মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ রাত
MENU
#
আমিনবাজারে পুলিশকে পিটিয়ে হত্যাকারীরা মাদক কারবারী
daily-fulki

আমিনবাজারে পুলিশকে পিটিয়ে হত্যাকারীরা মাদক কারবারী


স্টাফ রিপোর্টার : মাদকের আখড়াখ্যাত আমিনবাজারের বড়দেশী এলাকার মদিনা হাউজিংয়ে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) এক উপপরিদর্শককে (এসআই) পিটিয়ে হত্যার ঘটনাস্থল থেকে একটু দূরেই একটি বালুর মাঠ। স্থানীয় কয়েকজন জানান, বালুর মাঠে নিয়মিত কিশোর গ্যাং-এর মাধ্যমে মাদক ব্যবসা ও মাদক সেবন চলছে। বিশেষ করে এলাকার কয়েকটি কিশোর গ্যাং সেখানে সব সময় অবস্থান করে। মূলত এ মাদক কারবারীরাই পুলিশ কর্মকর্তা আলতাফ হোসেনকে পিটিয়ে হত্যা করেছে। 


বালুর মাঠের মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন আমিনবাজার ইউনিয়ন পরিষদের ২নং ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতা সামসুদ্দিন ওরফে সামসু মেম্বারের ছেলে আপন হোসেন ও জিহাদ হোসেন। তাদের ভগ্নিপতি বুলবুল আহম্মেদের হাতে মদিনা হাউজিংয়ের সব নিয়ন্ত্রণ। ফলে হাউজিংয়ে আপন ও জিহাদ পুরো মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন। 
এসআই আলতাফ হোসেনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় সোমবার (০৭ সেপ্টেম্বর) সকালে ঢাকার কারওয়ানবাজারে সংবাদ সম্মেলন করেছে র‌্যাব। র‌্যাব-১০ এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, ‘হামলাকারীদের বেশিরভাগই কিশোর গ্যাং সংশ্লিষ্ট এবং মাদক সংক্রান্ত এটা আমরা নিশ্চিত হতে পেরেছি। আলাউদ্দিন নিজে ওখানে আলতাফের উপরে আঘাত করেছে। জিহাদ নিজে চাকু দিয়ে আঘাত করে জখম করেছে। আপন ওখানকার গ্যাংয়ের মূলহোতা বলা যায়। তার বিরুদ্ধে তিনটা মাদক মামলাও আমরা পেয়েছি। সে এসএস পাইপ দিয়ে আলতাফের মাথায় চরমভাবে আঘাত করে। ইমরান গণপিটুনিতে অংশ নিয়েছিল।’


নিহত পুলিশ সদস্যের বড় ছেলে শরিফুল ইসলাম বলেন, শনিবার ছুটির দিন থাকায় তাঁর বাবা বাসায় ছিলেন। পরে তিনি কারখানায় যান। সেখানেই হামলার শিকার হন। তিনি বলেন, ‘আমাদের কারখানার সামনে একটি সাদা প্রাইভেটকার প্রায়ই ঘোরাফেরা করত। ওই গাড়িতে চালকসহ চার-পাঁচজন বখাটে থাকত। কারখানার পাশে বালু ফেলে যে জায়গাটি মাঠের মতো হয়েছে, সেখানে তারা নিয়মিত মাদক সেবন করত।’ 


শরিফুলের অভিযোগ, মাদকাসক্ত ওই ব্যক্তিরাই তাঁর বাবার ওপর হামলা চালিয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমার বাবা অন্য একজনকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের জীবন দিয়েছেন। আমি আমার বাবার হত্যার বিচার চাই। যারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।’ আলতাফ হত্যা মামলায় আপন ও জিহাদও আসামি। পলাতক থাকায় তাদের বক্তব্য নেওয়া যায়নি। 


শনিবার রাতে আমিনবাজারের বড়দেশী এলাকায় আলতাফ হোসেনকে (৫৮) পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এ সময় মারধরে তাঁর ছোট ছেলে গুরুতর আহত হন। এ ঘটনায় রোববার মামলা হয়েছে। 


আলতাফ এসবির ঢাকার মালিবাগ কার্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। মারধরের পর তাঁকে রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। তাঁর ছোট ছেলে আরিফুল ইসলামকে একই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।


আলতাফ হোসেনের বাড়ি সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানার রূপনাই গাছপাড়া গ্রামে। পরিবার নিয়ে তিনি আমিনবাজারের বড়দেশি মদিনা সিটি এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। 
ঘটনার দুজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, আমনিবাজারের চিশতিয়া পেট্রোল পাম্প থেকে একটু ভেতরে গেলেই মদিনা সিটি। এলাকার মানুষ মদিনা হাউজিং নামে চেনে। হাউজিংয়ের ভেতরে মদিনা সিটি জামে মসজিদের বিপরীত পাশে আবুল কালাম আজাদের অটোরিকশার গ্যারেজ। জসিম উদ্দিন নামে এক চালক অটোরিকশা গ্যারেজে রাখার জন্য সড়কে দাঁড়িয়ে ছিলেন। রাত আনুমানিক সোয়া ৮টার দিকে সেখানে একটি প্রাইভেটকার আসে। কিন্তু অটোরিকশার কারণে যেতে পারেনি। এ নিয়ে প্রাইভেটকার থামিয়ে চালক জহিরুল ইসলাম গালাগালের এক পর্যায়ে অটোচালক জসিমকে মারতে থাকেন। গ্যারেজের মালিক আবুল কালাম আজাদ বাধা দিলে তাঁকেও জহিরুল ও তাঁর লোকজন বেধড়ক পেটাতে থাকেন। এ সময় মসজিদে যাচ্ছিলেন এসবি কর্মকর্তা আলতাফ হোসেন। তিনি মারধরের কারণ জানতে চান। একপর্যায়ে তিনি পুলিশের পরিচয় দিলে হামলাকারীরা ‘তোকেই তো খুঁজছি’ বলে তাঁকেও মারধর শুরু করেন। মারধর থেকে বাঁচতে তিনি দৌড়ে পাশেই তাঁর ছেলেদের পোশাক কারখানার ভেতরে আশ্রয় নেন। ঘটনাস্থলের কাছেই দুই ছেলে শরিফুল ইসলাম ও আরিফুল ইসলামের কারখানা অবস্থিত।


এর মধ্যেই জহিরুল মোবাইল ফোনে পাশের বালুর মাঠ মাদকের আস্তানা থেকে  আপন, জিহাদ, আলাউদ্দিনসহ ২০-৩০ জন সন্ত্রাসীকে ডেকে এনে পোশাক কারখানার ভতরে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। সন্ত্রাসীরা আলতাফ ও তাঁর ছেলে আরিফুলকে পিটিয়ে গুরুতর আহত করে। আলতাফের মাথায় ভারী বস্তুর আঘাত করলে তিনি অচেতন হয়ে মাটিতে পড়ে যান। হামলাকারীরা চলে গেলে রাত ১০টার দিকে আলতাফ ও তাঁর ছেলেকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসকরা আলতাফকে মৃত ঘোষণা করেন। 


আলতাফ হোসেনকে হত্যার ঘটনায় মোট ৩৫ জনের বিরুদ্ধে নিহতের স্ত্রী শিউলি বেগম রোববার সাভার মডেল থানায় হত্যা মামলা করেছেন। মামলায় গ্রেপ্তার জহিরুল ইলামকে প্রধান করে মোট ১৫ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ১৫-২০ জনকে আসামি করা হয়েছে। রোববার সকালে আমিনবাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে জহিরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। স্থানীয়রা জানান, প্রাইভেটকারটির মালিক জহিরুল নিজে। 


হামলার শিকার গ্যারেজ মালিক আবুল কালাম বলেন, ‘আলতাফ ভাই আমাকে বাঁচাতে এগিয়ে এসেছিলেন। অথচ তাঁর ওপরই হামলা চালানো হলো। তাদের মারধরে তিনি মারা গেলেন। এই ঘটনা আমার সঙ্গেও হতে পারত। আমি এই ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’


রোববার ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার শামীমা পারভিন বলেন, ঘটনার মূল হোতা জহিরুলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ঘটনার সঙ্গে যত বড় প্রভাবশালীই জড়িত থাকুক না কেন তাদের বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না। 


সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল আলম বলেন, আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। তবে তদন্তের স্বার্থে সব আসামির নাম প্রকাশ করা যাচ্ছে না।

 

সর্বাধিক পঠিত