স্টাফ রিপোর্টার : স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থীর ঝুঁকি এড়াতে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে বিএনপি। প্রতিটি আসনে একক প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়ার কৌশল নেওয়া হয়েছে। কেউ দলীয়
সিদ্ধান্ত অমান্য করে প্রার্থী হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এমনকি স্থায়ী বহিষ্কারের মতো সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
গত নির্বাচনে ক্ষমতায় আসার পর আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে প্রথম বড় ধরনের সাংগঠনিক পরীক্ষা হিসেবে দেখছে বিএনপি। একই জায়গায় দলের একাধিক প্রার্থী থাকলে ভোটব্যাংক ভাগ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছে হাইকমান্ড। সেক্ষেত্রে ভোট ভাগাভাগির শঙ্কা এবং তৃণমূলের দীর্ঘদিনের কোন্দল সামলানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এমন বাস্তবতায় একক প্রার্থী নিশ্চিতের কৌশল নেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘ এক দশক পর অপেক্ষাকৃত মুক্ত পরিবেশে নির্বাচন হতে যাওয়ায় হাজার হাজার তৃণমূল নেতা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আগ্রহী। ফলে তাদের সামাল দিয়ে সাংগঠনিক ঐক্য অক্ষুণ্ন রাখাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ।
সব মিলিয়ে দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষা ও ভোট ভাগাভাগি ঠেকাতে বহুমুখী প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নামছে বিএনপি। তফসিল ঘোষণার পরপরই এর প্রয়োগ দৃশ্যমান হবে।
একক প্রার্থী বাছাইয়ের মাপকাঠি
বিএনপির নীতিনির্ধারকদের ভাষ্যমতে, একক প্রার্থী নিশ্চিত করার পেছনে কয়েকটি রাজনৈতিক ও কৌশলগত কারণ কাজ করছে। প্রথমত, ভোট ভাগাভাগি ঠেকানো। স্থানীয় নির্বাচন নির্দলীয় ও প্রতীকবিহীন হওয়ায় একই দল থেকে একাধিক প্রার্থী মাঠে থাকলে ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। দল সমর্থিত একজন প্রার্থী থাকলে দলের মূল ভোটব্যাংক এক জায়গায় থাকবে।
দ্বিতীয়ত, অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিয়ন্ত্রণ। একই আসন থেকে একাধিক নেতাকর্মী মাঠে নামলে দলের ভেতরে উপদল ও গ্রুপিং তৈরি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে সাংগঠনিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
তৃতীয়ত, প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক শক্তির মোকাবিলা। প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ইতিমধ্যে অধিকাংশ এলাকায় একক প্রার্থী চূড়ান্ত করে মাঠপর্যায়ে প্রশিক্ষণ শুরু করেছে। পাশাপাশি এনসিপিও শক্তিশালী প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ভোটের মাঠে এই ত্রিমুখী লড়াইয়ে জয়ী হতে দলের অভ্যন্তরীণ ঐক্য ধরে রাখার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে জনপ্রিয়তা ও সার্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা এবং সাংগঠনিক সক্রিয়তা ও ত্যাগ। এলাকায় প্রার্থীর ব্যক্তিগত স্বচ্ছ ভাবমূর্তি ও সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতার পাশাপাশি অতীতে দলের কঠিন সময়ে ও আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘প্রতীকবিহীন নির্বাচন হওয়ায় দলগতভাবে সরাসরি মনোনয়ন দেওয়া হবে না। তবে ভোট ভাগাভাগি ঠেকাতে কেন্দ্র সমর্থিত একক প্রার্থী নিশ্চিত করা হবে।’
তিনি জানান, কেন্দ্র থেকে জোর করে কোনো প্রার্থী চাপিয়ে দেওয়া হবে না। ইউপি নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ের দায়িত্ব থাকবে সংশ্লিষ্ট উপজেলা ও জেলার নেতাদের ওপর। তারা মাঠপর্যায়ে জরিপ চালিয়ে সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম কেন্দ্রে পাঠাবেন।
জেলা ও বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকদের নিয়ে একটি লিয়াজোঁ বা সমন্বয় সেল গঠনেরও পরিকল্পনা রয়েছে। এই সেল তৃণমূলের কোন্দল বা বিরোধ নিরসনে কাজ করবে।
দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষায় হুঁশিয়ারি
দলের সাংগঠনিক শৃঙ্খলা রক্ষায় বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতিমধ্যে বিভিন্ন বিভাগ, জেলা ও মহানগরের নেতাদের সঙ্গে সিরিজ বৈঠক করছেন। তফসিল ঘোষণার পর ঐক্যবদ্ধভাবে দলের একক প্রার্থীর পক্ষে মাঠে নেমে জনগণের মন জয় করে বিজয় নিশ্চিতের বিষয়ে নেতাকর্মীদের প্রতি তার স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে।
বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু জানান, দল বড় হওয়ায় একাধিক প্রার্থী থাকা স্বাভাবিক। তবে চূড়ান্তভাবে আলোচনার মাধ্যমে একক প্রার্থী ঠিক করা হবে। এরপরও কেউ বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে দাঁড়ালে তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ও স্থায়ী বহিষ্কারের মতো কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, ‘প্রার্থীর সততা, পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি ও ত্যাগের ভিত্তিতে সমর্থন দেওয়া হবে। ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকাতে অনেক ক্ষেত্রে পদে থাকা নেতাদের পদ ছাড়ার নিয়ম করার চিন্তাভাবনা চলছে।’
মাঠপর্যায়ের সমন্বয়ে স্থানীয় এমপি বা প্রভাবশালী নেতাদের বলয় যাতে প্রভাব বিস্তার করতে না পারে, সেদিকে কড়া নজর রাখছে দলীয় হাইকমান্ড। ইউনিয়ন ও পৌরসভা পর্যায়ে স্থানীয় নেতৃত্ব সমন্বয় করলেও সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে কেন্দ্র সরাসরি তদারকি করবে।
নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানিয়েছেন, আগামী বছরের ৬ জুন এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন, বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সম্পন্ন করার বিষয়ে সবাই একমত হয়েছেন। তবে ভোটগ্রহণ শুরুর তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য জানান, নির্দলীয় নির্বাচনে একজনকে সমর্থন দিলে ক্ষুব্ধ বাকি প্রার্থীরা গোপনে জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি বা স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে পারেন। এটি বিএনপির মূল ভোটব্যাংককে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। সেক্ষেত্রে সব দিক বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এমন বাস্তবতায় স্থানীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য প্রার্থী বেছে নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান জানান, অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করতে সরকার যথাসময়ে নির্বাচন কমিশনকে সব ধরনের সহায়তা দেবে।
