স্টাফ রিপোর্টার : সাভার উপজেলার ধামসোনা ও ইয়ারপুর ইউনিয়নের শিল্প কারখানায় ট্যাক্স বা কর নির্ধারণে লক্ষ লক্ষ টাকার অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এ দুর্নীতির মূলহোতা আইটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে শিল্পকারখানার কর নির্ধারক হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত নস্কর আলী ওরফে লস্কর। কর নির্ধারণে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বর্গফুটের পরিমাপ এবং আর্থিক সক্ষমতার রিপোর্টের কারসাজিতে সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আর নস্কর আলী এক একটি প্রতিষ্ঠন থেকে হাতিয়ে নিচ্ছেন লক্ষ লক্ষ টাকা। তবে এ টাকার ভাগ অনেক বড় বড় কর্মকর্তার পকেট পর্যন্ত যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
জানা যায়, নস্কর আলী রাজস্বভুক্ত বা সরকারী বেতনের কোন কর্মচারী না। তিনি আউটসোসিংয়ে কাজ করেন। কিন্তু তাকে ভারী পদবী (এ্যাসেসমেন্ট কর্মকর্তা) দিয়ে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের আয়াতন পরিমাপ ও কর নির্ধারণে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। নস্কর আলী ইউনিয়ন পরিষদের চাহিদানুযায়ী শিল্পকারখানার আয়াতনের পরিমাপ (বর্গফুট) নির্ধারণ করেন। তার দেয়া পরিমাপ অনুয়ায়ী শিল্প কারখানার কর নির্ধারণ করা হয়।
এছাড়াও তিনি শিল্পকারখানার আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করে শতকরা ১ থেকে ৭ টাকা কর নির্ধারণের প্রস্তাব করতে পারেন। এখানেই মোটা অংকের বাণিজ্যের খেলো। কারণ তার প্রস্তাবেই শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বর্গফুট ও কর নির্ধারণ করা হয়।
প্রতিষ্ঠানে ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স থাকলে বর্গফুটের হিসাব কমানো বা বাড়ানো যায় না। তবে এ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করে শতকরা ১ টাকা থেকে ৭ টাকা কর নির্ধারণের প্রস্তাব দেয়া হয়। কিন্তু কোন প্রতিষ্ঠানই শতকরা ৫, ৬ বা ৭ টাকা হিসাবে কর পরিশোধ করে না। নস্কর আলী শিল্প মালিকদের বড় অংকের কর কমিয়ে সরকারের জন্য শতকরা ১ বা ২ টাকা কর নির্ধারণ করে। বিনিময় নিজে মোটা অংকের টাকা পকেটস্থ করে।
আর প্রতিষ্ঠানটিতে যদি ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স করা না থাকে তাহলে আয়াতন নির্ধারণ ও কর ধার্য্য উভয়ই নির্ধারণ করে এই নস্কর আলী। কর নির্ধারণে সরকারের বিধান দেখিয়ে শিল্প মালিকদের সর্বোচ্চ পার্সেন্ট কর দাবি করেন নস্কর। পরে দর কষাকষি করে মালিকপক্ষকে অনেক ছাড় দিয়ে শতকরা ১ বা ২ টাকা কর নির্ধারণ করেন। এখানেই শুভাংকরের ফাঁকি দিয়ে একেকটি প্রতিষ্ঠান থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা নিজের পকেটস্থ করে সরকারকে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করা হয়।
জানা যায়, নস্কর আলী একাই এ টাকার ভাগ পায় না। তার সিংহভাগই চলে যায় তাকে নিযোগ দেয়া উধ্বর্তন কর্তৃপক্ষের দরবারে।
অভিযোগ রয়েছে, এই নস্কর আলী এর আগে পাথালিয়া ইউনিয়নে থার্ড পার্টি হিসেবে কর নির্ধারণের দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
স্থানীয় সচেতন মহল এই দুর্নীতিবাজ এ্যাসেসমেন্ট কর্মকর্তা নস্কর আলীর সীমাহীন অনিয়ম ও দুর্নীতির নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। তাদের দাবি, নস্কর আলীর এ্যাসেসমেন্টকৃত প্রতিষ্ঠানগুলোতে পুন:এ্যাসেসমেন্ট করলে তার দুর্নীতির প্রমাণ মিলবে।
এ ব্যাপারে এ্যাসেসমেন্ট কর্মকর্তা নস্কর আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করলে জানান, আমি ইউনিয়ন পরিষদের চাহিদা মোতাবেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে তার আয়াতন এ্যাসেসমেন্ট করি। এছাড়া আমি প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক সক্ষমতাও নির্ধারণ করে কর প্রস্তাব করি। সে অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো ইউনিয়ন পরষিদে গিয়ে করের টাকা জমা দেয়। আর বিনিময়ে আদায়কৃত করের শতকরা ১০ টাকা আমাকে পারিশ্রমিক হিসেবে দেয়া হয়।
এ ব্যাপারে সাভার উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো: সাইফুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আউটসোসিংয়ের মাধ্যমে কর আদায়ের বিধান আছে। তবে মফস্বল শহর এলাকায় শতকরা ৫ থেকে ৭ টাকা পর্যন্ত কর আদায় করা হয়। সাভারে শিল্পমালিকদের কাছ থেকে সে পরিমাণ কর আদায় করা হলে তাদের উপর চাপ পড়ে যায়। তাই এখানে শতকরা ১ টাকা হিসাবে কর আদায় করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা, অনেক সাংবাদিকরাও কর কমানোর জন্য প্রতিদিনই তদবির করেন। তাদের কথাও রাখতে হয়। এ সবের পরও আগের বছরগুলো থেকে এ বছর সরকারের রাজস্ব অনেক বেড়েছে।
প্রসঙ্গত, ইউনিয়ন পরিষদের অ্যাসেসমেন্ট বা কর মূল্যায়নস্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন অনুযায়ী, ইউনিয়ন পরিষদ তার আওতাধীন এলাকার বাড়ি-ঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং শিল্প কারখানা (Industrial Mills/Factories) থেকে বার্ষিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে ট্যাক্স, রেট বা ফি আদায় করতে পারে। এই ট্যাক্স নির্ধারণের প্রক্রিয়াটিকে অ্যাসেসমেন্ট (Assessment) বলা হয়।
