মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ রাত
MENU
#
ফিরে দেখা রক্তাক্ত ৫ আগস্ট সাভার-আশুলিয়া যুদ্ধক্ষেত্র, থানায় ৬টি মরদেহ পোড়ানোর ঘটনা নির্মম নিষ্ঠুর ইতিহাসে হয়ে থাকবে
daily-fulki

ফিরে দেখা রক্তাক্ত ৫ আগস্ট সাভার-আশুলিয়া যুদ্ধক্ষেত্র, থানায় ৬টি মরদেহ পোড়ানোর ঘটনা নির্মম নিষ্ঠুর ইতিহাসে হয়ে থাকবে

হাসানুর ইসলাম সুজন

স্টাফ রিপোর্টার :  আজ মহান জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস। বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গৌরবময় দিন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, সোমবার এক অবিস্মরণীয় বিজয়ে দিন। দীর্ঘবছর আন্দোলন-সংগ্রামের প্রত্যাশিত বিজয়ের আনন্দের দিন। অনেক জীবন ও অঙ্গহানী এবং জেল-জুলুমের  পথ মাড়িয়ে এ অর্জন। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সাভারবাসীর জন্য আজ এক নারকীয় দিন। এ দিন ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতন হলেও পৈশাচিকভাবে আন্দোলরত মুক্তিকামীদের হত্যা করে তাদের মধ্য থেকে ৬টি লাশ আশুলিয়া থানায় পুড়িয়ে ফেলে পুলিশ। এ নির্মম, নিষ্ঠুর ঘটনায় সাবেক এমপি সাইফুল ইসলাম, ওসি এএফএম সায়েদসহ ৬ জনের ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।।   


৫ আগস্ট সোমবার দুপুরেরদিকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লেও রাজধানীর উপকণ্ঠ সাভার ও আশুলিয়ার পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। সকাল থেকে শুরু হওয়া উত্তেজনা বিকেল ও সন্ধ্যায় রূপ নেয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। হাসপাতাল সূত্রে পরবর্তী হিসাব অনুযায়ী, ওই দিনের সংঘর্ষে সাভার ও আশুলিয়া এলাকায় অন্তত ৩৬ জন নিহত হন, যাদের অধিকাংশই গুলিবিদ্ধ ছিলেন। প্রথমদিন বিভিন্ন হাসপাতালে তুলনামূলক কমসংখ্যক মরদেহ এলেও পরবর্তী দুই দিনে আহতদের মৃত্যুর ফলে নিহতের সংখ্যা বাড়তে থাকে।


স্বাধীনতা যুদ্ধে ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলেও রাজধানীর মিরপুর এলাকাটি দীর্ঘ সময় অস্ত্রধারী বিহারী ও অবরুদ্ধ পাকিস্তানি দোসরদের দখলে ছিল। ১৬ ডিসেম্বরের পরও প্রায় দেড় মাস তথা ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে এই এলাকাটি সম্পূর্ণ শত্রুমুক্ত হয়। তদ্রুপ ৫ আগস্ট দুপুর থেকেই ঢাকায় বিজয়ের পতকা পতপত করে উড়লেও সাভারে যুদ্ধ চলে সন্ধ্যা পর্যন্ত।
 

৫ আগস্ট সকাল থেকে বাড়তে থাকে উত্তেজনা


সকালে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে সাভার, আশুলিয়া, হেমায়েতপুর, নবীনগর, বাইপাইল ও আশপাশের এলাকা থেকে হাজারো মানুষ সড়কে নেমে আসেন। বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সমর্থকদের সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়। সকাল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পুরো এলাকায় চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যান চলাচল কার্যত অচল হয়ে যায়।
 

দুপুরে সাভার বাসস্ট্যান্ড ও থানা এলাকায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ


দুপুরের পর সাভার বাসস্ট্যান্ড, থানা সড়ক, পাকিজা এলাকা ও আশপাশে সংঘর্ষ তীব্র আকার ধারণ করে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, ইটপাটকেল নিক্ষেপ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, টিয়ারশেল, শব্দবোমা এবং গুলির শব্দে পুরো এলাকা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। আহতদের একের পর এক বিভিন্ন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতাল সূত্র জানায়, নিহতদের অধিকাংশের শরীরে আগ্নেয়াস্ত্রের গুলির চিহ্ন ছিল। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সাভারের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ যুদ্ধক্ষেত্রের মতো হয়ে ওঠে।
 

বিকেলে ক্ষমতার পালাবদল, কিন্তু থামেনি সহিংসতা


দুপুরের পর শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়লেও সাভার-আশুলিয়ায় সহিংসতা থামেনি। বরং বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা, থানা ও রাজনৈতিক কার্যালয় ঘিরে উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছোটাছুটি শুরু করেন।
সন্ধ্যায় সাভার থানা ঘিরে ভয়াবহ পরিস্থিতি


দিনের সবচেয়ে আলোচিত ও মর্মান্তিক ঘটনাগুলোর একটি ঘটে সন্ধ্যারদিকে সাভার থানা এলাকায়। থানা ঘিরে তখন বিপুল সংখ্যক বিক্ষোভকারী অবস্থান নেন। একপর্যায়ে পুলিশ সদস্যরা থানা ত্যাগ করে বেরিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নিলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।


ওই সময় থানা থেকে বের হওয়ার পথে পুলিশ সদস্যদের গুলিবর্ষণের ঘটনায় এলাকাজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। 
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গুলির শব্দে চারদিকে ছুটোছুটি শুরু হয় এবং মুহূর্তের মধ্যেই বহু মানুষ মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। অনেকে ঘটনাস্থলেই গুরুতর আহত হন, আবার অনেককে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। হাসপাতালগুলোতে স্বজনদের আহাজারি, রক্তাক্ত আহতদের আর্তনাদ এবং একের পর এক মরদেহ পৌঁছানোর দৃশ্য পুরো এলাকাকে শোক ও আতঙ্কে স্তব্ধ করে দেয়।


সন্ধ্যার পর থেকে রাত পর্যন্ত সাভারের বিভিন্ন সড়কে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা রক্তের দাগ, ফেলে যাওয়া জুতা, ব্যাগ ও ব্যক্তিগত সামগ্রী দিনের ভয়াবহতার নীরব সাক্ষী হয়ে থাকে। ওই দিনের ঘটনায় বহু পরিবার তাদের প্রিয়জনকে হারায়, আবার অনেকেই স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেন। সাভার থানার সামনে ও আশপাশের এলাকায় এবং ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের রেডিও কলোনী পর্যন্ত পুলিশ গুলি বর্ষন করতে থাকে। পরবর্তীতে তারা সাভার ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় পুলিশ আশ্রয় নেন বলে জানা যায়। ওই গুলিবর্ষণ ছিল দিনের সবচেয়ে আলোচিত ও প্রাণঘাতী ঘটনাগুলোর অন্যতম। 
 

আশুলিয়ায় ৬টি মরদেহ পোড়ানোর ঘটনা নাড়া দেয় বিশ্ববাসীকে


৫ আগস্টের সবচেয়ে নৃশংস ও আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ছিল আশুলিয়া থানা সংলগ্ন এলাকায় ৬টি মরদেহ আগুন দিয়ে পোড়ানোর ঘটনা। দিনের সংঘর্ষ শেষে যখন বিভিন্ন স্থানে নিহতদের মরদেহ পড়ে ছিল, তখন ওই এলাকায় সংঘটিত এই বিভীষিকাময় ঘটনা দেশজুড়ে গভীর শোক, ক্ষোভ ও উদ্বেগ সৃষ্টি করে।
প্রথমদিকে ঘটনাটি নিয়ে নানা ধরনের তথ্য ও আলোচনা থাকলেও পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত ভিডিও, তদন্তে উঠে আসা তথ্য এবং আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানে ঘটনাটি বিশেষ গুরুত্ব পায়। ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে আশুলিয়া থানা সংলগ্ন এলাকায় কয়েকটি মরদেহে আগুন দেওয়ার দৃশ্য সামনে আসে, যা দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।


এই ঘটনাকে শুধু ওই দিনের সহিংসতার একটি অংশ নয়, বরং পুরো জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের সবচেয়ে ভয়াবহ ও মানবিক বিবেককে নাড়া দেওয়া ঘটনাগুলোর অন্যতম হিসেবে দেখা হয়। নিহতদের স্বজনদের অনেকেই আজও জানতে চান, কীভাবে এবং কোন পরিস্থিতিতে তাদের প্রিয়জনদের মরদেহ এমন নির্মম পরিণতির শিকার হয়েছিল। ঘটনাটি ঘিরে এখনও বিচারিক কার্যক্রম ও তদন্ত চলমান রয়েছে এবং এর পূর্ণাঙ্গ সত্য উদঘাটনের অপেক্ষায় রয়েছে দেশবাসী।
 

হাসপাতালগুলোতে লাশের সারি


এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, আশুলিয়া নারী ও শিশু হাসপাতাল এবং স্থানীয় কয়েকটি হাসপাতালে নিহত ও আহতদের ঢল নামে। প্রথম দিনের তুলনায় পরবর্তী দুই দিনে আহতদের মৃত্যুর কারণে মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৩৬ জনে পৌঁছায় বলে হাসপাতাল সূত্র জানায়। জরুরি বিভাগগুলোতে চিকিৎসকদের নিরলস চেষ্টা, স্বজনদের আহাজারি এবং রক্তদানের জন্য মানুষের দীর্ঘ সারি সেদিনের নির্মম বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে।
 

আজও রয়ে গেছে বহু প্রশ্ন
 

৫ আগস্টের সাভার-আশুলিয়ার ঘটনায় ঠিক কতজন কোথায় নিহত হয়েছেন, কোন পরিস্থিতিতে প্রাণ হারিয়েছেন এবং কারা কোন ঘটনার জন্য দায়ী, তার অনেক বিষয় এখনও তদন্ত, আদালত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার অধীনে রয়েছে। ওই দিনের সহিংসতায় নিরাপত্তা বাহিনীর শক্তি প্রয়োগের অভিযোগ যেমন আলোচনায় এসেছে, তেমনি বিভিন্ন স্থানে ক্ষুব্ধ জনতার হামলায় পুলিশ সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে। ফলে পুরো দিনের ঘটনাপ্রবাহের পূর্ণাঙ্গ সত্য ও দায় নির্ধারণ এখনও বিচারিক প্রক্রিয়ার বিষয়।
 

ইতিহাসের এক রক্তাক্ত দিন


৫ আগস্ট ২০২৪ শুধু ক্ষমতার পালাবদলের দিন নয়, সাভার ও আশুলিয়ার মানুষের কাছে এটি বহু পরিবারের স্বজন হারানোর দিন। সেই দিনের গুলির শব্দ, আতঙ্ক, হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ভিড় এবং সন্ধ্যার পরের বিভীষিকাময় দৃশ্য এখনও অনেক প্রত্যক্ষদর্শীর স্মৃতিতে জীবন্ত।
ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটন, দায়ীদের জবাবদিহি এবং নিহতদের জন্য ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা এখনও সাভার-আশুলিয়ার অসংখ্য মানুষের প্রধান দাবি। ইতিহাসের পাতায় ৫ আগস্ট তাই শুধু একটি স্বৈরাচার সরকার পতনের দিন নয়, বরং সাভার-আশুলিয়ার মানুষের কাছে এক গভীর বেদনা, রক্তপাত এবং অপূরণীয় ক্ষতির দিন হিসেবেই চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
 

সর্বাধিক পঠিত