শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ রাত
MENU
#
জীবনস্বত্ব সংরক্ষিত রেখে সম্পত্তি দান সম্পর্কে ইসলাম কী বলে
daily-fulki

জীবনস্বত্ব সংরক্ষিত রেখে সম্পত্তি দান সম্পর্কে ইসলাম কী বলে


ফুলকি ডেস্ক : গত ৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল ২০২৬ পাস হয়েছে। বিলে আজীবন ভোগদখলের অধিকার সংরক্ষণ করে সম্পত্তি দানকে পৃথক ধরনের সম্পত্তি হস্তান্তর হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।


যাকে জীবনস্বত্ব সংরক্ষিত রেখে সম্পত্তি দান করা বলা যায়। দেশের প্রাজ্ঞ আলেমরা মনে করছেন, আইনটি ইসলামী শরিয়তের একাধিক বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তারা এই বিষয়ে যে পর্যালোচনা পেশ করেছেন নিম্নে তার সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হলো।
জীবদ্দশায় দান করার উদ্দেশ্য কী

এই বিষয়ে প্রথম প্রশ্ন হলো ব্যক্তি নিজের জীবদ্দশায় কেন নিজের স্ত্রী, সন্তান, পরিবারের সদস্য অথবা অন্য কাউকে সম্পদ দান করবেন? এই দানের উদ্দেশ্য যদি হয় নিজের ওয়ারিশদের কাউকে লাভবান করা এবং অন্য ওয়ারিশদের ক্ষতিগ্রস্ত করা, অথবা আল্লাহ যাদের উত্তরাধিকার সম্পত্তির অংশীদার করেছেন তাদের বঞ্চিত করা (যেমন—পুত্রসন্তানের অবর্তমানে ভাই-বোন ও তাদের সন্তান) অথবা আল্লাহ প্রদত্ত মিরাসি বণ্টনব্যবস্থার ওপর সন্তুষ্ট হতে না পারা, তবে এই দান কোনো অবস্থায়ই সমর্থনযোগ্য নয়।


কেননা উত্তরাধিকার আইন আহকামুল হাকিমিন মহান আল্লাহ কর্তৃক প্রণীত এবং তিনি কারো প্রতি কোনো জুলুম বা অবিচার করেননি। তিনি কাউকে তার প্রাপ্য থেকে যেমন বঞ্চিত করেননি, কাউকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত দেননি। কোরআনে বর্ণিত উত্তরাধিকার আইনের প্রতি অনাস্থা, একে যথাযথ মনে না করা এবং এর বিকল্প খোঁজা ঈমানের পরিপন্থী এবং অবৈধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ নির্ধারণ করে দিয়েছেন—এমন কোনো উত্তরাধিকার বাতিল করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের উত্তরাধিকার বাতিল করেন।


’ (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হাদিস : ৩১৬৬৮)
দান, নাকি অসিয়ত

নিজের জীবদ্দশায় কেউ যদি এভাবে দান (হেবা) করে যে দানকারীর মৃত্যুর পর তা কার্যকর হবে, তবে তা নামে দান হলেও লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের বিচারে তা  অসিয়ত। আর শরিয়তের দৃষ্টি ওয়ারিশদের জন্য অসিয়ত করা হারাম এবং বাতিল। কেউ এমন হারামে লিপ্ত হলেও তা ধর্তব্য হবে না। তবে হ্যাঁ, যদি সব ওয়ারিশ প্রাপ্তবয়স্ক হয় এবং তারা স্বেচ্ছায় খুশি মনে উক্ত অসিয়ত বাস্তবায়ন করে দেয়, তা হলে ভিন্ন কথা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রত্যেক হকদারকে তার প্রাপ্য অধিকার দিয়েছেন।


অতএব, কোনো উত্তরাধিকারীর জন্য অসিয়ত নেই।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস : ২১১৭)
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরো বলেছেন, কোনো পুরুষ ও কোনো নারী আল্লাহর আনুগত্যে ৬০ বছর পর্যন্ত নেক আমল করে। অতঃপর যখন তাদের মৃত্যু উপস্থিত হয়, তখন তারা অসিয়তের মাধ্যমে উত্তরাধিকারের ক্ষতিসাধন করে। ফলে তাদের জন্য জাহান্নাম অবধারিত হয়ে যায়। (জামে তিরমিজি, হাদিস : ২১১৭)

হাদিস গবেষকরা বলেন, উত্তরাধিকারীর ক্ষতিসাধন করার অর্থ হলো যেমন উত্তরাধিকারীকে বঞ্চিত করার জন্য অপরের জন্য এক-তৃতীয়াংশের বেশি অসিয়ত করে যাওয়া অথবা ওয়ারিশদের মধ্যে কোনো একজনকে সব সম্পত্তি হেবা করে যাওয়া, যেন অপর ওয়ারিশ সম্পত্তি না পায়। (শরহুল মাসাবিহ, ইমাম ইবনুল মালাক : ৩/৫৩৪)

ভোগাধিকার ছাড়া হেবা হয় না

ইসলামী শরিয়তের বিধান অনুযায়ী হেবা সহিহ ও কার্যকর হওয়ার জন্য হেবাগ্রহীতার কাছে হেবাকৃত সম্পত্তি হস্তান্তর করা এবং আয় ভোগের অধিকার অর্পণ করা জরুরি। হেবাগ্রহীতার কাছে হস্তান্তর না করলে সে হেবাকৃত সম্পত্তির মালিক হয় না। সম্পত্তি হেবাগ্রহীতার কাছে হস্তান্তর করার আগে যদি হেবাকারী মারা যায়, তবে এই সম্পত্তি হেবাগ্রহীতার হবে না, বরং হেবাকারী মাইয়েতের সব ওয়ারিশ নিজ নিজ অংশ অনুপাতে এই সম্পদের শরিক হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিস থেকেও এমনটি বুঝে আসে।

উম্মে কুলসুম বিনতে আবু সালামা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন উম্মে সালামা (রা.)-কে বিয়ে করেন তখন তিনি তাকে বলেন—আমি নাজাশির কাছে একটি পোশাক ও কয়েক উকিয়া মেশক উপহার পাঠিয়েছি। তবে আমার ধারণা, নাজাশি এরই মধ্যে ইন্তেকাল করেছেন এবং আমার উপহার আমার কাছেই ফিরে আসবে। যদি তা আমার কাছে ফিরে আসে, তবে তা তোমারই হবে। বর্ণনাকারী বলেন, ঠিক তেমনই ঘটেছিল যেমনটি রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছিলেন। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ২৭২৭৬)

হাদিস থেকে বোঝা গেল, নাজাসি যেহেতু উপহার গ্রহণ করতে পারেননি, তাই এই হেবা সম্পন্ন হয়নি। হেবা সম্পন্ন হলে তা ফেরত আসত না এবং নবী (সা.)-ও তা গ্রহণ করতেন না।

জীবনস্বত্ব রেখে দান করার ব্যাপারে ওমর (রা.)-এর হুঁশিয়ারি

পূর্ববর্তী যুগেও একদল মানুষ এমন ছিল, যারা কোনো একজন সন্তানকে সম্পদ দান বা হেবা করত। কিন্তু হেবাকৃত সম্পদ নিজের কাছে আটকে রাখত। এরপর সন্তান আগে মারা গেলে বলত এটা আমার সম্পদ আমার হাতে আছে। নতুবা নিজের মৃত্যুর সময় সন্তানকে বলত, আমার ছেলের আমি তাকে এটা হেবা করেছিলাম। ওমর (রা.) হেবা করার এমন শরিয়ত পরিপন্থী পদ্ধতির কথা জানতে পেরে বলেন, তোমাদের কারো কী হলো যে সে তার সন্তানকে দান (হেবা) হিসেবে কোনো সম্পত্তি দেয়, অথচ তা সন্তানের দখলে দেয় না। সে বলে, আমি যদি মারা যাই, তবে এটা তার হবে আর সে যদি মারা যায়, তবে তা আমার কাছে ফিরে আসবে। আল্লাহর কসম! কোনো ব্যক্তি যদি তার সন্তানকে এমন কোনো দান করে, যা সে দখলে দেয়নি, অতঃপর সে মারা যায়, তবে সেই সম্পত্তি অবশ্যই ওয়ারিশদের জন্য মিরাসে পরিণত হবে। (মুয়াত্তায়ে ইমাম মালিক, হাদিস : ২৭৮৪)

 

সর্বাধিক পঠিত