস্বাভাবিক কম দর দিলে তা যাচাই বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার, আন্তর্জাতিক দরপত্রে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ এবং অনিয়মে জড়িত প্রতিষ্ঠানকে সরকারি ক্রয় থেকে নিষিদ্ধ করার বিধান আনা হয়েছে।
পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন, ২০০৬ সংশোধন করে ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬’ জারি করা হয়েছে। সোমবার অধ্যাদেশটি গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। নতুন সংশোধনের অন্যতম বড় পরিবর্তন হলো-দরপত্রে অংশ নেওয়ার যোগ্যতার ক্ষেত্রে পূর্ব অভিজ্ঞতা ও উচ্চ বার্ষিক টার্নওভারের বাধ্যতামূলক শর্ত শিথিল করা। ফলে শুধু দীর্ঘদিন ধরে সরকারি কাজ করে আসা প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর না করে নতুন প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোক্তাদের অংশ নেওয়ার সুযোগ বাড়ানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে কাজের ধরন, জটিলতা ও ঝুঁকি বিবেচনায় কোনো নির্দিষ্ট ক্রয়ের ক্ষেত্রে বিশেষ শর্ত দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। দেশীয় শিল্প ও প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য আইনে ‘জাতীয় অগ্রাধিকার সত্তা’ নামে নতুন সংজ্ঞা যুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে সরবরাহকারী, ঠিকাদার, সেবাদাতা ও পরামর্শককে একত্রে বোঝাতে ‘ইকোনমিক অপারেটর’ নামে নতুন সংজ্ঞা সংযোজন করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক দরপত্রের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিদেশি ঠিকাদারি বা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে অংশ নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। দরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু কারিগরি সক্ষমতা ও আর্থিক দর নয়, নির্দিষ্ট পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে টেকসইতার বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হবে। পরিবেশগত প্রভাব, শক্তি দক্ষতা ও পণ্যের স্থায়িত্বকে মূল্যায়নের অংশ করার সুযোগ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ কম দামের পাশাপাশি কোনো পণ্য বা সেবা পরিবেশের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলবে এবং দীর্ঘমেয়াদে সেটি কতটা টেকসই-সেসব বিষয়ও মূল্যায়নের আওতায় আসবে।
সরকারি দাপ্তরিক প্রাক্কলিত মূল্যের তুলনায় কোনো দরদাতা অস্বাভাবিক কম দর দিলে সেটি বিশেষভাবে যাচাই করতে হবে। সংশোধিত বিধানে এ ধরনের দরকে মূল্যায়নের একটি পৃথক বিষয় হিসাবে রাখা হয়েছে। দরপত্র মূল্যায়নে প্রথমে দরদাতার যোগ্যতা ও দরপত্রের শর্ত পূরণ হয়েছে কি না, যাচাই করা হবে। এরপর কারিগরি প্রস্তাব মূল্যায়ন হবে। কারিগরি মূল্যায়নে উত্তীর্ণ দরদাতাদের আর্থিক প্রস্তাব উন্মুক্ত ও মূল্যায়ন করা হবে। পরে কারিগরি ও আর্থিক বিষয় মিলিয়ে সমন্বিত মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করা হবে। পণ্য, কার্য ও ভৌতসেবা কেনার ক্ষেত্রে নির্ণায়কের অনুপাতভিত্তিক মূল্যায়নের বিধান যুক্ত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত ‘রেটেড ক্রাইটেরিয়া’ ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এ ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর ফলে শুধু সর্বনিম্ন দর নয়, নির্ধারিত বিভিন্ন মানদণ্ডের ভিত্তিতে দরপত্রের মূল্যায়ন করা যাবে। সরকারি ক্রয়ে দুর্নীতি, জালিয়াতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, অসাধু প্রভাব বিস্তার, প্রলোভন বা চুক্তির শর্ত লঙ্ঘনের মতো ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে সরকারি কেনাকাটা থেকে নিষিদ্ধ করার বিধান রাখা হয়েছে। অপরাধের ধরন, গুরুত্ব ও আর্থিক ক্ষতির বিষয় বিবেচনায় কোনো নির্দিষ্ট ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে অথবা সরকারের অধীন সব ক্রয়কারীর ক্ষেত্রে দরপত্রে অংশ নেওয়ার অযোগ্য ঘোষণা করা যাবে।
সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন স্থগিত বা বাতিলের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। তবে কোনো প্রতিষ্ঠানকে অনিয়মের অভিযোগে কালো তালিকাভুক্ত করার আগে লিখিত কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ রাখার বিধানও যুক্ত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক দরপত্রের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী বিজ্ঞাপন ও যোগাযোগের জন্য আন্তর্জাতিক প্রকিউরমেন্ট পোর্টাল ব্যবহারের বিধানও স্পষ্ট করা হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দরপত্রের তথ্য প্রচার ও অংশগ্রহণের কাঠামো আরও নির্দিষ্ট হয়েছে।
