তার প্রথম ও প্রধান পরিচয় ব্যাটসম্যান। অলরাউন্ডার না হয়েও সেই সফল উইলেবাজ হাবিবুল বাশার কিন্তু ঘরোয়া ক্রিকেট বিশেষ করে ঢাকার ক্লাব পর্যায়ে প্রায় নিয়মিতই বোলিং করতেন। কিন্তু জাতীয় দলের হয়ে টেস্ট আর ওয়ানডে মিলে ১৬১ ম্যাচে তার উইকেট মাত্র একটি, সেটি ওয়ানডেতে।

শুনে অবাক হবেন, সে উইকেটটি এমন এক ব্যাটসম্যানের, যাকে আউট করা ছিল বিশ্বের যেকোন বোলারের স্বপ্ন। সেই ব্রায়ান লারার মহা মূল্যবান উইকেটটি নিয়েছিলেন হাবিবুল বাশার সুমন এবং যেটা তার একমাত্র ওয়ানডে উইকেটও।

ঘটনাটি ঢাকার বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে। সময়কাল, ১৯৯৯ সালের ৯ অক্টোবর। বাংলাদেশ আর ওয়েস্ট ইন্ডিজের ওয়ানডে সিরিজের সেটা ছিল দ্বিতীয় ম্যাচ। প্রথম ম্যাচে রান না পাওয়া (২ রানে আউট) লারা দ্বিতীয় ম্যাচে ছিলেন ‘গুলি খাওয়া বাঘ।’ রীতিমতো সংহার মূর্তি ছিল তার ব্যাটে।

পাওয়ার প্লে শেষ হওয়ার আগেই সেঞ্চুরি পূরণ করা লারার রান তখন ১১৭ (৬১ বলে ১৮ চার ও ৪ ছক্কায়)। অধিনায়ক আমিনুল ইসলাম বুলবুল দিসেহারা। টাইগার বোলারদের তখন ‘ত্রাহি মধুসুদন’ অবস্থা। যেই বোলিংয়ে আসছেন, লারার হাতে বেদম মার খাচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞ বোলারদের খেই হারিয়ে ফেলতে দেখে অধিনায়ক বুলবুল অনেকটা বাধ্য হয়েই অনিয়মিত বোলার হাবিবুল বাশার সুমনকে ডাকলেন। আর সুমন বোলিংয়ে এসে প্রথম বলেই করলেন বাজিমাত। তার বলে বড় শট খেলতে গিয়ে বোল্ড হলেন লারা।

ঐ অভাবনীয় সাফল্যটি কিভাবে ধরা দিয়েছিল? বৃহস্পতিবার ক্রীড়া সাংবাদিক নোমান মোহাম্মদের ইউটিউব লাইভে সে মজার গল্পই শোনালেন বাশার। তার ক্যারিয়ারে অনেক বড় বড় অর্জন আছে। সাফল্যের সঙ্গেই বসবাস ছিল।

দলগত সাফল্যকে ‘ব্র্যাকেটবন্দী’ করলে সবচেয়ে বড় গর্বের জায়গা কি ব্রায়ান লারার সেই উইকেট? লাইভে ক্রীড়া সাংবাদিক নোমান মেহাম্মাদের প্রশ্ন। হাবিবুল বাশার হেসে জবাব দিলেন, ‘ব্রায়ান লারার উইকেট তো অবশ্যই বড় প্রাপ্তি। আসলে ঐ উইকেটের পর তো আর কোন উইকেট পাইনি।’

লারা সেদিন ৪৫ বলে শতরান করে টগবগ করে ফুটছিলেন। ২০ ওভার পার হওয়ার আগেই তার রান গিয়ে ঠেকেছিল ১১৭’তে। মনে হচ্ছিল লারার ডাবল সেঞ্চুুরি হওয়া সময়ের ব্যাপার। আর তখনই লারাকে আউট করলেন আপনি। কিভাবে কী হয়েছিল একটু বলবেন?

বাশারের জবাব, ‘ঐ উইকেটটি নিয়ে দুটি ঘটনা আছে। দুটিই আমি শেয়ার করছি। প্রথম হলো, যতদূর মনে আছে, লারা আগের ম্যাচে আউট হয়েছিলেন অল্প রানে। ঐ দিন লারা নামার সময় দর্শকরা তাকে দুয়োধ্বনি দিয়েছিলেন। লারা ‘ভুয়া’ বলে চেচিয়েছিলেন। তাতে লারা তেঁতে গিয়েছিলেন হয়তো।’

‘দর্শকদের দুয়োধ্বনির জবাবে কিছুই বলেননি লারা। শুধু মাঠে ঢোকার আগে পেছন ঘুরে দর্শকদের দিকে একবার তাকিয়েছিলেন। তারপরের ঘটনা তো ইতিহাস। আমাদের বোলিংকে তছনছ করে দেয়ার কাহিনী, ৪৫ বলে মনে হয় হান্ড্রেড করেছিলেন।’

‘পাওয়ার প্লের ১৫ ওভার শেষে হঠাৎ ক্যাপ্টেন বুলবুল ভাই (আমিনুল ইসলাম বুলবুল) এসে বললেন, বল করতে পারবি? বলে রাখি, আমি তখন ঢাকার ক্লাব ক্রিকেটে প্রায় নিয়মিতই বোলিং করি। বললাম ঠিক আছে দেন, করব।’

‘আমার তখন আসলে কোন ডর-ভয় ছিল না। কারণ তার আগেই লারা বোলারদের ওপর দিয়ে সাইক্লোন বইয়ে দিয়েছে। আমার ভাবনা হলো, বাকিদের চেয়ে আমাকে আর বেশি কী মারবে? সবাইকে তো মেরেছেন, আমাকে আর কি মারবে, মারলে মারবে।’

‘বল করলাম। অফস্টাম্পের খানিকটা বাইরের বল। লারা এমনভাবে ব্যাট চালালেন যেন বল স্টেডিয়ামের বাইরে গিয়ে আছড়ে পড়ে। সৌভাগ্য আমার। তার ব্যাটের ভেতরের অংশে লেগে বল গিয়ে আঘাত হানল উইকেটে।’

উইকেট পাওয়ার পর কী হলো কে জানে? ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান ব্যাটসম্যানরা মনে হয় ভয় (রসিকতার সুরে) পেয়ে গেলেন। কেউ আর আমাকে মারতে পারলেন না। আমি পুরো ১০ ওভার বল করলাম এবং ঐ ম্যাচে আমাদের বোলারদের মধ্যে সবচেয়ে ইকোনমিক্যাল বোলিংটাও ছিল আমার।’

‘পরের ঘটনাটা হলো, ঢাকা লিগে আমি তখন বাংলাদেশ বিমানে খেলি। আমাদের প্র্যাকটিস চলছিল ধানমন্ডি ক্রিকেট স্টেডিয়ামে। আমাদের দলে তখন পাকিস্তানের এক ক্রিকেটার খেলতেন। নাম মঞ্জুর আখতার (পাকিস্তানের সাবেক টেস্ট ব্যাটসম্যান মনসুর আখতারের ছোট ভাই)। মঞ্জুর আখতার ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি লেগস্পিন বোলিং করতেন। খুব রসিকতা করতে পারতেন।’

‘আমরা দুজনই নেটে বোলিংয়ে যাচ্ছি। মঞ্জুর ভাই রান আপ ঠিক করে নিচ্ছিলেন। আমিও বল শুরু করব। হঠাৎ তাকে বলে ফেললাম, মঞ্জুর ভাই আপনি কি জানেন, আমি কয়েকদিন আগে ব্রায়ান লারাকে আউট করেছি। আমার নামে পাশে লারার উইকেট জমা পড়েছে।’

‘আমি ভেবেছিলাম লারার উইকেট পাওয়ার কথা শুনে তিনি আমাকে আরও উৎসাহ জোগাবেন। ভাল ভাল কথা বলবেন। আমি উৎসুক হয়েছিলাম তার উদ্দীপক কথা শোনার জন্য। কিন্তু হায়! ঘটল উল্টোটা। মঞ্জুর ভাই তার রান আপ থামিয়ে একদম দাঁড়িয়ে গেলেন। আর রাশভারী কন্ঠে যা বললেন, তা মোটেও উদ্দীপক নয়। রীতিমত হতাশার!’

‘বলে উঠলেন, বলো কি! লারা তোমার বলে আউট হয়েছেন? লারার কি তাহলে এতই খারাপ অবস্থা? আমি বললাম মানে? তিনি বললেন, আরে বুঝলে না! লারার এতটা খারাপ সময় চলে এসেছে যে তোমার বলেও আউট হয়! তোমাকেও উইকেট দেয়?’