স্টাফ রিপোর্টার : রাজধানীর কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে দায়িত্ব পালনের সময় আদালতের এক কর্মচারীর ব্যাগ তল্লাশি করতে চাওয়াকে কেন্দ্র করে ঢাকার অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত-১০-এর বিচারক সাইদুল ইসলামের বিরুদ্ধে এক পুলিশ কর্মকর্তাকে খাসকামরায় ডেকে নিয়ে মারধরের অভিযোগ উঠেছে।
মঙ্গলবার (০১ সেপ্টেম্বর) ঢাকার অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত-১০ এ মারধরের এ ঘটনা ঘটে।
অভিযোগকারী পুলিশ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী ঢাকা রেলওয়ে থানায় উপপরিদর্শক (এসআই) হিসেবে কর্মরত। এ ঘটনায় তিনি ঢাকা আইনজীবী সমিতির সভাপতির কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। একই সঙ্গে ঘটনার আগে আদালতের কর্মচারীর হুমকির বিষয়টি উল্লেখ করে ঢাকা রেলওয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করেছেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত ২৯ আগস্ট নারায়ণগঞ্জ ও পদ্মা সেতুগামী শহরতলী রেলওয়ে প্ল্যাটফর্মে দায়িত্ব পালন করছিলেন এসআই মোহাম্মদ আলী। এ সময় নিরাপত্তা তল্লাশির অংশ হিসেবে বিচারক সাইদুল ইসলামের অফিস সহকারী (পিয়ন) সাকিব আল হাসানের (২৯) ব্যাগ তল্লাশি করতে চান তিনি। তবে সাকিব এতে বাধা দেন সাকিব।
অভিযোগে বলা হয়, ব্যাগ তল্লাশি করতে বাধা দেওয়ার পাশাপাশি সাকিব আল হাসান দায়িত্ব পালনরত পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। একপর্যায়ে তিনি প্রকাশ্যে পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে ‘আপনাদের চেকিং করার কোনো অধিকার নেই’ বলে প্রতিবাদ করেন এবং নিরাপত্তাজনিত তল্লাশি কার্যক্রমে বাধা দেন। এতে সেখানে উপস্থিত শত শত যাত্রীর সামনে পুলিশকে নিয়ে নানা ধরনের বিরূপ মন্তব্য করেন।
পরে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলার জন্য সাকিবকে থানায় নিয়ে আসা হয়। সেখানে প্রথমে নিজের পরিচয় না দিলেও পরে তিনি নিজেকে অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত-১০-এর পিয়ন হিসেবে পরিচয় দেন। পরে কমলাপুরে বসেই মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বিচারকের সঙ্গে কথা বলে সাকিবের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পরে বিরোধ নিষ্পত্তি করা হয়।
তবে থানা থেকে বের হওয়ার সময় সাকিব আদালতে দেখে নেওয়ার হুমকি দেন বলে অভিযোগ করেন এসআই মোহাম্মদ আলী। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করার পর ঢাকা রেলওয়ে থানায় একটি সাধারণ ডায়ের করেন (জিডি নং-১৪৭৩, তারিখ ২৯ আগস্ট) করেন ওই কর্মকর্তা।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ৩১ আগস্ট এসআই মোহাম্মদ আলীকে আদালতে তলব করেন সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তাজুল ইসলাম সোহাগ। পরে মঙ্গলবার দুপুরে তিনি আদালতে গেলে সেখানে হামলার শিকার হন বলে অভিযোগ করেছেন ওই পুলিশ কর্মকর্তা।
অভিযোগে এসআই মোহাম্মদ আলী বলেন, অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত-১০-এর ভেতরে আগে থেকেই একজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে চেয়ারে বসে ছিলেন। পরে বিচারকের স্টাফসহ মোট তিনজন কক্ষে অবস্থান করেন এবং দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়। একপর্যায়ে একজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি, যাকে তিনি আদালতের ওমেদার হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, পেছন থেকে তাকে জোরে আঘাত করেন এবং এলোপাতাড়ি মারধর করেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়, ওই ব্যক্তি মারধর করার সময় তাকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘বুঝছস আমরা কারা?’ পরে তিনি দৌড়ে দরজার দিকে চলে যান। পুরো ঘটনাটি চেয়ারে বসে থাকা ব্যক্তি মোবাইল ফোনে ধারণ করেন বলেও অভিযোগ করেছেন এসআই মোহাম্মদ আলী।
পুলিশ কর্মকর্তার অভিযোগ, ঘটনার সময় বিচারক তাকে ‘তুই-তামারি’ করে ধমক দেন। তিনি নিজের কোনো কথায় বিচারক ক্ষুব্ধ হয়ে থাকলে ক্ষমা চাওয়ার কথাও বলেন। তবে তার দাবি, বিচারক বিষয়টি আমলে না নিয়ে তার পিয়ন সাকিব আল হাসানের বক্তব্যের ভিত্তিতে পূর্বপরিকল্পিতভাবে লোক দিয়ে তাকে মারধর ও অপমান করিয়েছেন।
অভিযোগকারী আরও বলেন, একজন অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজের খাসকামরায় বিচারকের মৌখিক নির্দেশের প্রতি সম্মান দেখিয়ে ১ সেপ্টেম্বর দুপুর সাড়ে ১টার দিকে তিনি সেখানে হাজির হন। কিন্তু সেখানে গিয়ে অপ্রত্যাশিতভাবে হামলার শিকার হন এবং মারধরে আহত হন।
পরে শারীরিক অসুস্থতা বোধ করলে তিনি পুরান ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালে গিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করেছেন।
এ ঘটনায় পুলিশ বাহিনীর সম্মানহানি ও নিজের সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার আশঙ্কার কথাও অভিযোগে উল্লেখ করেছেন এসআই মোহাম্মদ আলী। তবে অভিযোগের বিষয়ে বিচারক সাইদুল ইসলাম কিংবা অভিযুক্ত আদালতকর্মীদের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
ভুক্তভোগী এসআই মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘আমার কোনো অপরাধ থাকলে আমার বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ করা যেত বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া যেত। কিন্তু এভাবে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত ও মানসিকভাবে হয়রানি করার কোনো কারণ দেখি না।’
তিনি বলেন, ‘আমি জজকে বলেছি, আমার কোনো অপরাধ হয়ে থাকলে আমি দুঃখিত, আপনার কাছে ক্ষমা চাচ্ছি। কিন্তু এভাবে আমাকে অপমান ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার কারণ কী?’
মোহাম্মদ আলী আরও বলেন, ‘পরে আমাকে হাত ধরে ওই ব্যক্তির সঙ্গে হাত মেলাতে বাধ্য করা হয়। এরপর আমি সেখান থেকে বের হয়ে আসি।’
ঘটনার পর তিনি মিটফোর্ড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন বলে জানান।
অভিযোগে ওই হামলাকারীকে আদালতের উমেদার হিসেবে উল্লেখ করা হলেও তার নাম জানা যায়নি। তবে তাকে দেখলে শনাক্ত করতে পারবেন বলে জানিয়েছেন এসআই মোহাম্মদ আলী।
