সিংগাইরে অবৈধ ইটভাটা উচ্ছেদে চলছে টম অ্যান্ড জেরী খেলা

0
435

মাসুম বাদশাহ, সিংগাইর (মানিকগঞ্জ) থেকে : অবৈধ ইটভাটা বন্ধে উচ্চ আদালতের দেয়া রায়ের পর মানিকগঞ্জের সিংগাইরে ভাটা বন্ধে অভিযানের নামে প্রশাসন ও ইটভাটা মালিকদের মধ্যে শুরু হয়েছে টম অ্যান্ড জেরী খেলা। আগের দিন বন্ধ পর দিন চালু যেন শিশুদের জনপ্রিয় কার্টুন সিরিজকেও হার মানিয়েছে। এতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে ওঠেছে নানা প্রশ্ন।

আরো পড়ুন : মানিকগঞ্জে বাজারে পলিথিনের কেজি ২৪০, পুলিশের জব্দ তালিকায় ৪০ টাকা!


সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা গেছে, এ উপজেলায় তালিকাভুক্ত ৮১টি ইটভাটা রয়েছে। যার মধ্যে ৩৯ টির ইট পোড়ানোর লাইসেন্স আছে। বাকি ৪১ টির লাইসেন্স নেই। এছাড়া এক লাইসেন্সে একাধিক ভাটা পরিচালনা করায় প্রকৃত ইটভাটার সংখ্যা ১১২তে দাঁড়িয়েছে। যার ফলে দূষণের কবলে পড়েছে পুরো এলাকা। আবাসিক এলাকা ও ফসলি জমিতে এসব ইটভাটা গড়ে ওঠায় হ্রাস পেয়েছে শস্য উৎপাদন। নষ্ট হচ্ছে ক্ষেতের ফসল, বসতবাড়ির ফলজ-বনজ গাছপালা । হুমকির মুখে পড়েছে জনস্বাস্থ্য। ইট তৈরির প্রধান উপকরণ বিপুল পরিমাণ মাটির যোগান দিতে প্রতিবছরই ৫/৬ শ বিঘা ৩ ফসলি জমি জলাশয়ে পরিণত হচ্ছে। উপজেলার চান্দহর ইউনিয়ন ভূমি অফিস সুত্রে জানা গেছে, এ ইউনিয়নের ২০টি ইটভাটার মধ্যে শুধু রিফায়েতপুর মৌজায়ই রয়েছে ১১ টি ইটভাটা । যার ১০ টি ভাটারই ইট পোড়ানোর লাইসেন্স নেই। এছাড়া ধল্লা ইউনিয়নের ধলেশ্বরী নদীর বুকেও রয়েছে ৩ টি ইটভাটা। সরেজমিনে দেখা গেছে , বলধারা ইউনিয়নে রয়েছে ৩৫ টি ভাটা। এ ইউনিয়নেও এবিসি এবং এএবি এক লাইসেন্সের বিপরীতে একাধিক ভাটা পরিচালনা করছেন। অপরদিকে, চারিগ্রাম ইউনিয়নের চারগাঁও মৌজায় এএইচএম ভাটাটি খাল দখল করে একটি লাইসেন্স দিয়ে দু’টি ভাটা পরিচালনা করছে। জামির্ত্তা ইউনিয়নের সুদক্ষিরা-জাইল্যা মৌজায় স্কুলের অদূরে আবাসিক এলাকা ঘেঁষে বৈদ্যুতিক লাইনের নিচে ঝুকিপূর্ণভাবে সুপার ব্রিকস নামের ভাটাটি ইট পুড়িয়ে যাচ্ছে। সুত্রমতে, আর্থিক সুবিধা ও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে ম্যানেজ করে প্রভাবশালীরা বছরের পর বছর ভাটাগুলো দেদারছে চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

আরো পড়ুন : সিংগাইরে রাস্তায় বেরিকেড দিয়ে ডাকাতি, প্রবাসীর সর্বস্ব লুট


সম্প্রতি, আইনজীবি মনজিল মোরশেদ এর দায়ের করা এক রিটের প্রেক্ষিতে গত ২৬ নভেম্বর মহামান্য হাইকোর্টের বিচারপতি এফআরএম নাজমুল আহসান ও কেএম কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ পরিবেশ দূষণরোধে ঢাকা, মানিকগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, নারায়নগঞ্জ ও গাজীপুর জেলার সমস্ত অবৈধ ইটভাটা ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে বন্ধ করার নির্দেশ দেন। হাইকোর্টের এ নির্দেশের পর সিংগাইর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট রাহেলা রহমত উল্লাহ ও সহকারি কমিশনার (ভূমি) মোঃ হামিদুর রহমান গত ৯ ডিসেম্বর ধল্লা ইউনিয়নের আরসিএল, চান্দহর ইউনিয়নের মোল্লা ও বলধারা ইউনিয়রের এমকে ব্রিকসে অভিযান চালিয়ে অবৈধ ভাটাগুলোর কার্যক্রম বন্ধ করেন। সেই সঙ্গে মালামাল সরিয়ে নিতে ৭ দিনের সময় বেঁধে দিয়ে মালিক পক্ষের কাছ থেকে মুচলেকা নেয়া হয়।

এর আগে গত ২ ডিসেম্বর বলধারা ইউনিয়নে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা মেসার্স খোলাপাড়া ব্রিকসের মালিক মোঃ রফিকুল ইসলামকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা অনাদায়ে ২ মাসের বিনাশ্রম কারাদন্ড প্রদান করেন ভ্রাম্যমান আদালত। উচ্ছেদ হওয়া চারটি ভাটার মধ্যে ৩ টি ভাটা চলছে পুরোদমে। অভিযোগ ওঠেছে, উচ্চ আদালতের যুগান্তকারী রায়ের পর অবৈধ ভাটা মালিকেরা প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিদের ম্যানেজ করে থামিয়ে দিয়েছে উচ্ছেদ অভিযান। ইটভাটায় প্রশাসনের অভিযান ও বন্ধ, পরবর্তীতে ওই ভাটাগুলো পুনরায় চালু হওয়ায় মালিকপক্ষ ও প্রশাসনের মধ্যে টম অ্যান্ড জেরী খেলায় পরিনত হয়েছে বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করছেন।


উপজেলা কৃষি অফিস সুত্রে জানা গেছে, ঢাকার অতি সন্নিকটে মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলায় শতাধিক বৈধ-অবৈধ ইভাটার আগ্রাসনে প্রতিদিনই কমছে কৃষি জমি। ২১৭.৪ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ উপজেলার ১১টি ইউনিয়নে ইতিমধ্যে শতাধিক ইটভাটা গড়ে ওঠেছে। ভাটা নির্মাণ ও পরিচালনা আইনকে তোয়াক্কা না করে এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ গ্রামবেষ্টিত আবাসিক এলাকায় ৩ ফসলি জমিতে অবাধে নির্মাণ করছেন ভাটাগুলো। যা ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০১৩ এর ৮ ধারার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। প্রতিদিন প্রায় ৫০০ মেট্রিক টন কয়লা পোড়ানো হচ্ছে ওইসব ভাটায়। যার বিরুপ প্রভাব পড়ছে স্থানীয় পরিবেশ, কৃষি ও প্রাণীজগতসহ রাজধানী ঢাকাতেও। পরিবেশবাদীরা মনে করছেন, অতিদ্রুত এ এলাকার ভাটাগুলো উচ্ছেদ হওয়া জরুরী।


সিংগাইর উপজেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কুদ্দুস বলেন, আমাদের ভাটা মালিক সমিতির আওতাধীন ৮০ টি ইটভাটা রয়েছে। সরকারি দিবসগুলো পালনে আমরা স্থানীয় প্রশাসনকে আর্থিকভাবে সহযোগিতা করে থাকি। তবে অবৈধ ভাটা মালিকেরা ভাটা চালানোর ক্ষেত্রে নিজেদের স্বার্থে প্রশাসনকে ম্যানেজ করা সেটা তাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। মানিকগঞ্জের পরিবেশ অধিদফতরের ইন্সপেক্টর রুহুল আমীন বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশনা মোতাবেক অবৈধ ইটভাটা উচ্ছেদে দ্রুত আইননানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এ ব্যাপারে উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ হামিদুর রহমান বলেন, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবৈধ ইটভাটা বন্ধে অভিযান অব্যাহত আছে। উচ্ছেদ হওয়া ভাটাগুলো চালু হয়ে থাকলে তাদেরকে জেল-জরিমানা করা হবে।