একদিকে ভালো ভালো ব্যবসা করতে না পারা, অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে লভ্যাংশের সীমা বেঁধে দেয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ব্যাংকের শেয়ারের প্রতি বড় ধরনের অনীহা দেখা দিয়েছে। নামমাত্র দামেও অনেক ব্যাংকের শেয়ার কিনতে চাচ্ছেন না বিনিয়োগকারীরা। ফলে তালিকাভুক্ত ৩০টি ব্যাংকের মধ্যে ২৭টির শেয়ার দাম সর্বনিম্ন সীমায় বা ফ্লোর প্রাইসে এসে ঠেকেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ অবস্থা খুব একটা সন্তোষজনক নয়। ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট রয়েছে। আমানতের প্রবৃদ্ধি কমেছে। বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি দীর্ঘদিন ধরেই কমছে। ফলে ব্যাংকের ভবিষ্যৎ মুনাফা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সন্দেহ আছে। এ পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ব্যাংকের লভ্যাংশ ঘোষণার সীমা বেঁধে দেয়া হয়েছে। ফলে সার্বিকভাবে ব্যাংকের শেয়ার কিনতে চাচ্ছেন না বিনিয়োগকারীরা। ফলে শেয়ারের দাম কমে গেছে।

তারা বলছেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নির্ধারণ করে দেয়া ফ্লোর প্রাইসের (দাম কমার সর্বনিম্ন সীমা) কারণে ব্যাংকের শেয়ারের দরপতন ওইভাবে হয়নি। ফ্লোর প্রাইস না থাকলে ব্যাংকের শেয়ারের আরও ভয়াবহ দরপতন হতো।

বাংলাদেশে মহামারি করোনাভাইরাসের প্রকোপ শুরুর দিকে শেয়ারবাজারে ভয়াবহ দরপতন শুরু হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রতিটি কোম্পানির শেয়ারের ফ্লোর প্রাইস নির্ধারণ করে দেয় বিএসইসি। ফলে একটি নির্দিষ্ট সীমার নিচে শেয়ারের দাম কমার পথ বন্ধ হয়ে যায়।

একপর্যায়ে করোনাভাইরাসের প্রকোপ সামাল দিতে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে সরকার। এতে ২৬ মার্চ থেকে ৩০ মে পর্যন্ত টানা ৬৬ দিন বন্ধ থাকে শেয়ারবাজারের লেনদেন। এই বন্ধের মধ্যেই ব্যাংকের লভ্যাংশের সীমা বেঁধে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ফলে ২০১৯ সালের সমাপ্ত বছরের জন্য কোনো ব্যাংকই ১৫ শতাংশের বেশি নগদ এবং নগদ ও বোনাস শেয়ার মিলিয়ে ৩০ শতাংশের বেশি লভ্যাংশ দিতে পারবে না। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্ত আসার আগেই লভ্যাংশ ঘোষণা করা কয়েকটি ব্যাংক পরবর্তীতে তাদের লভ্যাংশে সংশোধনী এনে কমিয়ে দিয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে ৩১ মে শেয়ারবাজারে লেনদেন শুরু হলে একের পর এক ব্যাংকের শেয়ার দাম কমতে শুরু করে। প্রথমদিনের লেনদেনেই দাম কমে ১৬টি ব্যাংকের শেয়ার দাম ফ্লোর প্রাইস বা দাম কমার সর্বনিম্ন সীমায় এসে ঠেকে। পরের চার কার্যদিবসেই অব্যাহত থাকে ব্যাংকের শেয়ারের দরপতন। এতে বর্তমানে ২৭টি ব্যাংকের শেয়ার দাম ফ্লোর প্রাইসে এসে ঠেকেছে।

মাত্র তিনটি ব্যাংকের শেয়ার দাম ফ্লোর প্রাইসের ওপরে রয়েছে। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংকের ১০ পয়সা, মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ৬০ পয়সা এবং এনসিসি ব্যাংকের ২০ পয়সা ফ্লোর প্রাইস থেকে বেশি আছে। এ হিসাবে পরের কার্যদিবসে এই তিনটি ব্যাংকের শেয়ার দাম এই পরিমাণ কমতে পারবে। বাকি ২৭টি ব্যাংকের শেয়ার দাম কমার সুযোগ নেই।

ফ্লোর প্রাইস দিয়ে ব্যাংকের শেয়ারের ভয়াবহ দরপতন ঠেকানো গেলেও প্রতিদিনই বেশিরভাগ ব্যাংকের শেয়ার দাম অপরিবর্তিত থাকছে। সর্বনিম্ন দামেও বিনিয়োগকারীরা ব্যাংকের শেয়ার কিনতে চাচ্ছেন না। এর মধ্যে ১০টি ব্যাংকের শেয়ার দাম অভিহিত মূল্যের নিচে রয়েছে।

ব্যাংকের শেয়ার দামের এমন দুরবস্থার বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম  বলেন, ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ অবস্থা খুব একটা সন্তোষজনক না। অনেক ব্যাংক তারল্য সংকটে ভুগছে। আমানতের প্রবৃদ্ধি কমেছে। বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি অনেক কমে গেছে। এটা ক্রমশই কমছে অনেক দিন ধরে। এতে করে ব্যাংকের ভবিষ্যৎ মুনাফা নিয়ে স্বভাবতই সন্দেহের অবকাশ আছে। এ কারণে বিনিয়োগকারীরা ব্যাংকের শেয়ার কিনতে এ মুহূর্তে আগ্রহী নন। চাহিদা না থাকলে স্বাভাবিক নিয়মে যেকোনো কিছুর দাম কমে। ব্যাংকের শেয়ারেও দাম কমেছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে লভ্যাংশের সীমা বেঁধে দেয়ার কারণেও ব্যাংকের শেয়ারে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। আমি আগেই বলেছি লভ্যাংশের সীমা বেঁধে দেয়া উচিত হয়নি। কারণ একেক ব্যাংকের একেক রকম অবস্থা। সুতরাং সর্বনিম্ন বা সর্বোচ্চ লভ্যাংশ কত হবে তা শর্ত দিয়ে নির্ধারণ করে দেয়া যুক্তিসঙ্গত হতে পারে না। যাদের মুনাফার চিত্র ভালো তাদের লভ্যাংশ বিতরণ বন্ধ করা উচিত নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক আবু আহমেদ  বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক লভ্যাংশের বিষয়ে যে নির্দেশনা দিয়েছে তার কারণেই ব্যাংকের শেয়ারের দাম কমেছে। এমন নির্দেশনা আসার পর বিনিয়োগকারীরা কেন ব্যাংকের শেয়ার কিনবেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই নির্দেশনা উঠিয়ে নিতে হবে। এটা বিনিয়োগকারীদের স্বার্থবিরোধী। তাছাড়া ব্যাংকের স্বাস্থ্যও ভালো নয়। বিনিয়োগকারীরা কেউ ব্যাংকের শেয়ার কিনতে চাচ্ছেন না। আগামী ছয় মাসে বোঝা যাবে ব্যাংকের প্রকৃত অবস্থা কী।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক মো. শাকিল রিজভী  বলেন, লভ্যাংশের সীমা বেঁধে দেয়ার কারণেই শেয়ারের এমন দরপতন হয়েছে। আগে যেভাবে খেলাপি হয়ে যাওয়ার পরও ব্যাংকগুলো বোনাস শেয়ার লভ্যাংশ দিয়েছে, তাতে ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা দুর্বল করে দিয়েছে। লভ্যাংশ দিতে হবে ঠিক আছে, কিন্তু কোম্পানির অস্তিত্ব শেষ হয়ে গেলে লভ্যাংশ দিয়ে কী হবে। আমি মনে করি কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা ঠিক আছে। কিন্তু এখন পরিস্থিতি খারাপ, যে কারণে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

কী আছে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায়

লভ্যাংশের সীমা বেঁধে দেয়া সংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, প্রভিশন সংরক্ষণসহ অন্যান্য ব্যয় মেটানোর বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এর আগে গৃহীত ডিফেরাল (Deferral) সুবিধার অধীন নয় এমন বা ২০১৯ সালের জন্য কোনো ডিফেরাল সুবিধা গ্রহণ ব্যতিরেকে যে সব ব্যাংকের ২.৫ শতাংশ ক্যাপিটাল কনজারভেশন বাফারসহ ন্যূনতম ১২.৫০ শতাংশ বা তার বেশি মূলধন সংরক্ষণ করতে সক্ষম, সে সব ব্যাংক তাদের সামর্থ্য অনুসারে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ নগদসহ মোট ৩০ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারবে।

প্রভিশন সংরক্ষণসহ অন্যান্য ব্যয় মেটানোর বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এর আগে গৃহীত ডিফেরাল সুবিধার অধীন নয় এমন বা ২০১৯ সালের জন্য কোনো ডিফেরাল সুবিধা গ্রহণ ব্যতিরেকে যে সব ব্যাংকের ক্যাপিটাল কনজারভেশন বাফারসহ ন্যূনতম ১১.২৫ থেকে ১২.৫০ শতাংশ মূলধন সংরক্ষণ করতে সক্ষম, সে সব ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনক্রমে তাদের সামর্থ্য অনুসারে সর্বোচ্চ ৭.৫ শতাংশ নগদসহ মোট ১৫ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারবে।

প্রভিশন সংরক্ষণসহ অন্যান্য ব্যয় মেটানোর বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এর আগে গৃহীত ডিফেরাল সুবিধার অধীন নয় এমন বা ২০১৯ সালের জন্য কোনো ডিফেরাল সুবিধা সম্পূর্ণরূপে সমন্বয় করা হলে যে সব ব্যাংকের ক্যাপিটাল কনজারভেশন বাফারসহ ন্যূনতম ১১.২৫ শতাংশ বা তার বেশি থাকে সে সব ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনক্রমে তাদের সামর্থ্য অনুসারে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ নগদসহ মোট ১০ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারবে।

প্রভিশন সংরক্ষণসহ অন্যান্য ব্যয় মেটানোর বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এর আগে গৃহীত ডিফেরাল সুবিধার অধীন নয় এমন বা ২০১৯ সালের জন্য কোনো ডিফেরাল সুবিধা সম্পূর্ণরূপে সমন্বয় করা হলে যে সব ব্যাংকের ক্যাপিটাল কনজারভেশন বাফারসহ ন্যূনতম ১১.২৫ শতাংশ এর কম কিন্তু ন্যূনতম সংরক্ষিত মূলধন ১০ শতাংশ হবে সে সব ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনক্রমে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ বোনাস শেয়ার লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারবে।