রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ রাত
MENU
#
আশুলিয়ায় কলেজছাত্রের মৃত্যু: পরিবারের দাবি হত্যা
daily-fulki

আশুলিয়ায় কলেজছাত্রের মৃত্যু: পরিবারের দাবি হত্যা


স্টাফ রিপোর্টার : বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন কলেজছাত্র আনন্দ রয় বাসফোর। খানিক বাদে জানিয়েছিলেন, ঘুরতে যাচ্ছেন না—ফিরবেন বাড়ি।
এর পরই বন্ধ হয়ে যায় যোগাযোগ। দুদিন বাদে লাশ মেলে ঢাকার আশুলিয়ার রেডিও সেন্টারের ডোবা থেকে।


আনন্দ (২০) সাভার উপজেলার আশুলিয়া থানা এলাকার শিমুলিয়া ইউনিয়নের গোহাইলবাড়ি এলাকার আব্দুল মান্নান ডিগ্রি কলেজের এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।
তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন গত বছরের ৮ জুন, রাত ৮টার দিকে। লাশ উদ্ধার হয় ১০ জুন। পরদিন অচেনা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করেন আনন্দের মা মালতি রানী।
এরপর আনন্দের দুই প্রতিবেশী হুমায়ুন কবির ও হৃদয় আহম্মেদকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।


পরে তদন্তে উঠে আসে হুমায়ুন, হৃদয়সহ কয়েকজনের সঙ্গে কেবল চুরি করতে গিয়েছিলেন আনন্দ। পল্লী বিদ্যুৎ অফিস ও সেখানকার বাজারের নিরাপত্তা প্রহরীদের টহলে পানিতে ঝাঁপ দেন তারা। পরে পানিতে ডুবে মারা যান সাঁতার না জানা আনন্দ।


হুমায়ুন ও হৃদয়কে অব্যাহতির সুপারিশ করে গত ২৭ মার্চ আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন আশুলিয়া থানার এসআই আতোয়ার রহমান।
তবে চুরির তথ্য মানতে নারাজ আনন্দের পরিবার। তাদের দাবি, আনন্দকে খুন করা হয়েছে।


পুলিশের দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনে গত ১৯ আগস্ট নারাজি দেন আনন্দের মা। তাতে বলা হয়, তদন্ত কর্মকর্তা ‘উদ্দেশ্যেমূলকভাবে’ মামলাটি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে আসামিদের অব্যাহতি দিয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছেন।


ঢাকার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তাজুল ইসলাম সোহাগ নারাজি আবেদন মঞ্জুর করে পিবিআইকে অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন। এ প্রতিবেদন ১ অক্টোবরের মধ্যে জমা দিতে বলা হয়। তবে ওইদিন পিবিআই প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি।


প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই বিশ্বজিৎ দেবনাথ বলেন, সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তাজুল ইসলাম সোহাগ আগামী ১৬ নভেম্বর প্রতিবেদন জমার পরবর্তী দিন ঠিক করে দিয়েছেন।
আশুলিয়া থানার এসআই আতোয়ার রহমান বলেন, “আসলে এটা ছিল একটা চুরির ঘটনা। রেডিও কলোনি এলাকায় ক্যাবল চুরি করতে যায়।
“পরে পানিতে ডুবে মারা গেছে। হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেনি। এজন্য আসামিদের অব্যাহতির সুপারিশ করে আদালতে প্রতিবেদন দিয়েছি।”


চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, মামলার ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে গ্রেপ্তার হুমায়ুন, হৃদয়, ভুক্তভোগী আনন্দ এবং তাদের সহযোগী ফরিদ আহম্মেদ ৮ জুন রাতে শাবল ও কোদাল নিয়ে কবিরপুর রেডিও সেন্টারের ভেতরে ক্যাবল চুরি করার জন্য যায়। তারা তাদের স্যান্ডেল সেন্টারের সীমানাপ্রাচীরের পাশে রেখে মাটি খুঁড়ে ক্যাবল বের করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
তখন কবিরপুর পল্লীবিদ্যুৎ অফিস ও বাজারের নিরাপত্তা প্রহরীরা টর্চ লাইট মারলে ওই তরুণরা সীমানাপ্রাচীরের কাছে যাওয়ার জন্য লেকের পানিতে নেমে সাঁতরে পালিয়ে যান। কিন্তু আনন্দ সাঁতার না জানায় তিনি পানিতে ডুবে মারা যান। লাশের ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে আনন্দ পানিতে ডুবে মারা গেছে বলে চিকিৎসক মতামত দিয়েছেন।


আনন্দের বোন রূপালী রানী বলেন, “গত বছরের কোরবানি ঈদের পরদিন আমার ভাই বলে, ঘুরতে যাবে। এরপর আর কিছু জিজ্ঞাসা করিনি। রাত ৮টার পর নিজের আইফোন আর ১০ হাজার টাকা নিয়ে সে বের হয়ে যায়। পরে ফোন করলে বলে, পিকনিকে নাও যেতে পারে। আমরা তাকে বাড়ি ফিরে আসতে বলি। সে বলে আসবে।


“রাত ৯টার পর ফোন দিলে তা বন্ধ পায়। রাতে আমার ভাই আসে না। সারারাত অপেক্ষা করি। পরদিন বিকেল বেলা কবিরকে ডেকে ভাইয়ের কথা জিজ্ঞাসা করি। সে কিছু বলে না। অন্তত ১৭ বার তার কাছে ভাইয়ের কথা জিজ্ঞাসা করি। কিন্তু বলে না। জিজ্ঞাসাবাদের সময় ওর ফোন আসে। বাইরে চলে যায়, ফিসফিস করে কী যেন বলে। তার কথাবার্তা শুনে সন্দেহ হয়।”


তিনি বলেন, “এভাবে দুইদিন চলে গেল। সকালবেলা আমরা জিডি করতে যাব। তখন এসে কবির আমাদের বলছে, বাগানটা (রেডিও কলোনির বাগান) দেখেন। তার শাশুড়িও একই কথা বলে। পরে কবির আমার ছোট ভাইকে ডাক দিয়ে জঙ্গলে নিয়ে যায়।


“আমার ভাই তিন দিন ধরে পানিতে পড়ে আছে। তার শরীর ফুলে গেছে, মুখ লাল হয়ে গেছে। তাকে দেখেই চিনে ফেলে কবির। কেমনে চিনলো ও আমার ভাইকে। এসব বিষয় নিয়ে আমাদের সন্দেহ।”


রূপালী রানী বলেন, “এলাকার লোকজনের সাথে কবিরের ঝগড়া হলে তাকে খুনি বলে ডাকে। আনন্দকে খুন করেছে, এটা সবাই বলে। রাগের সময় কবিরও বলে আনন্দকে খুন করেছি।”
তিনি বলেন, “আমার ভাই নাকি কারেন্টে শক খায়! ওরা ৪-৫ জন এক সাথে গেল, আর আমার ভাই শুধু মারা গেল? বলতেছে ক্যাবল চুরি করতে গিয়ে মারা গেছে। এটা বদনাম রটিয়েছে। আমার ভাই কখনো চুরি করতে পারে না।


“বন্ধু-বান্ধব মিলে আমার ভাইটাকে নষ্ট করেছে। সেখানে গিয়ে তারা মারামারি করে আমার ভাইকে মেরে ফেলেছে। ওর গলায় আঘাতের চিহ্ন আছে। আমার ভাইকে ওরা খুন করেছে। আমরা সুষ্ঠু বিচার চাই।”


রূপালী অভিযোগ করে বলেন, “দেড় মাস হয়ে গেল, মামলার তদন্ত পেয়েছে পিবিআই। কিন্তু আমাদের সাথে কেউ এখনো যোগাযোগ করেনি। আশঙ্কায় থাকি কী হয় না হয়!”
আসামি হুমায়ুন কবিরের আইনজীবী জহিরুল ইসলাম বলেন, “মেডিকেল রিপোর্টে আসছে, ভিকটিম পানিতে ডুবে মারা গেছে। তার শরীরের আঘাতের কোনো চিহ্ন নাই।
“তার পরও বাদী নারাজি দিছে। কোর্ট পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দিছে। দেখা যাক কী হয়!”
 

সর্বাধিক পঠিত