বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ রাত
MENU
#
জেল খাটলেন শিক্ষক ও সাংবাদিক, সিংগাইরে মারিয়া হত্যা, ময়নাতদন্ত আত্মহত্যা
daily-fulki

জেল খাটলেন শিক্ষক ও সাংবাদিক, সিংগাইরে মারিয়া হত্যা, ময়নাতদন্ত আত্মহত্যা


সিংগাইর (মানিকগঞ্জ) প্রতিনিধি : একজন কিশোরীর মৃত্যু। একটি হত্যা মামলা। একে একে গ্রেপ্তার নয়জন। তাঁদের মধ্যে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, আইসিটি শিক্ষক ও সংবাদকর্মী, দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থীসহ স্থানীয় কয়েকজন। কেউ দিনের পর দিন কারাগারে থেকেছেন, কেউ রিমান্ডের মুখোমুখি হয়েছেন। পরে আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে এসেছেন তাঁরা। কিন্তু এত কিছুর পরও প্রশ্নটির উত্তর মেলেনি—মারিয়া মাহি কি সত্যিই হত্যার শিকার, নাকি ঘটনাটি আত্মহত্যা?


মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার সাহরাইল উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী ১৪ বছরের মারিয়া মাহি ১৫ জুন স্কুল থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয়। ছয়দিন পর ২১ জুন চন্দননগর এলাকার একটি কবরস্থান সংলগ্ন ঝোপ থেকে গাছের ডালে ঝুলন্ত অবস্থায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মরদেহের নিচের অংশ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় পাওয়ায় ঘটনাটি দ্রুত হত্যাকাণ্ড হিসেবে আলোচনায় আসে। ২২ জুন মারিয়ার মা কামরুন্নাহার বাদী হয়ে ১৫ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত কয়েকজনকে আসামি করে থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার পর প্রধান শিক্ষকসহ আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে ওই মামলায় এজাহারভুক্ত আরো একজনকে গ্রেফতার করা হয়।  


সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে মারিয়ার মৃত্যুর কারণ আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি এখনো প্রকাশ করেনি।
সিংগাইর থানার ওসি মো. মাজহারুল ইসলাম জানিয়েছেন, ময়নাতদন্তে রিপোর্ট আত্মহত্যা এসেছে। তবে ‘ময়নাতদন্তে আত্মহত্যা’—এই তথ্যটি এখনো পুলিশের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিতে নারাজ। অথচ এই দাবিই যদি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে শুরু থেকেই ঘটনাটিকে হত্যা হিসেবে ধরে তদন্ত পরিচালনা করা হয়েছিল কি না, সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ওঠেছে মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন ঘিরে।


সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, সুরতহাল প্রতিবেদনে মরদেহে দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন বা হত্যার স্পষ্ট কোনো আলামতের উল্লেখ পাওয়া যায়নি। বিপরীতে পরিবারের পক্ষ থেকে মরদেহের নিচের অংশ বিচ্ছিন্ন থাকার বিষয়টিকে হত্যার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। 


আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, মৃত দেহটি কয়েকদিন ঝুলন্ত থাকায় টানা বৃষ্টিতে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়েছে। এই দুই ভিন্ন ব্যাখ্যার মধ্যে কোনটি বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক, তার উত্তর মিলতে পারে ফরেনসিক ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণেই।


ছায়া তদন্তকারী সংস্থা পিবিআইয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ করার না করার শর্তে জানিয়েছেন, আশপাশের বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনায় এমন তথ্য পাওয়া গেছে যে, মারিয়া ঘটনাস্থলের দিকে একাই গিয়েছিল। সেখানে আর অন্য কারো যাওয়ার তথ্য মেলেনি।


১০ জুন সাহরাইল উচ্চ বিদ্যালয়ের একটি কক্ষে মারিয়া ও দশম শ্রেণির ছাত্র আলিফের সাথে ‘ঘনিষ্ঠ অবস্থায়’ দেখার অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি কয়েক দিন স্কুলে আলোচনার পর শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে ১৫ জুন প্রধান শিক্ষকের কাছে অভিযোগ যায়। স্কুল কর্তৃপক্ষ সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে দুই শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। অভিভাবকদের ডেকে মুচলেকা নেওয়া হয় এবং তাঁদের টিসি দেওয়া হয়। এরপরই স্কুল থেকে বেরিয়ে নিখোঁজ হয় মারিয়া মাহি। ছয়দিন পর তার মরদেহ উদ্ধার হয়। 


প্রশ্ন হচ্ছে, স্কুল থেকে বের হওয়ার পর মারিয়ার গতিপথের প্রতিটি ধাপ কি পুলিশ যথাযথভাবে অনুসরণ করেছে? কার সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়েছিল? তার মোবাইল ফোন, কললিস্ট, স্কুলের সিসিটিভি এবং আশপাশের ক্যামেরার ফুটেজ কতটা বিশ্লেষণ করা হয়েছে? ঘটনাস্থলে তার একা যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেলে সেখানে তৃতীয় কোনো ব্যক্তির উপস্থিতির প্রমাণ কীভাবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে? এসব প্রশ্নের বিস্তারিত উত্তর এখনো প্রকাশ্যে আসেনি বলে জানা গেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকেও করা হয়নি প্রেস ব্রিফিং। বরং মামলা করার ক্ষেত্রে  আসামির তালিকা আরও বড় হয়েছে। ২১ জুন রাতে মরদেহ উদ্ধারের পরের সময়টিকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন তুলেছেন গ্রেপ্তার হওয়া শিক্ষক সিরাজুল ইসলাম ও  আইসিটি শিক্ষক এবং দৈনিক নিরপেক্ষ প্রতিনিধি  ইয়াকুব হোসেন মোল্লা।

সাংবাদিক ইয়াকুবের দাবি, ২১ জুন রাতে তিনি সিংগাইর প্রেসক্লাবের সভাপতি মো. সোহরাব হোসেন, সাধারণ সম্পাদক রকিবুল হাসান বিশ্বাসসহ কয়েকজন সাংবাদিককে নিয়ে আশুরা উপলক্ষে তাঁর বাড়ির বার্ষিক আয়োজনের বিষয়ে থানার ওসি মো. মাজহারুল ইসলামকে অবহিত করতে যান। ওসিকে ওরশ অনুষ্ঠানের বিষয়টি অবগত করার পর অন্য সাংবাদিকরা বেরিয়ে যান। মোটরসাইকেল বের করতে কিছুটা সময় লাগায়  আরেক সহকর্মী দৈনিক বাংলা বাজার পত্রিকার প্রতিনিধি  হাবিবুর রহমানকে নিয়ে ইয়াকুব থানায় ছিলেন। 
তাঁর অভিযোগ, এ সময় তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. আব্দুল মোমিন তাঁকে ‘কথা আছে’ বলে বসিয়ে রাখেন। পরে তাঁকে মামলায় হত্যার নির্দেশদাতা হিসেবে আসামি করা হয় এবং রিমান্ড চাওয়া হয়।


ইয়াকুবের আরও অভিযোগ, জিজ্ঞাসাবাদের নামে তাঁকে মানসিকভাবে চাপ দেওয়া হয়।  ইয়াকুব জামিনে বেরিয়ে এসে অভিযোগ করেছেন, তাঁর  বিরুদ্ধে হত্যার নির্দেশ দাতার অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। তার দাবি, একজন আইসিটি শিক্ষক হিসেবে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি ।


মামলা হওয়ার আগের রাতে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সিরাজুল ইসলামকেও থানায় নিয়ে রাতভর জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল বলে তিনি অভিযোগ করেন। তাঁর দাবি, পরদিন তিনিসহ স্কুলের তিন শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলায় হত্যার নির্দেশদাতার অভিযোগ আনা হয়।


অভিযোগগুলোর বিষয়ে পুলিশের বক্তব্য আরও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। কারণ, একটা হত্যা মামলায় একজন শিক্ষক বা সাংবাদিককে আসামি করার ক্ষেত্রে তাঁর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কী প্রমাণ পাওয়া গেছে, সেটি তদন্তের স্বচ্ছতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। শুধু সন্দেহ, সামাজিক চাপ কিংবা এজাহারে নাম থাকার ভিত্তিতে কাউকে দীর্ঘ সময় কারাগারে রাখা হলে পরবর্তী সময়ে সেই দায়ও প্রশ্নের হয়ে দাঁড়িয়েছে ।


এদিকে সিংগাইর প্রেসক্লাবের সভাপতি মো. সোহরাব হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক রকিবুল হাসান বিশ্বাস অভিযোগ করে বলেন, স্থানীয় একটি দালালচক্রের প্ররোচনায় কয়েকজন নিরপরাধ মানুষের বিরুদ্ধে এমন মামলা নেয়া হয়েছে। তাঁদের দাবি, নিহতের পরিবারকে বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করার পরও মামলাটিকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার জন্য তাঁদের রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। তাঁরা এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং যারা নিরীহ মানুষকে হয়রানি করেছেন, তাঁদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি করেছেন।


ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সিরাজুল ইসলামের বক্তব্যও একই ধরনের। তিনি দাবি করেন, বিদ্যালয়ে তাঁর নেওয়া প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল ম্যানেজিং কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী। গণ্যমান্যদের  উপস্থিতিতে অভিভাবকদের কাছ থেকে মুচলেকা নেওয়া হয়েছিল এবং নিয়ম অনুযায়ী টিসি দেওয়া হয়েছিল। তাঁর অভিযোগ, পরবর্তীতে তাঁকে থানায় ডেকে এনে হত্যা মামলায় জড়ানো হয়েছে।


এদিকে নিহতের মৃতদেহ উদ্ধারের পর থেকে হত্যার বিচারের দাবিতে সাহরাইল উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে মানববন্ধনও হয়।  ঘেরাও করা হয় থানা। পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। 


ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার হওয়া নয়জনের  আটজন জামিনে মুক্তি পেয়ে হত্যার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।  
অন্যদিকে, মারিয়ার পরিবার শুরু থেকেই হত্যার অভিযোগ করে আসছে।সে অনুযায়ী তার মা বাদী হয়ে মামলা করেছেন। নিহত স্কুল ছাত্রী মারিয়া মাহির বাবা মিজানুর রহমান দেওয়ান বলেন,পুলিশ বলেছে ডাক্তারি রিপোর্ট অনুযায়ী আমার মেয়ের আত্মহত্যা করেছেন। আমি বিশ্বাস করি না। কারণ আমার মেয়ে নিখোঁজ হওয়ার পর কয়েকজন আমার পরিবারের কাছে টাকা ও দাবি করেছে। শিক্ষকদের মামলায় জড়ানো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ঘটনাটি প্রকাশ না করতে আমার মেয়ে প্রধান শিক্ষকের পা পর্যন্ত ধরেছিল শুনেছি। প্রধান শিক্ষক ঘটনাটি সামনে না আনলে হয়তো আমার মেয়ের ক্ষেত্রে এমন ঘটনা ঘটত না। 


এ ব্যাপারে জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সারওয়ার আলম বলেন, মারিয়া মাহি হত্যা মামলার পোস্টমর্টেম রিপোর্টে আত্মহত্যা করে মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে। আমরা বিষয়টি নিয়ে স্টাডি করছি। মামলা তদন্তে শতভাগ ইনসাফ হবে বলেও পুলিশ সুপার জানান।

 

সর্বাধিক পঠিত