ডিএনসিসির কাউন্সিলরদের কারণ দর্শাও নোটিশ নিয়ে প্রশ্ন

0
11

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ৩৩টি করপোরেশন সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে সর্বশেষ ১২টি সভায় এক নাগাড়ে যারা ৩টিতে অনুপস্থিত ছিলেন এমন ১৪ জন কাউন্সিলরকে কারণ দর্শাও নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তবে এ ধরনের সিদ্ধান্তকে ‘সিলেকটিভ ওয়ে’ আখ্যা দিয়ে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন,এমন সিদ্ধান্ত সঠিক হয়নি। কাউন্সিলরদের নোটিশ যদি করতেই হয় তবে অনুষ্ঠিত সব সভার তথ্যের ভিত্তিতে করতে হবে। এতে ভুক্তভোগীদের কেউ যদি আদালতের দ্বারস্থ হন তাহলে ডিএনসিসি কর্তৃপক্ষ জবাব দিতে পারবে না।

আরো পড়ুন : সবজির দামে অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ

জানা গেছে, এক নাগাড়ে তিনটি করপোরেশন সভায় অনুপস্থিত থাকায় গত ২৩ অক্টোবর ডিএনসিসির ১৪ জন কাউন্সিলরকে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানো হয়। এরা হচ্ছেন ৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর কাজী জহিরুল ইসলাম মানিক, ৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আব্দুর রউফ, ৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. রজ্জব হোসেন, ২০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. নাছির, ২৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর শেখ মুজিবুর রহমান, ২৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর শামীম হাসান, ২৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. নূরুল ইসলাম রতন, ৩১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. শফিকুল ইসলাম, ৩৬নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর তৈমুর রেজা ও ৪৭ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোতালেব মিয়া। এছাড়া সংরক্ষিত ৩ আসনের কাউন্সিলর বেগম মেহেরুন্নেছা হক, ৭ আসনের খালেদা বাহার বিউটি, ১২ আসনের আলেয়া সারোয়ার ডেইজী ও ১৬ আসনের ইলোরা পারভীনকেও নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে তাদের প্রায় সবাই জবাবও দিয়েছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিএনসিসি যদি তার প্রথম ২১টি সভা এই তালিকার আওতায় আনতো তাহলে অনুপস্থিত কমিশনারের সংখ্যা আরও বাড়তো।

আরো পড়ুন : শাহজালালে সাড়ে তিন কেজি স্বর্ণ জব্দ

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংস্থাটির একাধিক কাউন্সিলর বলেন, শুধুমাত্র ২০১৮ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত যে কয়টি বোর্ড সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে সেসব সভার ভিত্তিতে এই নোটিশ করা হয়েছে। কিন্তু,২০১৫ সাল থেকে ২০১৭ সালের শেষ পর্যন্ত যে ২১টি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে সেগুলোতে অনুপস্থিত কাউন্সিলরদের নোটিশ করা হয়নি। এটা আমাদের প্রতি অন্যায় করা হয়েছে।

একজন নারী কাউন্সিলর বলেন,‘২০১৮ সালের শুরুতে অনুষ্ঠিত তিনটি সভায় আমি অসুস্থতার কারণে উপস্থিত হতে পারিনি। বিষয়টি আমি মৌখিকভাবে তখনকার প্যানেল মেয়রকে জানিয়েছিলাম। আগের প্রতিটি সভায় আমি উপস্থিত ছিলাম। আমাকেও নোটিশ করা হয়েছে। নোটিশ যখন করা হলো তাহলে প্রথম ২১টি সভায় যারা অনুপস্থিত ছিল তাদেরকে কেন করা হলো না। এখন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হলো শুধু আমরা ১৪ জন কাউন্সিলর বোর্ড সভায় অনুষ্ঠিত থাকি বা ছিলাম। সব বোর্ড সভার ভিত্তিতে যদি নোটিশ করা হয় তাহলে তো এ সংখ্যা আরও বেশি হবে। নোটিশ যখন দেওয়া হলো তাহলে সবাইকে কেন দেওয়া হলো না?’

জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, টানা তিনটি সভায় অনুপস্থিত থাকা সবাইকে করতে হবে। এখন ডিএনসিসি যদি সর্বশেষ ১২টি সভায় অনুপস্থিত কাউন্সিলরদের নোটিশ করে থাকে সেটি হবে অবশ্যই সিলেকটিভ ওয়ে। এটা করা ঠিক হয়নি। ডিএনসিসির জন্য সবকটি বোর্ড সভা সমান গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং প্রথম ২১টি সভায় যেসব কাউন্সিলর অনুপস্থিত ছিলেন তাদেরকে যদি নোটিশ করা না হয় সেটি নিয়ে পরবর্তীতে কথা উঠবে। এক্ষেত্রে কেউ যদি আইনগত পদক্ষেপ নেয় তাহলে ডিএনসিসি কর্তৃপক্ষ হেরে যাবে। নোটিশ যদি করতে হয় তাহলে সব সভার ভিত্তিতে অনুপস্থিত সবাইকে করতে হবে।

বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে ডিএনসিসি মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, আমি শুধুমাত্র আমার সময়ে যেসব কাউন্সিলর টানা তিনটি বোর্ড সভায় অনুপস্থিত ছিলেন তাদেরকে নোটিশ করতে বলেছি। অন্যদের সময়ে কী হয়েছে না হয়েছে সেটি দেখিনি।

ডিএনসিসি মেয়র আতিকুল ইসলাম শুধু তার সময়ের বোর্ড সভায় অনুপস্থিত কাউন্সিলরদের নোটিশ করার হয়েছে বলে দাবি করলেও অনুসন্ধানে দেখা গেছে প্যানেল মেয়র মো. ওসমান গণি ও জামাল মোস্তফার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভাগুলোও এই অনুপস্থিতির তালিকায় যুক্ত করা হয়েছে। তবে প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের সময়ে অনুষ্ঠিত সভাগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

অনুসন্ধানে জানা যায়, মেয়র আনিসুল হকের সময়ে করপোরেশনের প্রথম ১৮টি সভা অনুষ্ঠিত হয়। ২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর তার মৃত্যুর পর প্যানেল মেয়র ওসমান গণির সভাপতিত্বে ১৯তম থেকে ২৫তম পর্যন্ত সভা অনুষ্ঠিত হয়। ২০১৮ সালের ২২ সেপ্টেম্বর এই প্যানেল মেয়রও মৃত্যুবরণ করেন। পরে অপর প্যানেল মেয়র জামাল মোস্তফার সভাপতিত্বে ২৬তম থেকে ২৯তম সভা অনুষ্ঠিত হয়। আর চলতি বছরের ৩০ মে বর্তমান মেয়র আতিকুল ইসলাম মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর ৩০তম থেকে ৩৩তম সভা অনুষ্ঠিত হয়।

তবে ডিএনসিসির কাছে ২২তম থেকে সর্বশেষ অনুষ্ঠিত ৩৩তম সভার তথ্য থাকলেও অনুসন্ধানে আরও ৬টি সভার বিবরণী পাওয়া গেছে। ওই সভাগুলোর মধ্যে ২০১৭ সালের ১৩ জুন প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের সভাপতিত্বে ১৬তম সভা অনুষ্ঠিত হয়। একই বছরের ২১ জুন ১৭তম, ১১ জুলাই ১৮তম সভা অনুষ্ঠিত হয়। আর প্যানেল মেয়র ওসমান গণির সভাপতিত্বে ২০১৭ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর ১৯তম সভা, ৩০ অক্টোবর ২০তম সভা, ১১ ডিসেম্বর ২১তম সভা অনুষ্ঠিত হয়।

জানতে চাইলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, আইনের শাসন সব সময় সবার জন্যই সমান। আইন যেন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ করা হয় সেটাই কাম্য। যখন সমানভাবে প্রয়োগ করা হবে না তখন অন্যরা সুযোগ নেবে। এক্ষেত্রে ডিএনসিসির নোটিশ প্রাপ্ত কাউন্সিলরা যদি আইনের আশ্রয় নেন তাহলে সিটি করপোরেশন জবাব দিতে পারবে না। সুতরাং আমি বলবো যেহেতু এখনও সময় রয়েছে তাই করপোরেশনের উচিত হবে বাকি বোর্ড সভায় অনুপস্থিত কাউন্সিলরদেরও যাতে নোটিশ করা হয়।

এদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে এখন পর্যন্ত ২০টি করপোরেশন সভা অনুপস্থিত হয়েছে। এসব সভার মধ্যে ২১জন কাউন্সিলর টানা তিনটির বেশি সভায় অনুপস্থিত ছিলেন। তাদের প্রত্যেকে কারণ দর্শাও নোটিশ করা হয়েছে। এরই মধ্যে তাদের প্রায় সবাই নোটিশের জবাব দিয়েছেন বলে জানা গেছে।