স্টাফ রিপোর্টার : ঢাকা, আশুলিয়া, সাভারসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বোমা উদ্ধারের ঘটনায় বোমারু মামুন ও উজ্জ্বলের সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। বোমারু মামুন ও উজ্জ্বল কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে অবস্থানকালে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ ও একসঙ্গে কাজ করার বিষয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠেন বলে জানা গেছে।
পরে তারা জামিনে বেরিয়ে বিভিন্ন স্থানে বোমা রাখার ঘটনায় জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া যায়।
কারাগারের ভেতরে দুই উগ্রবাদী কীভাবে একসঙ্গে থাকার ও যোগাযোগের সুযোগ পেলেন—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মোতাহার হোসেন বলেছেন, দেশের কারাগারগুলোতে ধারণক্ষমতার তুলনায় বন্দির সংখ্যা অনেক বেশি।
আবাসন সংকটের কারণে অনেক সময় বন্দিদের একে অপরের কাছাকাছি থাকার সুযোগ তৈরি হয়।
তিনি আরও বলেন, ‘উগ্রবাদীরা একে অপরের কাছে থাকার সুযোগ পেয়ে যায়।
যদিও তারা কর্তৃপক্ষের নজর এড়িয়ে যেতে পারে না। সামনের দিনগুলোতে আমরা আরও সতর্ক থাকব।পাশাপাশি উগ্রবাদী বন্দিদের আলাদা সেলে রাখার ব্যবস্থা করা যায় কি না, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হবে।’
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) দুপুরে কারা সদরদপ্তরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে আইজি প্রিজন এসব কথা বলেন।
এখনো পলাতক ৬৯০ বন্দি
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া দুই হাজার ২৪৭ বন্দির মধ্যে এখনো ৬৯০ জন পলাতক বলে জানান আইজি প্রিজন।
তিনি বলেন, দুই হাজার ২৪৭ জন বন্দি কারাগার থেকে পালিয়ে গেলেও এর মধ্যে এক হাজার ৫৫৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এখনো ৬৯০ জন বন্দি পলাতক রয়েছেন। তাদের গ্রেপ্তারে চেষ্টা চলছে।’
তবে নরসিংদী কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া ৮২৬ বন্দির মধ্যে ১৬৬ জনের বিষয়ে এখনো কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না বলেও জানান তিনি।
‘কারাগারে কাউকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে না’
কারাগারে কাউকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে আইজি প্রিজন বলেন, কারাগারে কাউকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে না। বর্তমানে দেশে ৭৫টি কারাগার রয়েছে। প্রতিটি কারাগারে খাবারের পরিমাণ ও মান নিয়ন্ত্রণ করা হয়। তবে ২১টি কারাগার সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে।
মাদক ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স
কারাগারে মাদক ঢোকানো এবং এ কাজে কারারক্ষীদের সহযোগিতার অভিযোগের বিষয়ে আইজি প্রিজন বলেন, মাদক ও আর্থিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে কারা বিভাগ জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে।
তিনি বলেন, গত দুই বছরে এসব ঘটনায় ২১ জনকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে, ৮২ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। এছাড়া ৮৭০ জনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের বিভাগীয় মামলা হয়েছে এবং ছোটখাটো অপরাধের কারণে ৩০৩ জনকে প্রশাসনিক ব্যবস্থায় বিভিন্ন বিভাগ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
‘কোনো কারারক্ষী মাদকসংক্রান্ত অপরাধে জড়িয়ে পড়লে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে’, বলেন তিনি।
‘রাজনৈতিক বন্দিদের মোবাইল ব্যবহারের সুযোগ নেই’
কারাগারে থাকা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা মোবাইলে কথা বলার সুযোগ পাচ্ছেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে আইজি প্রিজন বলেন, কারাগারে মোবাইল ব্যবহার হচ্ছে না—এটা একশ শতাংশ গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারব না। তবে বিশেষ করে কেরানীগঞ্জের বিশেষ কারাগারে, যেখানে রাজনৈতিক বন্দিরা রয়েছেন, সেখানে জ্যামার লাগানো আছে। কেউ মোবাইল নিয়ে প্রবেশ করলেও সেখান থেকে কথা বলার সুযোগ নেই। কথা বলার সুযোগ একদম নেই।
সব কারাগারকে ক্যামেরার আওতায় আনার পরিকল্পনা
আইজি প্রিজন জানান, দেশের ৭৫টি কারাগারে বর্তমানে কয়েক হাজার সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে বন্দিদের পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পরবর্তী লক্ষ্য হিসেবে সব কারাগারের বন্দিদের আরও আধুনিক ক্যামেরা এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করা হবে।
এছাড়া বন্দিদের থানায় নেওয়া-আসার সময় প্রিজন ভ্যানে আইপি ক্যামেরা স্থাপনের বিষয়ে পুলিশকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রিজন ভ্যান পুলিশের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয় বলেও জানান তিনি।
বন্দিদের ভার্চুয়াল হাজিরার ব্যবস্থাও চালু করা হয়েছে বলে জানান আইজি প্রিজন।
কারাগারে ৩৭৯ বিদেশি বন্দি
দেশের বিভিন্ন কারাগারে বর্তমানে ৩৭৯ জন বিদেশি বন্দি রয়েছেন। এর মধ্যে ১৭০ জনের সাজা শেষ হয়েছে। সাজা শেষ হওয়া এসব বন্দির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
ইতোমধ্যে দুইজন বিদেশি বন্দি সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ভারতে ফিরে গেছেন বলেও জানান কারা মহাপরিদর্শক।
বিদেশি বন্দি মারা গেলে তাদের মরদেহ কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, গত দুই বছরে আমরা প্রায় ১৭টি বিদেশি বন্দির মরদেহ ব্যবস্থাপনা করেছি। এর মধ্যে দুটি মরদেহ ভারতে ফেরত পাঠাতে পেরেছি। বাকিগুলো আমরা এখানে সংরক্ষণ করেছি। আমাদের একটি নীতিমালা রয়েছে—সাধারণত তিন মাস পর মরদেহের বিষয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে তাদের পরিচয় ও অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করা হয়। বর্তমানে এ ধরনের তিনটি মরদেহ বিভিন্ন হিমাগারে সংরক্ষিত আছে। বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। আমরা আশা করছি, সরকার সিদ্ধান্ত দিলে তাদের বিষয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যেহেতু তাদের পরিবার বা সংশ্লিষ্ট দেশ থেকে কেউ মরদেহ নিতে আসছে না, তাই নিয়ম অনুযায়ী পরিচয় ও তথ্য সংরক্ষণ করা হবে।
