জাবি প্রতিনিধি : দীর্ঘ ৩২ বছর পর গত বছরের সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) নির্বাচন। যার নির্বাচিত পরিষদের এক বছরের মেয়াদ শেষ হয়েছে ১৮ সেপ্টেম্বর।
নির্বাচনের পর থেকে পুরো মেয়াদে পরিষদের কার্যক্রম পরিচালনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কিংবা ছাত্রদলের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের সাংগঠনিক বাধা বা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয়নি বলে জানিয়েছেন জাকসু নেতারা।
নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মতে, প্রশাসনের সহযোগিতা এবং সংশ্লিষ্ট ছাত্রসংগঠনগুলোর সমন্বয়ের কারণে বড় ধরনের কোনো সংঘাত ছাড়া জাকসু তার দায়িত্ব যথাসাধ্য পালন করতে পেরেছে।
২৪’র জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের অন্যতম এক দাবি ছিল কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ নির্বাচন। দীর্ঘদিন অকার্যকর থাকা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদকে পুনরুজ্জীবিত করার দাবি জানায় বিভিন্ন ক্রিয়াশীল সংগঠনগুলো। সবার দাবির প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত হয় একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল জয় লাভ করে। নির্বাচন পরবর্তীতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রশাসন কিংবা ছাত্রসংগঠনগুলোর মতবিরোধও প্রকাশ্যে আসে। কোথাও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, কোথাও ছাত্ররাজনীতির প্রভাব, আবার কোথাও সংগঠনগুলোর পারস্পরিক দ্বন্দ্বের কারণে সংঘাত, সংঘর্ষ ও অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়।
তবে ভিন্ন চিত্র দেখা যায় জাবিতে। জাকসু নির্বাচনের দিন নির্বাচনকে ঘিরে নানা অনিয়ম ও বিতর্ক তুলে নির্বাচন বয়কট করে ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেল। অন্যদিকে নির্বাচনে শিবির-সমর্থিত প্যানেল, প্যানেল হিসাবে জয় লাভ করে। তবে শিবির-সমর্থিত প্যানেল জাকসুতে প্রতিনিধি হিসেবে থাকা সত্ত্বেও প্রতিনিধিদের দায়িত্ব পালনের পুরো সময়জুড়ে বড় ধরনের কোনো সাংগঠনিক সংঘাত বা প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও ক্রিয়াশীল সংগঠনগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের মধ্য দিয়েই জাকসুর কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে বলে দাবি নির্বাচিত প্রতিনিধিদের।
শিবির-সমর্থিত প্যানেল থেকে জয়ী হওয়া জাকসুর জিএস মাজহারুল ইসলাম বলেন, শিক্ষার্থীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও আলোচনার সুযোগ ছিল। জাকসু তার প্রতিশ্রুতি মোতাবেক কাজ করার চেষ্টা করেছে। কিছু ক্ষেত্রে প্রশাসন সহায়তা না করলেও কখনো বাধা দেয়নি। কিছু বড় প্রকল্প প্রশাসনের উদাসীনতায় থেমে আছে, তবে তারা আমাদের আশ্বস্ত করেছেন দ্রুত করার।
তিনি আরও বলেন, আমরা কাজ করেছি শিক্ষার্থী প্রতিনিধি হিসেবে। জাকসু কখনোই নিজেকে দলীয় রাজনীতির সঙ্গে জড়ায়নি। বরং শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি হিসেবে তাদের অধিকার, কল্যাণ ও অ্যাকাডেমিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করেছে। জাকসু সকল প্রকার বিতর্কিত কাজ থেকেও দূরে ছিল। ছাত্রদল কিংবা অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের পক্ষ থেকেও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কার্যক্রমে কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি করা হয়নি। ফলে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি স্থিতিশীল পরিবেশ বজায় ছিল।
জাকসুর পরিবেশ ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক মো. সাফায়েত মীর বলেন, জাকসুর কার্যক্রমে প্রশাসন সবসময় সহযোগিতা করেছে। বর্তমান প্রশাসন থেকেও পূর্বের প্রশাসনের কাছে এজন্য ধন্যবাদ জানাতে চাই। কিছু বড় প্রকল্প প্রশাসনের সদিচ্ছার অভাবে শেষ হতে পারেনি। তবে সাম্যগ্রিকভাবে সবার সহযোগিতা ছিল।
জাবি ছাত্রদলের সদস্য সচিব ওয়াসিম আহমেদ অনিক বলেন, জাকসু নির্বাচন নিয়ে কিছু বিতর্ক থাকায় ছাত্রদল নির্বাচনকে বয়কট করে। তবে শিক্ষার্থীদের কল্যাণমুখী সব কাজকে ছাত্রদল সমর্থন করে। সেটা শিবির বা অন্য যে কোনো ছাত্রসংগঠনই করুক না কেন। যারা শিক্ষার্থীদের অধিকার ও কল্যাণে কাজ করবে, ছাত্রদল তাদের সঙ্গে সমন্বয় ও সহযোগিতা করবে। জাকসু থেকে কোনো বিতর্ক কাজ না করায়, কোনো সংঘর্ষ হয়নি বলেও তিনি জানান।
জাবি ছাত্রশক্তির সভাপতি জিয়া উদ্দিন আয়ান বলেন, জাকসুর কার্যক্রম নিয়ে সমালোচনার জায়গা যেমন আছে, তেমনি তারা প্রশংসারও দাবিদার। কোনো ধরনের বড় বিতর্ক বা সংঘাত ছাড়াই তারা তাদের মেয়াদ শেষ করতে পেরেছে। পূর্ববর্তী ছাত্র সংসদগুলোর সময় সংঘর্ষ এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। সেই বিবেচনায় এবারের জাকসু সফল। তারা বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করেছে এবং কোনো বিতর্কিত কর্মকাণ্ড বা উসকানিতে না জড়িয়ে শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কাজ করেছে। এজন্য তাদের সাধুবাদ জানাই।
সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, জাকসুর কার্যক্রম পরিচালনায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সবসময় প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবিগুলো বাস্তবায়নে প্রশাসন সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। জাকসু, প্রশাসন এবং বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের সমন্বয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কাজ করার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ জানাই। পাশাপাশি সহিংসতার পরিবর্তে সহমর্মিতা ও সহযোগিতার রাজনীতি চর্চা করায় অন্যান্য ছাত্র সংগঠনগুলোকেও ধন্যবাদ।
