সাভারের বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ইমু গুরুতর অসুস্থ্য, পাশে নেই দলের কেউ

0
270

স্টাফ রিপোর্টার : এক সময়ে কাকডাকা ভোর থেকে গভীররাত পর্যন্ত যে বাড়ি লোকের পদচারণায় মুখরিত থাকতো সেই বাড়ি এখন অনেকটা সুনসান নিরব। বৈঠকখানায় বসে শত মানুষের চা পান ও ভোজনের দৃশ্য আর নেই। গোলা ভরা ধান নেই, পুকুর ভরা নেই মাছ। হয় না কোনো সালিশ দরবার। ওই বাড়ির কর্তা এক সময়ে সাভারে রাজনীতির মাঠ দাঁবড়ে বেড়ানো আশরাফউদ্দিন খান ইমু গুরুতর অসুস্থ হলে পাল্টে যায় পুরো দৃশ্যপট।

আরও পড়ুন >> সাভার উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা খালেদা সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত, স্বামীর মৃত্যু

সত্তোরোর্ধ বয়সেও বার্ধক্য তাকে কাবু করেনি। তবে রোগ তাকে ঘিরে ধরেছে। বর্ষীয়ান এই রাজনীতিবিদ প্রখ্যাত নিউরো সাইন্স বিশেষজ্ঞ দীন মোহাম্মদ ও নিউরো মেডিসিন বিশেষজ্ঞ তৌহিদুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন আছেন।

সাভার পৌর এলাকার আনন্দপুর মহল্লার বি, ৪২ হোল্ডিংয়ের বাড়িটি একসময় ‘চেয়ারম্যানের বাংলো’ নামে সর্বমহলে পরিচিতি ছিল। পুরানো সেই টিনশেড বাড়িটি রয়েছে অগের মতোই, আছে বৈঠকখানাও। শুধু নেই সেই জৌলুশ। যাকে ঘিরে সারাক্ষণ প্রাণবন্ত থাকতো বাড়িটি তিনি আর আগের মতো নেই। দারাজকন্ঠে নেই তার ভাষণ। চোর, ডাকাত, মাদক ব্যবসায়ী ও অপরাধীরা আর ‘তার ভয়ে’ এখন আর থড়থড় করে কেপে উঠে না। বাড়ির বাইরে থেকে শোনা যায় না কড়া শাসনের ধমক। রাজনীতির মাঠেও নেই তার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী, সমালোচক। সময় পরিক্রমায় পুরানো বাংলোর পাশে গড়ে উঠেছে চারতলা অট্টালিকা। ওই ভবনের দোতলায় একটি কক্ষে নির্বাক শুয়ে বসে সময় কাটে তার।

আরও পড়ুন >> ঢাকা জেলা আ. লীগের সকল ইউনিটের সম্মেলন ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন করার নির্দে

জানা গেছে, পৈত্রিকসূত্রে অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল পরিবারের সন্তান আশরাফউদ্দিন খান ইমু ২০১৪ সালে সস্ত্রীক পবিত্র হজ¦ব্রত পালন করেন। ২০১৫ সালের ১৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত সর্বশেষ পৌরসভা নির্বাচনে তিনি ছিলেন মেয়র পদে দলের মনোনয়ন প্রত্যাশী। কিন্তু তিনি মনোনয়ন পাননি। এর কয়েক মাস পর তিনি হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়েন। ব্রেইন স্ট্রোক, ডায়বেটিকস, প্রোস্টেট হাই, ব্লাড প্রেসারে আক্রান্ত। একের পর এক ব্যাধি তাকে ঘিরে ধরে। মাঝে  কিছুটা সুস্থ্য হলেও শরীর যেন সায় দিচ্ছে না তাকে।

এদিকে ইমু অসুস্থ্য হয়ে পড়ার পর থেকে দলের নেতাকর্মীরা তার তেমন খোঁজখবর রাখেন না। এমনকি তার পুরানো ঘনিষ্ঠজনদের মধ্যে অনেকে ভুলে গেছেন অতীত। তার ছায়াতলে রাজনীতি করে এখন প্রতিষ্ঠিত এমন অনেকে নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। এড়িয়ে চলেন তাকে।

আরও পড়ুন >> নন্দন পার্কে অসামাজিক কার্যকলাপে দর্শনার্থী কমছে

বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে আশরাফ উদ্দিন খান ইমু ১৯৬৪ সালে ছাত্রলীগে যোগদান করেন। ১৯৬৫ সালে জগন্নাথ কলেজ শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৭ সালে হাবিবুর রহমান শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে তিনি গ্রেপ্তার হন। ১৯৬৮ সালে মানিকগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হন। ’৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের সময় সাভার থানা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আশরাফ উদ্দিন খান ইমু ’৭০ এর নির্বাচনে সাভার, ধামরাই, মানিকগঞ্জ ও জয়দেবপুরে বঙ্গবন্ধুর সাথে নির্বাচনী প্রচারনায় অংশগ্রহণ করেন। সেক্টর-২ এর অধীনে ভারতের আসাম রাজ্যের অমপি নগরে ২১ দিন প্রশিক্ষণ শেষে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং যুদ্ধকালীন সাভার থানা কমান্ডার হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের সাভার ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত প্রথম চেয়ারম্যান এবং সাভার থানা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৫ সালে সাভার উপজেলা পরিষদের প্রথম চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৮৮ সালে ঢাকা-১২ (সাভার) আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৪-২০০৩ সাল পর্যন্ত সাভার পৌরসভার প্রথম নির্বাচিত চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১২ আসন থেকে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী হিসাবে এবং পরবর্তী দুইবার সাভার পৌরসভা নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র প্রার্থী হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

আরও পড়ুন >> সাভারে আ.লীগ নেতা মজিদ হত্যার খুনি মানিক পিস্তলসহ গ্রেফতার (ভিডিও)

১৯৯১ সালে সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে টেবিল ঘড়ি প্রতীকে আশরাফ উদ্দিন খান ইমু প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ১৯৯৪ সালে পৌরসভা নির্বাচনে মোমবাতি প্রতীকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে। তিন পুত্র সন্তানের জনক আশরাফ উদ্দিন খান ইমু একজন পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ হিসেবে সুখ্যাতি রয়েছে। তিনি বর্তমানে ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি।

আরও পড়ুন >> আশুলিয়ায় বাসকাউন্টার কর্মী হত্যার ঘটনায় ডাকাতদলের ৩ জন আটক

আশরাফ উদ্দিন খান ইমু’র কনিষ্ঠপুত্র গোলাম ফয়েজ উদ্দিন খান শিহাব জানান, তার বাবা গত তিন বছর ধরে অসুস্থ্য হলেও দেড় বছর ধরে তা গুরুতর রুপ নিয়েছে। তিনি সবার কাছে তার বাবার সুস্থ্যতা কামনায় দোয়া প্রার্থনা করে জানান, এখনো অনেক সুহৃদ তার বাবার শারীরিক অবস্থা জানার জন্য খোঁজখবর করেন। দলের বাইরেও অনেকে তাকে দেখতে আসেন, টেলিফোনে খবর রাখেন। তবে দলের নেতাকর্মীদের প্রতি তাদের কোনো অভিযোগ, অনুযোগ, আক্ষেপ নেই।