সাভারে নিষিদ্ধ পলিথিনের অবৈধ ব্যবসা রমরমা, প্রশাসন নীরব

0
94


স্টাফ রিপোর্টার : সাভারে প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের নাকের ডগায় প্রাণি ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর নিষিদ্ধ পলিথিনের রমরমা ব্যবসা চলিয়ে যাচ্ছেন কিছু অসাধু আইন অমান্যকারী ব্যক্তিরা। উপজেলার ছোট বড় সব বাজারে, অলিগলির প্রতিটি দোকানেই মিলছে অবৈধ ঘোষিত পরিবেশ দূষণকারী পলিথিন। প্রশাসনের নজরদারি না থাকায় ব্যবহার হচ্ছে নিষিদ্ধ এইচডিপিই (হাইয়ার ডেনসিটি পলি ইথালিন) পলিব্যাগ। আবার প্রশাসনের কারও নজরদারী থাকলেও এ অৗৈবধ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে চুপ থাকছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। যার ব্যবহার মানুষের জীবনে মারাত্মক ক্ষতি করলেও পরিবেশ অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসন এ বিষয়ে কোন পদক্ষেপ না নেওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে।

আরও পড়ুন >> ভোগান্তির এক নতুন নাম প্রি-পেইড মিটার ?


দেশে এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে পলিব্যাগ উৎপাদন করে বাজারজাত করছে। সেখান থেকে এনে সাভার উপজেলার বিভিন্ন ব্যবসায়ীরা প্রকাশ্যে হাটেবাজারে পলিথিন বিক্রি করছেন। অপচনশীল এই পলিথিন যত্রতত্র ফেলার কারণে পানি মাটি ও বাতাস দূষিত হয়ে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করছে। মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে নানা রোগ-ব্যাধিতে।

আরও পড়ুন >> সাভারে প্রাথমিকে বায়োমেট্রিক হাজিরা মেশিন কেনায় ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ


এছাড়াও ড্রেন, নালা, নর্দমা, খালবিল যত্রতত্র ছড়িয়ে পড়ে পানি চলাচলে বাধাগ্রস্ত হয়ে জলজটের সৃষ্টি হচ্ছে। জমে থাকা পানিতে ব্যাকটেরিয়াসহ নানা রোগজীবাণু ছড়াচ্ছে। ডেঙ্গুবাহি এডিশ মশার প্রজণণ কেন্দ্রেও পরিণত হয়েছে। পলিথিন হাতের নাগালে পাওয়ার কারণে পরিবেশবান্ধব পাটের ব্যাগের ব্যবহার বাড়ছে না।

আরও পড়ুন >> পাটুরিয়া-দৌলতদিয়ায় দ্বিতীয় পদ্মাসেতু প্রক্রিয়াধীন : সেতুমন্ত্রী


সাভারের বিভিন্ন হাট বাজার ঘুরে দেখা যায়, সাভার নামাবাজার লোহাপট্টিতে রাখাল স্টোরের মালিক উৎপল সাহা প্রভাবশালী এক ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ নেতার ছত্রছায়ায় দেদাচ্ছে নিষিদ্ধ পলিথিন পাইকারী বিক্রী করে যাচ্ছেন। তিনি সাভার উপজেলার মধ্যে পাইকারী দোকানদার হিসেবে পরিচিত। তিনি নিজস্ব লোক মারফত নিষিদ্ধ পলিথিন ডেলিভারী দিয়ে থাকেন গুরুতপূর্ণ বিভিন্ন খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে। এছাড়াও তারই পাশে প্রদীপ স্টোর, তার পাশে দুর্জয় স্টোরসহ একাধিক দোকানে প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে নিষিদ্ধ পলিথিন।

আরও পড়ুন >> ধামরাইয়ে বালুুুু ব্যবসার দ্বন্দ্বেই থানার গাড়ি চালক খুন


অপরদিকে সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ডে বাটার জুতার গলিতে ভূইয়া প্যাকেজিংয়ের মালিক আবুল কালাম, তারপাশের দোকানদার গোপাল দত্ত ও চকোরী সুপার মার্কেটের ভিতরে এনামুল এন্টারপ্রাইজ তারই পাশে ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজ এবং রাজ্জাক প্লাজার পাশে শাহজালাল মার্কেটের নিচে গোপাল দত্তের বড় ভাইয়ের আরো একটি নিষিদ্ধ পলিথিনের দোকান রযেছে। এ দোকানগুলোতেও দেদাচ্ছে বিক্রী করে যাচ্ছেন অবৈধ্য পলিথিন।

আরও পড়ুন >> ধামরাইয়ে বালুুুু ব্যবসার দ্বন্দ্বেই থানার গাড়ি চালক খুন


এছাড়াও উপজেলার নবীনগর, বাইপাইল, উলাইল, পল্লীবিদ্যুত, আমিনবাজার, নয়ারহাটসহ বিভিন্ন ছোট-বড় বাজারে প্রকাশ্যে এসব অবৈধ পলিথিন বিক্রি হচ্ছে। বাংলাদেশে ১৯৮২ সালে প্রাথম পলিথিন ব্যাগের বাজারজাত ও ব্যবহার শুরু হয়। এটি সহজে পরিবহন ও স্বল্পমূল্যে পাওয়ার কারণে অল্প সময়ে মানুষের হাতে হাতে পৌঁছে যায়।

আরও পড়ুন >> টোল দিলে রাস্তায় চলাচলে সুবিধা জনগণই পাবে : সেতুমন্ত্রী


সরেজমিন ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেলেও অসাধু ব্যবসায়ীরা স্থানীয় আইন-শৃংখলা নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার কর্তা-ব্যক্তিদের সঙ্গে অবৈধ পলিথিন ব্যবসায়ীদের একটি গোপন লেনদেনে সম্পর্ক কথা উঠে এসেছে। ফলে তারা বিষয়টি দেখেও নানা দেখার ভান করে এড়িয়ে চলেন। এছাড়াও অনেক সময় লোক দেখানো অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা হলেও এর মূল হোতারা থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে। ফলে পলিথিন ব্যাগ ব্যবসা আর বন্ধ হয় না। এতে একদিকে যেমন আইন লংঘিত হচ্ছে, তেমনি পরিবেশ ও স্বাস্থ্যেরও ক্ষতি হচ্ছে।

আরও পড়ুন >> ধামরাইয়ে সাবেক এমপির সঙ্গে অসৌজন্য আচরণ, অংশগ্রহন করেনি শোক সভায়


সাভার বাসস্ট্যান্ডের বাটার জুতার গলির পলিথিন ব্যবসায়ী গোপাল দত্ত বলেন, ভূইয়া প্যাকেজিং স্টোর মালিক আবুল কালাম ও চকোরী সুপার মার্কেটের পলিথিন বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান এনামুল এন্টারপ্রাইজের মালিক বাবুল, ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজের কর্মচারী রাসেল জানান, তারা ঢাকার চকবাজার থেকে এ অবৈধ পলিথিন ক্রয় করেন।

আরও পড়ুন >> মহাসড়কে টোল আদায়ের সিদ্ধান্তে অনড় সরকার


এছাড়াও ঢাকার বিভিন্ন এলাকার কারখানার মালিকরা নদী ও সড়ক পথে তাদের কাছে নিষিদ্ধ পলিথিন পৌঁছে দিয়ে যান। এসব পলিথিন তারা সাভারে বিভিন্ন কাচা বাজার, ফলের দোকান, হর্কাস মার্কেটসহ নিন্মমানের মুদি দোকানে নিজস্ব লোক মারফতে পাইকারী ও খুচরা বিক্রী করেন। তারা আরো জানান, আমরা পলিথিন বিক্রি বন্ধ করার আগে যেখান থেকে পলিথিন উৎপাদন হয় এবং সরবরাহ করা হয় সেই সব প্রতিষ্ঠান আগে বন্ধ করতে করতে হবে।

আরও পড়ুন >> দৃষ্টিভঙ্গি বদলান, জীবন বদলে যাবে


এছাড়াও সরেজমিনে নামাবাজার বড় পাইকারী নিষিদ্ধ পলিথিন ব্যবসায়ী রাখাল স্টোরের মালিক উৎপলের সাথে ক্রেতা সেজে এ প্রতিবেদক জানতে চান পলিথিন বিক্রী নিষিদ্ধ হওয়ার পরও কিভাবে প্রকাশ্যে পলিথিন বিক্রী করে যাচ্ছেন? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন পুলিশ, প্রতি মাসে মাসোহারার বিনিময়ে প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাসহ স্থানীয় সাংবাদিক এবং স্থানীয় প্রবাভশালী ব্যক্তিদের ম্যানেজ করেই তিনি পলিথিন বিক্রী করে যাচ্ছেন। আলাপচারিতার এক পর্যায়ে এ প্রতিবেদক তার পরিচয় প্রকাশ করলে তিনি এ প্রতিবেদকের সাথে সাইদুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তিকে তার বড় ভাই হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়ে মোবাইল ফোন ধরিয়ে দেন। এসময় সাইদুল ইসলাম নিজেকে সাভার পৌর এলাকার ৪ নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পরিচয় দিয়ে বলেন, এখান থেকে অনেক সাংবাদিকও মাসোহারা নেয়। পরে এ প্রতিবেদককে তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন।

আরও পড়ুন >> এসপি শাহ মিজানের মতো কাজ করে জনগণের মন জয় করতে হবে : ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী


পরিবেশ বাঁচাতে সরকার ২০০১ সালে পলিথিন নিষিদ্ধ করলে সাধারণ মানুষ সেই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছিল। এরপর বিভিন্ন সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ভ্রাম্যমাণ আদালত চালিয়ে দোকান থেকে পলিথিন জব্দ করা হয়েছে, সিলগালাসহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে অনেক কারখানা। এরপরও পলিথিনের ব্যবসা বা ব্যবহার বন্ধ হয়নি। ক্ষতিকারক এই পলিথিন বন্ধের লক্ষ্যে ২০০২ সালে তৎকালীন সরকার পলিথিন ব্যাগ উৎপাদন, আমদানি, বাজারজাত, ক্রয়-বিক্রয়, প্রদর্শন মজুদ ও বিতরণ নিষিদ্ধ করে। এবং আইন করেও আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়ায় এ পণ্যটি নিষিদ্ধের পরও অবাধ ব্যবহার অব্যাহত থাকে।

আরও পড়ুন >> গ্রেডিং পদ্ধতি সংস্কার : সর্বস্তরে চালু হচ্ছে জিপিএ-৪


এ ব্যাপারে সাভার উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির (দুপ্রক) সাধারণ সম্পাদক সালাহ উদ্দিন খান নঈম বলেন, পলিথিন অপচনশীল। মাটির উর্বরতা নষ্ট করে। পলিথিন পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। তাই সরকার এসব বিবেচনায় নিয়ে পলিথিন উৎপাদন, বিপণন এবং ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু তারপরও যত্রতত্র পলিথিন ব্যবহার হচ্ছে। পলিথিন নিষিদ্ধের সুযোগ নিয়ে কতিপয় অবৈধ ব্যবসায়ী প্রশাসনসহ বিভিন্ন পেশার কিছু দুষ্টলোককে অবৈধভাবে সুবিধা দিয়ে এ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। আমি মনে করি, দেশ ও জনগণের স্বার্থে সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রশাসন আইন সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়নে কার্যকরী ভূমিকা পালন করবেন। পাশাপাশি মানুষের নিত্য ব্যবহারের বিষয় ভেবে দ্রুত পলিথিনের বিকল্প ব্যবস্থা করবেন।

আরও পড়ুন >> যে পাতা চুল পড়া বন্ধ করে নতুন চুল গজাবে

এ ব্যাপারে সাভার উপজেলা নদী ও পরিবেশ উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি বীরমুক্তিযোদ্ধা কৃষিবিদ ড. রফিকুল ইসলাম ঠান্ডু মোল্লা বলেন, সরকার পলিথিন নিষিদ্ধ করে পরিবেশ এবং প্রতিবেশ বাঁচাতে সময়পোযোগী একটি সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কিন্তু একটি অসাধু মহল দ্রুত সম্পদশালী হওয়ার লক্ষ্যে সরকারের সিদ্ধান্তকে অমান্য করে নিষিদ্ধ পলিথিন উৎপাদন এবং বাজারজাত করছেন। জনগণও নিরুপায় হয়ে পলিথিন ব্যবহার করছেন। আর এ সুযোগে সরকারের আইন বাস্তবায়নে নিয়োজিত সংশ্লিষ্ট মহলের কিছু দুষ্টলোক নিষিদ্ধ পলিথিন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অবৈধ সুবিধা নিয়ে বিষয়টি দেখেও না দেখার ভান করছে। এতে পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে, মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং সরকারের আইন অমান্য হচ্ছে। আমি মনে করি, পরিবেশ এবং প্রতিবেশ রক্ষায় দ্রুত পলিথিন উৎপাদন, বাজারজাত এবং ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। পলিথিনের বিকল্প ব্যবস্থাও মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। অন্যথায় দেশের পরিবেশের মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যার পরিণতি সবাইকে ভোগ করতে হবে।

আরও পড়ুন >> ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার নিযুক্ত হলেন মারুফ হোসেন সরদার


এ ব্যাপারের জানতে উপজেলা নির্বাহী অফিসার পারভেজুর রহমান বলেন, আমি কয়েকদিন আগে এ উপজেলায় যোগদান করেছি। পলিথিন ব্যবসার খবর সম্পর্কে আমি অবগত নই। পলিথিন বিক্রির সত্যতা পেলে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া নিবেন বলে জানান।