বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ রাত
MENU
#
সাভারসহ ঢাকায় পাঁচটি মনোরেল রুট চালুর পরিকল্পনা সরকারের
daily-fulki

সাভারসহ ঢাকায় পাঁচটি মনোরেল রুট চালুর পরিকল্পনা সরকারের


স্টাফ রিপোর্টার : রাজধানীতে যানজট নিরসনে এবং মেট্রোরেল নেটওয়ার্কের বাইরের এলাকাগুলোয় দ্রুত সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে মেট্রোরেলের পাশাপাশি সরকার সাভারসহ ঢাকায় পাঁচটি মনোরেল রুট চালুর পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। প্রস্তাবিত পাঁচটি করিডোরে প্রায় ৭৯ দশমিক ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ মনোরেল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে আগামী তিন বছরের মধ্যে নগরবাসীকে সেবা দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)।

ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) ২০২৯ সালের মধ্যে অন্তত দুটি মনোরেল রুট চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। প্রস্তাবিত পাঁচটি মনোরেল রুটগুলো হলো—১. বিমানবন্দর থেকে জলসিঁড়ি হয়ে পূর্বাচল; ২. বিমানবন্দর থেকে সাভার; ৩. মোহাম্মদপুর থেকে পোস্তগোলা; ৪. মধ্য বাড্ডা থেকে ভুলতা; এবং ৫. রামপুরা থেকে ডেমরা।

প্রস্তাবিত প্রকল্পের প্রাক-সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করবে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)। সমীক্ষাকাজে নিয়োজিত বুয়েট পরামর্শক দলের কার্যক্রম সমন্বয় করছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান। সমীক্ষার ভিত্তিতে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রথমে দুটি রুট চূড়ান্ত করা হবে। পরবর্তী সময়ে অর্থায়ন, উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শেষে ২০২৯ সালের মধ্যে অন্তত দুটি মনোরেল চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়,  প্রি-ফিজিবিলিটি স্টাডির জন্য সরকার থেকে প্রায় আট কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত প্রকল্পের প্রাক-সম্ভাব্যতা সমীক্ষা বুয়েট করলেও দেশে মনোরেল বিষয়ে বিশেষজ্ঞের অভাব থাকায় ফ্রান্স ও মালয়েশিয়া থেকে বিশেষজ্ঞ আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। তারা আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সম্ভাব্যতা যাচাই ও কারিগরি পরিকল্পনায় সহায়তা করবেন।

সূত্র আরও জানায়, প্রি-ফিজিবিলিটি স্টাডি শেষ হওয়ার পর প্রকল্প কমিটি গঠন, প্রকল্প পরিচালক (পিডি) নিয়োগ, বিস্তারিত নকশা ও ব্যয় নির্ধারণ এবং পরবর্তী সময়ে দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে বাস্তবায়ন কার্যক্রম শুরু হবে।

বাংলাদেশে সম্পূর্ণ নতুন এই প্রযুক্তির কোনো ত্রুটি দেখা দিলে প্রাথমিক কয়েক বছর সাধারণত পাঁচ থেকে ১০ বছর চুক্তি অনুযায়ী নির্মাণকারী আন্তর্জাতিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও বিদেশি প্রকৌশলীদের ওপরই সম্পূর্ণ নির্ভর করতে হবে। এই সময়ে দেশীয় প্রকৌশলীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে সক্ষমতা তৈরির পরিকল্পনা করা হয়ে থাকে।

বাংলাদেশ সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়, রেলপথ এবং নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ জানান, ঢাকা মহানগরীতে মনোরেল বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় (ইউআরএসটিপি) বিদ্যমান ও পরিকল্পিত এমআরটি নেটওয়ার্কের সঙ্গে সমন্বয়ের লক্ষ্যে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ পাঁচটি মনোরেল করিডোর প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত মনোরেল রুটগুলো মূলত এমআরটি  নেটওয়ার্কের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে এবং যেসব এলাকায় এমআরটির সরাসরি সংযোগ থাকবে না, সেসব এলাকায় গণপরিবহন সংযোগ ও যাতায়াত সুবিধা সমপ্রসারণে ভূমিকা রাখবে।

প্রতিমন্ত্রী হাবিব বলেন, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর মনোরেল বাস্তবায়নের নিমিত্ত রুট নির্ধারণের

জন্য নির্দেশনা প্রদান করে। সেই নির্দেশনার ভিত্তিতে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) সহায়তায় ঢাকা শহরে মনোরেল বাস্তবায়নের জন্য পাঁচটি রুট নির্ধারণ করা হয়েছে। মনোরেল বাস্তবায়নের নিমিত্ত প্রি-ফিজিবিলিটি স্টাডি রিপোর্ট প্রস্তুতির জন্য সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের নির্দেশনা ও ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ এর তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়কে (বুয়েট) পরামর্শক নিয়োগ করা হয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) প্রি-ফিজিবিলিটি স্টাডির পাশাপাশি ওই পাঁচটি রুট থেকে দুটি রুটের অগ্রাধিকার তালিকা তৈরি করবে। প্রি-ফিজিবিলিটি স্টাডির জন্য তিন মাস সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রি-ফিজিবিলিটি স্টাডি প্রতিবেদন এবং অগ্রাধিকার রুট পাওয়া মাত্রই ফিজিবিলিটি-সহ ডিপিপি প্রস্তুতির কাজ শুরু হবে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ২০২৯ সালের মধ্যে মনোরেল ঢাকা শহরে চলাচল করবে এরূপ আশা করা যায়। মনোরেল হবে মূল গণপরিবহন কাঠামোর ভিত্তি, মনোরেল হবে সংযোগকারী বা পরিপূরক ব্যবস্থা এবং বাস/বিআরটি স্থানীয় পর্যায়ে ফিডার সার্ভিস হিসেবে কাজ করতে পারে।

এদিকে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান মনোরেল পরিকল্পনা সম্পর্কে বলেন, ‘ঢাকার যেসব এলাকায় ভারী মেট্রোরেল নির্মাণ করা বাস্তবসম্মত নয়। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ ও সরু রাস্তার অঞ্চলগুলোকে মূল গণপরিবহন নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করতেই মনোরেলের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এটি মেট্রোরেলের বিকল্প নয়, বরং একটি ফিডার বা পরিপূরক ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করবে।’

ড. হাদিউজ্জামান বলেন, কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় (ইউআরএসটিপি) পাঁচটি মনোরেল লাইনের প্রস্তাব থাকলেও চলমান সমীক্ষায় প্রয়োজনে আরো দই-তিনটি সম্ভাব্য করিডোর যুক্ত করে মূল্যায়ন করা হবে। প্রতিটি রুটের ক্ষেত্রে যাত্রীর চাপ বা রাইডারশিপ, জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা, মেট্রোরেলের সঙ্গে সংযোগ এবং বাস্তবায়নের সুযোগ বিশ্লেষণ করা হবে।

পরিবহন বিশেষজ্ঞরা জানান, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যানজট নিরসন এবং দ্রুত গণপরিবহন নিশ্চিত করতে মনোরেল একটি আধুনিক ও সম্ভাবনাময় মাধ্যম হতে পারে। মেট্রোরেলের পাশাপাশি মনোরেল নিয়ে বিভিন্ন সময়ে অনেক আলোচনা চলছে। তবে বাংলাদেশের শহরগুলোর ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে মনোরেলের বিকল্প নেই।

মনোরেল একটি মাত্র সিঙ্গেল ট্র্যাকের  ওপর ভর করে চলে। এর পিলার বা স্তম্ভগুলো তৈরি করতে রাস্তার ওপর খুবই সামান্য জায়গার প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশের ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এবং সংকীর্ণ রাস্তার শহরে এটি অত্যন্ত উপযোগী। ভারী মেট্রোরেলের তুলনায় মনোরেলের অবকাঠামো অনেক হালকা। এর ট্র্যাকগুলো কারখানায় আগে থেকে তৈরি করে এনে দ্রুত সাইটে স্থাপন করা যায়। ফলে নির্মাণকালীন সময়ে জনদুর্ভোগ ও যানজট কম হয়।

এদিকে মনোরেল নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন কেউ কেউ। সাধারণ মানুষ জানান, মনোরেলের যাত্রী ধারণক্ষমতা ভারী রেল বা এমআরটির চেয়ে বেশ কম। ঢাকার মতো মেগাসিটিতে যেখানে প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষ যাতায়াত করে, সেখানে শুধু মনোরেল দিয়ে মূল গণপরিবহনের চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়। এটি বড় জোর ফিডার সার্ভিস (মূল লাইনের সঙ্গে সংযোগকারী) হিসেবে কাজ করতে পারে।

পরিবহন বিশেষজ্ঞরা জানান, মনোরেলের ট্র্যাক পরিবর্তনের ব্যবস্থা বেশ জটিল এবং সময়সাপেক্ষ। কোনো ট্রেন লাইনে বিকল হয়ে পড়লে পেছনের ট্রেনকে অন্য লাইনে সরিয়ে নেওয়া বা উদ্ধার করা বেশ কঠিন। এছাড়া মনোরেল অনেক উঁচুতে একটি সরু ট্র্যাকের ওপর চলায় কোনো জরুরি অবস্থায় ট্রেন থেকে যাত্রীদের নিরাপদে নামিয়ে আনা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ এবং জটিল।

সংশ্লিষ্টরা জানান, মেট্রোরেলের চেয়ে এটির নির্মাণ ব্যয় কম এবং ভূমি অধিগ্রহণের খরচ বেশ সাশ্রয়ী। প্রতি কিলোমিটার হিসেবে মনোরেল নির্মাণখরচ ভারী মেট্রোরেলের চেয়ে প্রায় ৪০ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কম হতে পারে। যেহেতু এটি মাটির নিচে বা বিশাল ভায়াডাক্টের ওপর তৈরি করতে হয় না, তাই প্রাথমিক বিনিয়োগ অনেক কম লাগে। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা-গাজীপুর কিংবা চট্টগ্রামের মতো রুটে এক্সপ্রেস লিংক বা বিমানবন্দর সংযোগকারী হিসেবে ব্যবহার করা হলে লাভজনক হতে পারে বলে জানান খাতসংশ্লিষ্টরা।
 

সর্বাধিক পঠিত