Home ঢাকা জেলা জাবিতে ধর্ষণের প্রতিবাদের নতুন প্ল্যাটফর্ম ‘নিপীড়নবিরোধী মঞ্চ’

জাবিতে ধর্ষণের প্রতিবাদের নতুন প্ল্যাটফর্ম ‘নিপীড়নবিরোধী মঞ্চ’

0

জাবি প্রতিনিধি : জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বামীকে হলে আটকে স্ত্রীকে দলবেঁধে ধর্ষণের পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্যে নতুন প্ল্যাটফর্ম ‘নিপীড়িনবিরোধী মঞ্চ’ আত্মপ্রকাশ করেছে।

ছাত্রলীগের এক নেতা ও তার সহকর্মীর বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ উঠার পরদিন রোববার সকাল থেকেই লাগাতার প্রতিবাদ-বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠে আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়টির ক্যাম্পাস।

এরই ধারাবাহিকতায় সোমবার বেলা সাড়ে ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে ধর্ষণ ও নিপীড়নবিরোধী ‘গণ পোস্টার লিখন’ কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা।

পরে দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন কলা ভবনের সামনে মানববন্ধন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থীরা। সেখান থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের হয়।

পরে দুপুর ২টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন কলা ভবনের ইংরেজি বিভাগের একটি কক্ষে চলমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনায় বসেন আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

সেখানে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ধর্ষণ ও নিপীড়নমূলক ঘটনাগুলোর বিচার নিশ্চিত করতে আন্দোলনের রূপরেখা বাস্তবায়নে ‘নিপীড়নবিরোধী মঞ্চ’ নামে প্ল্যাটফর্ম ঘোষণা করা হয়। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে দাবি জানানো হবে।

মঙ্গলবার মঞ্চের কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য একটি কমিটি ঘোষণা করার কথা রয়েছে।

জাবিতে ধর্ষণের প্রতিবাদের নতুন প্ল্যাটফর্ম ‘নিপীড়নবিরোধী মঞ্চ’

‘নিপীড়নবিরোধী মঞ্চ’ এর সংগঠকরা সাংবাদিকদের বলেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্প্রতি অন্যায়-অপকর্ম ও নিপীড়নের সংখ্যা আশঙ্কাজনকহারে বাড়ছে। শিক্ষক থেকে শুরু করে মীর মশাররফ হোসেন হলের পাশের জঙ্গলে বহিরাগত নারী ধর্ষণের মূল কারণ ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি’। এই সংস্কৃতি এখনই বন্ধ না করলে নিপীড়করা সাহস পেয়ে যাবে। এদের এখনই মূলোৎপাটন করতেই মঞ্চ গঠন করা হয়েছে।

মঞ্চের সংগঠক ও ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক পারভীন জলি সাংবাদিকদের বলেন, “সব নিপীড়ন ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়তে ‘নিপীড়নবিরোধী মঞ্চ’ গঠন করা হয়েছে।

যারা এই আন্দোলনকে পরিচালনা করবে তাদের নিয়ে মঙ্গলবার সকাল ১১টায় শহীদ মিনারের পাদদেশে মানববন্ধন ও সমাবেশ করা হবে বলে জানান পারভীন জলি।

ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক গোলাম রাব্বানী বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোনো অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রাথমিক বিভিন্ন ফ্যাক্ট ফাইন্ডিংস কমিটি গঠন করা হয়। সবার শেষে স্ট্রাকচার্ড কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি আগে গঠিত কমিটিরগুলোর প্রতিবেদনের ভিত্তিতে শাস্তির সিদ্ধান্ত নেয়।

“বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে স্ট্রাকচার্ড কমিটি গঠনের দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও তার বিচার নিশ্চিত করা হয়নি। উপাচার্য কমিটির প্রধান হয়েও বিচার করছেন না। আমরা স্পষ্টভাবে বলে দিতে চাই, এ ধরনের ঘটনার পুরোপরি দায় উপাচার্যকে নিতে হবে।”

‘ধর্ষকদের শাস্তির যেন বাস্তবায়ন হয়’

বিশ্ববিদ্যালয়ের মীর মশাররফ আবাসিক হলের ‘এ’ ব্লকের ৩১৭ নম্বর কক্ষে স্বামীকে আটকে রেখে স্ত্রীকে কৌশলে বোটানিক্যাল গার্ডেনে নিয়ে পালাক্রমে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ৪৫তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ও শাখা ছাত্রলীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান, তার পরিচিত মামুনুর রশীদ মামুনসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে।

পরে ভুক্তভোগীর স্বামী ছয়জনকে আসামি করে ঘটনার রাতেই আশুলিয়া থানায় ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন’ আইনে মামলা করেন।

এ ঘটনায় জড়িত শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণার পাশাপাশি সনদ স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি ধর্ষণের ঘটনা খতিয়ে দেখতে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

সেই শাস্তির যেন যথাযথ বাস্তবায়ন হয় তার দাবি করেছেন আন্দোলনকারীরা।

শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে ‘গণ পোস্টার লিখন’ চলাকালে নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী সোহাগী সামিয়া বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ষণের ঘটনার আগেও বহু নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিপীড়কদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়নি। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধরনের ঘটনা ঘটেই যাচ্ছে। আমরা ধর্ষকদের শাস্তি নিশ্চিত করাসহ এর আগের নিপীড়নের অমীমাংসিত ঘটনাগুলোরও বিচার নিশ্চিত করতে চাই।”

এরপর সেখান থেকে একটি মিছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা এলাকা হয়ে মীর মশাররফ হোসেন হলের সামনে যায় এবং সেখানে কিছুক্ষণ বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। পরে নতুন কলা ভবনের সামনে গিয়ে মিছিলটি শেষ হয়।

মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি চলাকালে শিক্ষার্থীরা ধর্ষণ ও নিপীড়নবিরোধী স্লোগান দিতে থাকেন।

মানববন্ধন চলাকালে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী ইব্রাহিম মৃধা বলেন, “যারা ধর্ষকদের আশ্রয় ও প্রশ্রয়দাতা তাদের আমরা হুঁশিয়ার করে দিতে চাই, এই ধরনের ঘটনার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ক্ষুণ্ণ হয়েছে। প্রশাসনের কাছে দাবি থাকবে, যেসব শাস্তি ধর্ষকদের দেওয়া হয়েছে তার যেন যথাযথ বাস্তবায়ন হয়। তা না হলে আরও কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।”

সজিবুর রহমান সজীব নামে আরেক শিক্ষার্থী বলেন, “বহিরাগত লোকদের প্রবেশে যে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে সেটি যেন বাস্তবে প্রতিফলন দেখা যায়। এ ছাড়া হল থেকে দ্রুততম সময়ে অছাত্রদের বের করতে হবে।”

থানায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অভিযোগ

এদিকে ধর্ষণের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন শুরু হলে রোববার বিকালে জরুরি সিন্ডিকেট সভা আহ্বান করে প্রশাসন। সেখানে ধর্ষণে জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলার সিদ্ধান্ত নেয় প্রশাসন।

তার পরিপ্রেক্ষিতে সোমবার বিকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে রেজিস্ট্রার আবু হাসান ধর্ষণে জড়িত সন্দেহভাজন ও তাদের পালাতে সহায়তাকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে আশুলিয়া থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকা জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস্ ও ট্রাফিক, উত্তর বিভাগ) মো. আব্দুল্লাহিল কাফী বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। এ ব্যাপারে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি।

“গ্রেপ্তারকৃতদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। বাকিদেরও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। আর ভুক্তভোগী নারী এখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে রয়েছেন।”

পুলিশ জানায়, ভুক্তভোগীর স্বামী শনিবার রাতেই বাদী হয়ে আশুলিয়া থানায় ছয়জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেছেন। সাভার ও আশুলিয়া থানা সমন্বয় করে আসামিদের চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে। বাকি দুজনকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

মামলায় মোস্তাফিজ ও মামুনুর রশীদের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ আনা হয়েছে। এ ছাড়া বাকি চারজনের বিরুদ্ধে মারধর ও আসামিদের পালাতে সহায়তা করার অভিযোগ আনা হয়েছে।

 

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Exit mobile version