স্টাফ রিপোর্টার : সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী ও বিভিন্ন অংশীজনের মতামত নেবে সংবিধান সংশোধনে গঠিত জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি। সংবিধানের একটি গ্রহণযোগ্য সংশোধনী আনতে সবার মতামতের ভিত্তিতে সামনে এগোনোর কথা বলছে কমিটি। একই সঙ্গে জুলাই সনদ সামনে রেখে সংবিধান সংশোধনের কথা বললেও বিদ্যমান সংবিধান পুরোটাই পর্যালোচনা করার কথা জানিয়েছেন তারা।
গতকাল মঙ্গলবার সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত কমিটির প্রথম বৈঠক শেষে এ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন কমিটির সভাপতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ ও সদস্য আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। জুলাই সনদ বাস্তবায়নে পদ্ধতিগত মতবিরোধের কারণে এই কমিটিতে নাম দেয়নি জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট। ক্ষমতাসীন বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট বলছে, জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় সই করা সনদের আলোকে তারা সংবিধান সংশোধন করবে। অন্যদিকে বিরোধী জোটের নেতারা বলছেন, গণভোটে পাস হওয়া জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বিদ্যমান সংবিধানকে সংস্কার করতে হবে। এই বিরোধের ফলে বিরোধী জোট এই কমিটি প্রত্যাখ্যান করলেও ক্ষমতাসীন জোটের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা বিরোধী দলের জন্য পাঁচটি পদ ফাঁকা রেখেছে। যখন নাম দেবে, তখনই তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
এর আগে ২০১১ সালের ৩০ জুন সংসদে পাস হওয়া পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়েই তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও সংসদের প্রধান বিরোধী দল বিএনপির মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। তখন সরকারের তরফে সংবিধান সংশোধনে গঠিত কমিটিতে বিরোধী দল বিএনপিকে আহ্বান জানালেও তারা অংশ নেয়নি। পরে বিএনপিকে বাদ দিয়েই ওই কমিটির সুপারিশে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী প্রস্তাব পাস হয়। পরে ওই সংশোধনীর মাধ্যমে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা’ বিলুপ্ত হয়। সম্প্রতি আদালতের রায়ে পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল হওয়ায় সংবিধানে পুনরায় ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা’ ফিরে আসার পথ উন্মুক্ত হয়েছে।
এবার সংবিধান সংশোধনে গঠিত ১২ সদস্যের এই কমিটির প্রথম বৈঠকে গতকাল চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলনের সদস্য মো. অলি উল্লাহ উপস্থিত ছিলেন না। কমিটির অন্য সদস্যরা সবাই বিএনপি ও তাদের মিত্র দলের সদস্য। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বৈঠক শুরু হয়ে শেষ হয় দুপুর দেড়টার দিকে। বৈঠকে কিছুক্ষণের জন্য উপস্থিত ছিলেন কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমেদ।
বৈঠক থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের তিনি জানান, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী ও বিভিন্ন অংশীজনের মতামত নেবে কমিটি। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আগ্রহ প্রকাশ করলেও তাদের মতামত নেওয়া হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামোর গণতান্ত্রিক সংস্কারের যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো সংশোধনী প্রস্তাবে রাখার চেষ্টা করবে কমিটি। কমিটি কতদিনের মধ্যে সংসদে প্রতিবেদন জমা দেবে, সেটা এখনও নিশ্চিত নয়। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে যে পাঁচটি নাম দেওয়ার কথা ছিল, এক পর্যায়ে হয়তো তারা নাম দেবে। সেটা হলে তাদের সঙ্গেও আলোচনা হবে। বিরোধী দল নাম না দিলেও তাদের সংসদ সদস্যদের পরামর্শ থাকলে সেগুলো গ্রহণ করবে বিশেষ কমিটি।
এক প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, জুলাই সনদের ৪৮ প্রস্তাবের মধ্যে অনেক কিছু আছে। রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হিসেবে জুলাই জাতীয় সনদে যেগুলো আছে, তা নেওয়া হবে। আর যেগুলোতে আপত্তি দেওয়া (নোট অব ডিসেন্ট) হয়েছে, সেগুলো আপত্তি আকারে বিবেচনা করা হবে।
তিনি আরও বলেন, এর বাইরেও আমাদের অনেক বক্তব্য আছে। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার আছে। সেগুলো ধারণ করা হবে। যেগুলো জুলাই জাতীয় সনদে প্রতিফলিত হয়নি। আলোচিত হয়েছিল হয়তো প্রতিফলিত হয়নি। সেগুলো আমরা আলোচনা করেই নেব।
বৈঠক শেষে কমিটির সদস্য ও আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যে আলোচনা হয়েছিল, সেটিকে ধারণ করেই জুলাই সনদ দেওয়া হয়েছে। এই আলোচনা সামনে রেখেই আমরা কাজ করব। এই দুটির মধ্যে কোনো পার্থক্য এবং বিভেদের জায়গা আমি দেখি না। তিনি জানান, পুরো সংবিধানই পর্যালোচনা করতে হবে। শুধু আবেগ দিয়ে, জুলাই সনদকে এড়িয়ে নিজস্ব রাজনৈতিক মতাদর্শ বা অন্য কিছু চাপিয়ে দেওয়া হবে না। জুলাই সনদের প্রতিটি অনুচ্ছেদ অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হবে।
বিরোধী দল কমিটিতে নাম না দিলে সংশোধন কতটুকু বাস্তব সম্মত হবে– এমন প্রশ্নে আইনমন্ত্রী বলেন, বিরোধী দলের সুপারিশ নেওয়ার জন্য যা যা করণীয় সব করা হবে। বিরোধী দলের সুপারিশ জুলাই সনদের মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত আছে। কারণ জুলাই সনদ সই করেছে ৩৩টি রাজনৈতিক দল, তার মধ্যে বিরোধী দলের সব সুপারিশ সেখানে আছে।
পঞ্চদশ সংশোধনীর আগে গঠন করা বিশেষ কমিটিতেও বিরোধী দল ছিল না। এর পরিপ্রেক্ষিতে দেশে কী পরিস্থিতি হয়েছিল তা সবাই দেখেছে, এবারও সে রকম হওয়ার শঙ্কা আছে কিনা– এমন প্রশ্নে আইনমন্ত্রী বলেন, জুলাই সনদে অঙ্গীকারনামা আছে। সেখানে সব দল সই করেছে। কিন্তু পঞ্চদশ সংশোধনীতে বিরোধী দল এ রকম কোনো অঙ্গীকারনামায় সই করেনি।
জুলাই সনদ ‘কমপ্লিট কোড অব পলিটিক্যাল গাইডলাইন’ আখ্যা দিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, এ ক্ষেত্রে আমরা ওই আলোকে যাচ্ছি কিনা, তারা (বিরোধী দল) বাইরে থেকে এটাকে পর্যবেক্ষণ করবে। তারা যদি মনে করে জুলাই সনদের ব্যত্যয় ঘটেছে, অবশ্যই সেটার সমালোচনা করার অধিকার তারা রাখে। যৌক্তিক যে কোনো সমালোচনা কমিটি আমলে নেওয়ার চেষ্টা করবে।
এক প্রশ্নের জবাবে কমিটির সদস্য ও চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেন, সংবিধান সংশোধন আমরা আগামী এক বা দুই বছরের জন্য নয়, আগামী প্রজন্মের জন্য করতে চাই। তারা যেন এর সুফল ভোগ করে। সংবিধান সংশোধন কমিটিতে বিরোধী দল আসবে– এমন আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, তাদের প্রায় সবাই নতুন সদস্য। সিদ্ধান্ত নিতে তাদের সময় লাগতে পারে, তাদের জন্য দরজা সব সময় খোলা।
বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন কমিটির সদস্য জয়নুল আবেদীন, জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, আন্দালিব রহমান পার্থ, নুরুল হক নুর, মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, ফারজানা শারমিন, সাকিলা ফারজানা ও মাহমুদুল হক রুবেল।
