স্টাফ রিপোর্টার : উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে একাদশ শ্রেণি থেকেই হিসাববিজ্ঞান প্রথম ও দ্বিতীয় পত্র একসঙ্গে পাঠদানের সরকারি নির্দেশনা পরিবর্তনের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালকের কাছে আবেদন জানানো হয়েছে। আবেদনকারী দাবি করেছেন, হিসাববিজ্ঞান একটি প্রক্রিয়াভিত্তিক বিষয় হওয়ায় প্রথম পত্রের বিষয়বস্তু যথাযথভাবে আয়ত্ত করার আগে দ্বিতীয় পত্র পাঠদান শিক্ষার্থীদের জন্য জটিল হয়ে পড়ে।
এ বিষয়ে মাউশির মহাপরিচালক বরাবর মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) লিখিত আবেদন করেছেন ৩৪তম বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের কর্মকর্তা ও ঢাকা উদ্যান সরকারি কলেজের প্রভাষক (হিসাববিজ্ঞান) মো. আব্দুর রাজ্জাক। বর্তমানে তিনি মাউশিতে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত।
আবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে উচ্চ মাধ্যমিক, অনার্স ও মাস্টার্স পর্যায়ে হিসাববিজ্ঞান পড়ানোর অভিজ্ঞতা থেকে তিনি দেখেছেন, উচ্চ মাধ্যমিকের হিসাববিজ্ঞান প্রথম পত্রের ১০টি অধ্যায় ধারাবাহিকভাবে সম্পন্ন না করে দ্বিতীয় পত্রের বিষয়বস্তু শিক্ষার্থীদের পক্ষে যথাযথভাবে অনুধাবন করা কঠিন। অথচ বর্তমান নির্দেশনা অনুযায়ী প্রথম বর্ষ থেকেই দুই পত্র একসঙ্গে পাঠদান করা হচ্ছে।
তার মতে, এতে পাঠদানের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। আবেদনে এর প্রভাব এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলেও পড়ছে বলে দাবি করা হয়েছে।
সেখানে উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালে হিসাববিজ্ঞান বিষয়ে প্রায় ৪২ শতাংশ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে।
আবেদনে শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের বাস্তব সমস্যার কথাও তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, সপ্তাহে পাঁচ দিন পাঁচ শিক্ষক পাঁচটি পৃথক অধ্যায় পড়ালে শিক্ষার্থীদের একসঙ্গে একাধিক অধ্যায় অনুসরণ করতে হয়। ফলে একটি অধ্যায়ের সঙ্গে আরেকটির সম্পর্ক বুঝতে এবং ধারাবাহিকভাবে প্রস্তুতি নিতে তাদের সমস্যা হয়।
আবার কোনো শিক্ষক বা শিক্ষার্থীর অনুপস্থিতি কিংবা কোনো কারণে নির্ধারিত ক্লাস বাতিল হলে ওই শিক্ষকের পরবর্তী ক্লাস পেতে প্রায় ১৫ দিন অপেক্ষা করতে হয়। এতে পাঠের ধারাবাহিকতা আরও ব্যাহত হয়। অন্যদিকে পাঁচ শিক্ষক একই অধ্যায় পর্যায়ক্রমে পড়ালে তাদের পাঠদানের পদ্ধতি ও উপস্থাপনার ভিন্নতার কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এ অবস্থায় প্রথম বর্ষে শুধু হিসাববিজ্ঞান প্রথম পত্র এবং দ্বিতীয় বর্ষে শুধু দ্বিতীয় পত্র পাঠদানের নির্দেশনা জারির প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি একটি শ্রেণিকক্ষে সর্বোচ্চ দুই শিক্ষকের সমন্বিত ও পরিকল্পিত পাঠদানের ব্যবস্থা করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হিসাববিজ্ঞান মূলত অঙ্ক ও অনুশীলননির্ভর বিষয়। শ্রেণিকক্ষে অঙ্ক করার সময় শিক্ষার্থীদের বইয়ের পাশাপাশি খাতা, কলম, পেন্সিল, রুলার, ইরেজারসহ বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করতে হয়। এর মধ্যে পাঁচ শিক্ষক যদি পাঁচটি ভিন্ন বই অনুসরণ করে পাঠদান করেন, তাহলে শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, একই বিষয়ের একাধিক বই কেনার সামর্থ্য অধিকাংশ শিক্ষার্থীর নেই। ফলে শ্রেণিকক্ষে বিভিন্ন বই অনুসরণ করে পাঠদান করা হলে শিক্ষার্থীরা আর্থিকভাবেও চাপে পড়ে। এ কারণে শ্রেণিকক্ষে অননুমোদিত বই অনুসরণ করে পাঠদান বন্ধ করে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) কর্তৃক অনুমোদিত বই অনুসরণ নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।
কোচিংনির্ভরতা কমাতে বদলির প্রস্তাব
হিসাববিজ্ঞান তুলনামূলক কঠিন বিষয় হওয়ায় শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত পাঠদান নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কোনো কোনো শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে কম পড়িয়ে শিক্ষার্থীদের নিজস্ব কোচিং বা প্রাইভেট পড়ায় নিতে উৎসাহিত করেন। এ ধরনের প্রবণতা বন্ধে নিয়মিত শিক্ষক বদলির ব্যবস্থা কার্যকর করার প্রয়োজন রয়েছে।
আবেদনে বলা হয়েছে, হিসাববিজ্ঞানের অনেক শিক্ষক একই কলেজে ১০, ১৫ এমনকি ২০ বছর ধরে কর্মরত আছেন। দীর্ঘদিন একই প্রতিষ্ঠানে থাকার কারণে কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে কোচিং বা প্রাইভেট পড়াকেন্দ্রিক নির্ভরতা তৈরি হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি আর্থিক ও মানসিক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নিয়মিত বদলি, শ্রেণিকক্ষে কার্যকর পাঠদান এবং অনুমোদিত বই অনুসরণের বিষয়গুলো নিশ্চিত করা গেলে কোচিংনির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের পাঠগ্রহণের পরিবেশও উন্নত করা সম্ভব।
সব মিলিয়ে হিসাববিজ্ঞান বিষয়ের প্রক্রিয়াভিত্তিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নিয়ে পাঠদান পদ্ধতি পুনর্বিন্যাস, প্রথম ও দ্বিতীয় পত্র পৃথক বর্ষে পাঠদান, প্রতি শ্রেণিতে সর্বোচ্চ দুইজন শিক্ষকের সমন্বিত পাঠদান, এনসিটিবি অনুমোদিত বই অনুসরণ এবং নিয়মিত শিক্ষক বদলির ব্যবস্থা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে পরামর্শ করে এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা জারির দাবি জানিয়েছেন মো. আব্দুর রাজ্জাক।
