ধামরাই প্রতিনিধি : ধামরাই উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের কর্মকর্তাদের উদাসীনতা ও দায়িত্বহীনতার কারণে ১৭১টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বেশিরভাগ স্কুলের কয়েক হাজার শিক্ষার্থীর দ্বিতীয় টার্মিনাল মূল্যায়ন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র নিয়ে সংকট দেখা দিয়েছে। এতে মাশুল দিতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের।
সোমবার (১৭ আগস্ট) ইংরেজি পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের ঘাটতি, ত্রুটিপূর্ণ প্রশ্ন, প্রশ্নের অর্ধেক ছাপা হওয়া এবং এক শ্রেণির প্রশ্নপত্রের প্যাকেটের ভেতর অন্য শ্রেণির প্রশ্নপত্র ঢুকে যাওয়ার কারণে ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে প্রাথমিকের হাজারো কোমলমতি শিক্ষার্থীরা।
এ নিয়ে পুরো উপজেলা জুড়ে চলছে সমালোচনা। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে তৈরি করা প্রশ্নপত্রে কীভাবে এমন ভুল হতে পারে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এটি শিক্ষা অফিসের কর্মকর্তাদের ভুল, নাকি দায়িত্বজ্ঞানহীনতার বহিঃপ্রকাশ তা নিয়েও আলোচনা চলছে।
১৭ আগস্ট সকালে একযোগে পুরো ধামরাই উপজেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা শুরু হয়। প্রশ্নপত্রের প্যাকেট খোলার পরই এক ধরনের গোলযোগের সৃষ্টি হয়। শুরু হয় পরীক্ষাকেন্দ্রে চরম বিশৃঙ্খলা। ধীরে ধীরে পুরো উপজেলায় ছড়িয়ে পড়ে এমন পরিস্থিতি।
এক শ্রেণির মূল্যায়ন পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের প্যাকেটের ভেতর ঢুকে গেছে অন্য শ্রেণির প্রশ্ন। প্রথম শ্রেণির প্রশ্নের প্যাকেটে ছিল চতুর্থ শ্রেণির প্রশ্ন। কোথাও প্যাকেটের ভেতর প্রশ্নপত্রের সংখ্যা ছিল কম। আবার কোনো কোনো প্যাকেটের প্রশ্নপত্র পুরোপুরি ছাপা হয়নি। প্রশ্নপত্রের অর্ধেক অংশ ছাপা হলেও বাকি অর্ধেক ছিল ফাঁকা। এছাড়াও বেশিরভাগ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের তুলনায় প্রশ্নপত্রের সংখ্যা কম ছিল।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রশ্ন স্ব স্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা কয়েকটি বিদ্যালয়, এমনকি কয়েকটি ইউনিয়নের বিদ্যালয় মিলে তৈরি করতে পারে। বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা প্রশ্ন তৈরি করে প্রধান শিক্ষকের মাধ্যমে একটি করে প্রশ্নের কপি গোপনীয়তা রক্ষা করে উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে জমা দেবেন।
কিন্তু সেই মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা উপেক্ষা করে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস প্রথম প্রান্তিক মূল্যায়ন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরি করে। বিনিময়ে প্রতিটি স্কুল থেকে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির প্রশ্ন তৈরির জন্য জনপ্রতি ৫ টাকা এবং তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির প্রশ্ন তৈরির জন্য জনপ্রতি ৬ টাকা করে নেওয়া হয়।
তবে দ্বিতীয় প্রান্তিক মূল্যায়ন পরীক্ষার প্রশ্ন তৈরি করবে না বলে জানিয়েছিলেন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মোবাখখারুল ইসলাম মিজান। কিন্তু পুনরায় মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অমান্য করে দ্বিতীয় প্রান্তিক মূল্যায়ন পরীক্ষার জন্য প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির প্রশ্ন তৈরিতে জনপ্রতি ১০ টাকা এবং তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির প্রশ্নের জন্য জনপ্রতি ১২ টাকা করে প্রতিটি স্কুল থেকে নেওয়া হয়।
এতে উপজেলা শিক্ষা অফিস পরীক্ষার নামে কয়েক লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ধামরাই উপজেলায় ১৭১টি বিদ্যালয়ে প্রায় ৫০ হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে বলে জানা গেছে।
জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, টাকা হাতিয়ে নিতেই কি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মোবাখখারুল ইসলাম মিজান ও সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তারা এমন কাজ করেছেন?
সরেজমিনে জানা গেছে, উপজেলার ভাড়ারিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির প্যাকেটে দ্বিতীয় শ্রেণির ইংরেজি প্রশ্ন এবং দ্বিতীয় শ্রেণির প্যাকেটে প্রথম শ্রেণির বাংলা প্রশ্ন ছিল। প্রথম শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ২২ জন এবং দ্বিতীয় শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ছিল ৪২ জন। প্রশ্নপত্র কম ছিল ২০টি।
একই সমস্যা দেখা যায় সোমভাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও। চাপিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও একই সমস্যা দেখা গেছে। তেতুলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় শ্রেণির ইংরেজি প্রশ্ন কম ছিল ৬টি। জয়পুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রশ্ন কম ছিল ৫টি। অপরদিকে, জালসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় শ্রেণির প্রশ্ন কম ছিল ১৭টি।
প্রশ্ন বাজারে ফটোকপি করার জন্য পাঠানো হয়। এদিকে ১৭ জন শিক্ষার্থীকে আলাদা কক্ষে অপেক্ষা করানো হয়। গাওয়াইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রশ্ন কম ছিল ৭টি। চন্দ্রপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা প্রশ্নের প্যাকেটের ভেতর ছিল বাংলা প্রশ্ন। আবার প্রশ্নও ছিল ৫টি কম। প্রায় সব স্কুলেই প্রশ্ন কম থাকায় ৩০ থেকে ৪০ মিনিট অপেক্ষা করতে হয়েছে শিক্ষার্থীদের।
অপরদিকে, ছিল প্রশ্নপত্রের সংকট। কোনো কোনো বিষয়ে ১০টি, আবার কোনো বিষয়ে ২০টি প্রশ্নপত্র কম ছিল। তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে। বিদ্যুৎ না থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে শিক্ষার্থীদের জন্য বিকল্প উপায়ে প্রশ্ন ফটোকপি করা বা প্রশ্ন তৈরি করা সম্ভব হয়নি। ফলে দীর্ঘ সময় প্রশ্নপত্রের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের।
এ বিষয়ে শিক্ষকদের মাঝেও চলছে নানা ধরনের সমালোচনা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক অভিযোগ করে বলেন, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যে প্রশ্নপত্র সরবরাহ করা হয়েছিল, তার মধ্যে উলটাপালটা প্যাকেট ছিল। এ বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের পক্ষ থেকে সুষ্ঠু তদারকি করা হয়নি। এ নিয়ে শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মোবাখখারুল ইসলাম মিজান ও সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তাদের দায়িত্বহীনতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অপরদিকে, সঠিক সময়ে প্রশ্নপত্র না পাওয়ায় শিক্ষার্থীরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। বিঘ্নিত হয় পরীক্ষার পরিবেশ।
এদিকে অভিভাবকরাও তাদের সন্তানদের নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তারা জানান, শিক্ষা অফিসের সরবরাহ করা প্রশ্নপত্রে এমন ঘটনা ঘটেছে, তা চিন্তাও করা যায়নি। এই ধরনের কাণ্ডজ্ঞানহীন ভুলের মাশুল কোমলমতি শিশুদের দিতে হচ্ছে। শিক্ষা অফিসের কর্মকর্তাদের এমন ঘটনা মেনে নেওয়া যায় না। কেন এমন ভুল হলো এবং এর মাশুল শিক্ষার্থীদের দিতে হচ্ছে এ বিষয়ে তদন্ত করে সঠিক তথ্য বের করা উচিত।
প্রশ্নপত্রের বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মোবাখখারুল ইসলাম মিজানকে তার মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
