প্রস্তাবিত ‘শেখ হাসিনা ভাষা ও আইসিটি ইনস্টিটিউট’ উপেক্ষিত!

0
21

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজ ট্রেনিং সেন্টার-২ (এফএলটিসি-২) প্রকল্পের আওতায় সারাদেশে ল্যাঙ্গুয়েজ ল্যাব স্থাপন এবং ভাষা প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালুর সিদ্ধান্ত বিগত ৪ বছরেও আলোর মুখ দেখেনি। সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়নে ‘ভাষা ও আইটিসি দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্প’ (এলআইএসডিপি) এর উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) তৈরি হলেও তা ঝুলে আছে প্রায় দেড় বছর। এর ফলে প্রস্তাবিত ‘শেখ হাসিনা ইনস্টিটিউট অব ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড আইসিটি’ নামের জাতীয় ভাষা ইনস্টিটিউট স্থাপনের কাজ এখনও শুরু হয়নি।

এছাড়া, এফএলটিসি-২ প্রকল্প শেষ হওয়ার পরও নতুন প্রকল্প শুরু না হওয়ায় প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপিত ৩০টি ল্যাঙ্গুয়েজ ল্যাবের স্থাপনা ও যন্ত্রপাতিও নষ্ট হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তহীনতার কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. সোহরাব হোসাইন বলেন,‘ডিপিপি জমা হলে পড়ে থাকার কথা নয়, কোনও লাইনে হয়তো পড়ে আছে।’ বিষয়টি সম্পর্ককে তিনি খোঁজ নেবেন বলে জানান।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালের জেলা প্রশাসক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়ন ও মাউশির শেষ হওয়া এফএলটিসি-২ প্রকল্পের (শেষ হয় ২০১৭ সালের মার্চে) আওতায় স্থাপিত প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর যন্ত্রপাতি ও স্থাপনার সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে জরুরিভাবে নতুন প্রকল্প প্রস্তাবনা তৈরি করা হয়। প্রস্তাবিত নতুন প্রকল্পটির নাম দেওয়া হয় ‘ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড আইসিটি স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (এলআইএসডিপি) বা ‘ভাষা ও আইটিসি দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্প’। এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলে বিদেশে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনের আন্তর্জাতিক শ্রম বাজার চাহিদার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে দ্রুত এই কার্যক্রম চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আর প্রস্তাবিত এই প্রকল্প মেয়াদে ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজ কোর্স টেকসই করতে ‘শেখ হাসিনা ইনস্টিটিউট অব ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড আইসিটি’ নামের জাতীয় ভাষা ইনস্টিটিউট স্থাপন করবে সরকার।  

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ভাষা প্রশিক্ষণের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং বিদেশি শ্রম বাজারে দক্ষ কর্মী সরবরাহ ও রেমিটেন্সের প্রবাহ বাড়তে সরকারের উন্নয়নমূলক কার্যক্রম কাঙ্ক্ষিত গতি অর্জন করতে পারছে না। এ কারণে ২০১৫ সালের জেলা প্রশাসক সম্মেলনের প্রস্তাবে ভাষা প্রশিক্ষণ কোর্স চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এফএলটিসি-২ প্রকল্পের মাধ্যমে ইউনিয়ন পর্যায়ে ল্যাঙ্গুয়েজ ল্যাব স্থাপনসহ ভাষা প্রশিক্ষণের সুযোগ সম্প্রসারণ, ইংরেজি ও আরবি ভাষা প্রশিক্ষক নিয়োগ এবং স্বীকৃত ভাষা প্রশিক্ষণ কোর্সেও সঙ্গে সমন্বয় করে ভাষা প্রশিক্ষণ কোর্স চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়।

মাউশি সূত্রে জানা গেছে, ২০১২ সালে সরকারি অর্থায়নে ১৯ কোটি টাকা ব্যয়ে এফএলটিসি-২ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। প্রকল্পের আওতায় সারাদেশে ২৯টি সরকারি পোস্ট গ্রাজুয়েট কলেজ, সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়া, ঢাকা এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে মোট ৩১টি ল্যাঙ্গুয়েজ ল্যাব প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রকল্প চলাকালে ওই ল্যাবগুলো থেকে প্রায় ৩০ হাজার প্রশিক্ষণার্থী ইংরেজি, আরবি, কোরিয়ান, ফ্রান্স ও চায়না ভাষা প্রশিক্ষণ নেন।

২০১৫ সালের জেলা প্রশাসক সম্মেলনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ২০১৬ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এফএলটিসি-২ প্রকল্পটি সংশোধনের প্রস্তাব পাঠায় পরিকল্পনা কমিশনে। পরিকল্পনা কমিশন জেলা প্রশাসক সম্মেলনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য নতুন প্রকল্প নেওয়ার সুপারিশ করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে এফএলটিসি-২ প্রকল্পের ধারাবাহিকতায় ‘ভাষা ও আইসিটি দক্ষতা উন্নয়ন’ শীর্ষক একটি নতুন প্রকল্প প্রস্তাবনা তৈরি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ২০১৬-২০১৭ এবং ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বরাদ্দবিহীন প্রকল্প হিসেবে প্রকল্পটি অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগের অভাবে ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরের এডিপি থেকে প্রকল্পটি বাদ দেওয়া হয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়,প্রস্তাবিত প্রকল্পের ওপর ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি এবং জুলাই মাসে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সচিবের সভাপতিত্বে অভ্যন্তরীণ প্রকল্প যাচাই কমিটির দুইটি সভাও অনুষ্ঠিত হয়। মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব উন্নয়নের সভাপতিত্বে বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে পরে আরও একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। 

সূত্রটি আরও জানায়, মাউশি এবং আইসিটি মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত ভাষা প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রম সমন্বয় করে ডিপিপি পুনর্গঠনের নির্দেশ দেয় মন্ত্রণালয়। এরপর দীর্ঘ এক বছর প্রকল্পটি মাউশির পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখায় পড়ে থাকে। এরপর অভ্যন্তরীণ প্রকল্প যাচাই কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী প্রস্তাবিত ‘ভাষা ও আইসিটি দক্ষতা উন্নয়ন’ প্রকল্পের ডিপিপি পুনর্গঠন করে মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয় ২০১৮ সালের মার্চে। এরপর প্রায় দেড় বছর ধরে প্রকল্প প্রস্তাবনাটি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখাতেই পড়ে আছে।

এসব কারণে মাউশির শেষ হওয়া এফএলটিসি-২ প্রকল্পের ৩০টি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ভাষা প্রশিক্ষণ কার্যক্রমও স্থবির হয়ে পড়ে। এই প্রকল্প অনুযায়ী রাজস্ব বাজেটে পদ সৃষ্টি করে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু রাখার প্রস্তাবও মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন শাখায় ঝুলে আছে। এমতাবস্থায় ৩০টি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের প্রায় ২০ কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হচ্ছে। আর প্রস্তাবিত প্রকল্পটির ভবিষ্যতও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। প্রস্তাবিত ‘শেখ হাসিনা ইনস্টিটিউট অব ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড আইসিটি’ নামে জাতীয় ভাষা ইনস্টিটিউট স্থাপনের কাজ শুরু করার সুযোগই সৃষ্টি হয়নি।