ফেসবুক-গুগল-ইউটিউবের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের উপায় হচ্ছে

0
46

ব্যক্তিগত তথ্য যাতে বেহাত না হয়, বেহাত হলেও কেউ যাতে কোনও ক্ষতি করতে না পারে বা ক্ষতি করলেও যাতে ক্ষতিপূরণ আদায় সহজ হয় সেজন্য ‘ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন’ প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এরইমধ্যে সার্ভের কাজ শেষ হয়েছে। ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ এখন প্রতিবেদনের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রতিবেদন পেলেই খসড়া তৈরির কাজ শুরু হবে।

আরো পড়ুন : দুই মন্ত্রীর সফর বাতিল কীভাবে দেখছে ভারত

ব্যবহারকারীরা ফেসবুক, গুগল, ইউটিউবসহ অন্যান্য মাধ্যম ব্যবহারের সময় (বিশেষ করে আইডি তৈরির সময়) যেসব ব্যক্তিগত তথ্য দিয়ে থাকেন তা নিরাপদ রাখার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কোম্পানির। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, ওইসব প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যক্তির সেসব তথ্য বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করে বা অর্থের বিনিময়ে তৃতীয় কোনও প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে দেয়। এই অভিযোগ ফেসবুকের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি। অভিযোগ রয়েছে, ফেসবুক থেকে প্রায় ৯ কোটি গ্রাহকের তথ্য ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে যায়। গুগলের বিরুদ্ধেও আছে এমন অভিযোগ। উন্নত দেশগুলোতে ব্যক্তির এসব তথ্য উদ্ধার বা তথ্যর অপব্যবহারের জন্য ক্ষতিপূরণ আদায়ে আইন থাকলেও আমাদের দেশে নেই। এসব প্রতিষ্ঠান যদি দেশের মানুষের কোনও তথ্য চুরি করে বা তৃতীয় কোনও পক্ষের কাছে বিক্রি করে তাহলে তাদের ধরা কঠিন। ওই সব প্রতিষ্ঠানের এ দেশে নিবন্ধিত কোনও অফিসও নেই।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন থাকলে ওইসব প্রতিষ্ঠান স্থানীয় আইন মেনে চলতে বাধ্য থাকবে এবং তাদের নিয়ন্ত্রণও করা যাবে। ব্যবহারকারীর তথ্যর কোনও অপব্যবহার হলে সহজে ক্ষতিপূরণ আদায়ও করা যাবে।

আরো পড়ুন : দগ্ধের মাত্রায় অতীতের রেকর্ড ছাড়িয়েছে কেরানীগঞ্জের অগ্নিকাণ্ড

তথ্য প্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘যত দ্রুত সম্ভব আমরা ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন (ডাটা সিকিউরিটি অ্যাক্ট) তৈরি করে ফেলবো। আমরা এ বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবং কাজও অনেক দূর এগিয়েছে।’

মন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমরা একটা সার্ভে করেছি। তাতে দেখা গেছে পৃথিবীর ৯০ ভাগ দেশ ডাটা সিকিউরিটি আইন করে ফেলেছে। এতে করে সংশ্লিষ্ট দেশের জনগণের ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিতে উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হয়েছে। যার সর্বশেষ নজির সিঙ্গাপুর।’ তিনি জানান, ‘এরই মধ্যে আমরা টেলি যোগাযোগ বিভাগকে বলে দিয়েছি, পৃথিবীর সব আইন (তথ্য সুরক্ষা আইন )পর্যালোচনা করে একটা রিপোর্ট তৈরি করতে। পরে সংশ্লিষ্টদের দিয়ে খসড়া তৈরি করে তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছানো হবে।’

আরো পড়ুন : ডায়াবেটিসের ওষুধে ক্যান্সার সৃষ্টিকারী উপাদান!

তিনি বলেন, ‘কেউ তার ব্যক্তিগত তথ্য যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু দেবেন। রাষ্ট্র ঠিক করে দেবে ব্যক্তি তার তথ্য কতটুকু প্রকাশ করবে। ডাটা প্রটেকশন না থাকলে কোনও প্রাইভেসি থাকবে না। এই আইন না থাকায় আমরা ফেসবুক, ইউটিউবকে ধরতে পারছি না। আইনে আছে, পাবলিশারের কোনও দায়িত্ব নেই। অপ-তথ্যের কারণে ব্যক্তিকে ধরা হলেও পাবলিশার হিসেবে ফেসবুকের কোনও দায়িত্ব নেই, শাস্তি নেই। ফেসবুক কেন দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারবে? ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে আছে ক্ষতিপূরণ সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা। ফেসবুক, ইউটিউব যে মানের প্রতিষ্ঠান তাতে এক কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ কিছুই নয়। ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইনে এসব অনেক বাড়াতে হবে যাতে এগুলো দেশের মানুষের কাছে, সরকারের কাছে আইনিভাবে দায়বদ্ধ থাকে। আমরা এর খসড়া তৈরি করে মন্ত্রীসভায় পাঠাবো। কাজ শুরু হয়েছে।’ 

ডিজিটাল প্রাইভেসি (ছবি: ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত)

তথ্য-প্রযুক্তিবিদ ও উন্নয়নের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি প্রকল্প ‘আমাদের গ্রাম’ এর পরিচালক রেজা সেলিম বলেন, “বাংলাদেশের সংবিধানের মৌলিক অধিকার অংশের ৪৩খ অনুচ্ছেদে ‘আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ সাপেক্ষে’ নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার সংরক্ষণের কথা বলা আছে। কিন্তু আমাদের এখনও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বা ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার জন্যে নির্দিষ্ট আইন নেই। আইনের চেয়েও জরুরি এ বিষয়ে জনসচেতনতা, সেটিও নেই। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই আমরা বুঝতে পারছি না কখন কোথায় কেমন করে আমার ব্যক্তিগত তথ্য, যা অন্যের জানা দরকার নেই, চলে যাচ্ছে ভুল পথে। আর এর ফলে আমরা বুঝতে পারছি না যে, আমরা যেকোনও সময়ে একটি বিপদে পড়তে পারি বা আমার ব্যক্তিগত তথ্যের অপ-প্রয়োগ করে আমাকে কেউ বিপদেও ফেলতে পারে।”

তিনি আরও বলেন, “আমাদের দেশের ইন্টারনেট নিরাপত্তা নিয়ে উন্নত দেশগুলো সন্তুষ্ট নয়। এদিকে মনোযোগ দেওয়া দরকার। বাড়াতে হবে আমাদের জন-সচেতনতা। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের সম্পূরক একটি ‘ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন’ও আমাদের তৈরি করে নেওয়া দরকার। বিদেশি আইটি কোম্পানিগুলো আমাদের দেশে এসে যেন আমাদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে বিব্রতকর কোনও পরিস্থিতি তৈরি না করে সেদিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে। এমনকি এই আইনের ফলে প্রতিশ্রুত বা নিবন্ধিত থাকলে আমাদের দেশে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের উদ্দেশ্য স্পষ্ট হবে যাতে তারা আমাদের দেশের তথ্য পাচার করতে না পারে, এমনকি তাদের ব্যবসায় কর আরোপ করাও সহজ হবে।”

যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, জাপান ও কোরিয়ায় ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইনের যথাযথ প্রয়োগের অনেক ঘটনা বিশ্বব্যাপী ব্যাপক আলোচনা ও সচেতনতার জন্ম দিয়েছে। সম্প্রতি সিঙ্গাপুরও এই আইন প্রবর্তন করেছে। পাশ্ববর্তী দেশ ভারত শিগগিরই এই আইন প্রবর্তন করবে বলে জানা গেছে। ২০১৭ সালের ২৪ অগাস্ট ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এক রায়ে জানায়, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ভারতীয় নাগরিকের মৌলিক অধিকার। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বা রাইট টু প্রাইভেসি নাগরিকদের মৌলিক অধিকার।

বাংলাদেশ ইন্টারনেট গভর্নেন্স ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আবদুল হক অনু বলেন, ‘সরকারের এই উদ্যোগে আমরা খুশি। তবে কাজটি দ্রুত শেষ করতে হবে। কারণ সামনে আমাদের ভয়বহ দিন আসছে। এখনই সচেতন না হলে আমাদের ব্যক্তিগত তথ্য বেহাত হতে পারে। প্রতিকারের জন্য আমরা কোথাও যেতে পারবো না।’

তিনি জানান, ‘এই আইনটি করার জন্য বাংলাদেশ ইন্টারনেট গভর্নেন্স ফোরাম দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সঙ্গে কনসালটশন করেছে। বিভিন্ন দেশের উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়েছে কেন আইনটি আমাদের প্রয়োজন। এতোদিনে তাদের উদ্যোগ সফলতা পেতে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানাই।’