মুক্তিযোদ্ধা সনদে চাকরি, সনদেই সন্তানদের বিপত্তি

0
80

২০০১ সাল থেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিয়ে আসছিলেন পাবনার বাসিন্দা ডা. মো. ইসমাইল হোসেন। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদসহ মুক্তিযোদ্ধার স্বপক্ষে সকল নথিপত্রও তৈরি ছিল।

পিতার ওই সনদ দেখিয়ে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় দুই ছেলে ও এক মেয়ে সরকারি চাকরিও বাগিয়ে নিয়েছেন।  দুই ছেলে মোঃ সালাহউদ্দিন আল-মামুন ও মোঃ শাহাবউদ্দিন পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) পদে এবং মেয়ে মোছাঃ রুখসানা ইয়াসমিন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক পদে চাকুরি নেন বাবার সনদ দেখিয়ে।  ইতিমধ্যে চাকরি স্থায়ীও হয়ে যায়।

কিন্তু বিধি বাম! পিতার সেই মুক্তিযোদ্ধা সনদই বুমেরাং হলো তাদের জন্য।  কারণ, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে ওই মুক্তিযোদ্ধা সনদে থাকা বিভিন্ন স্বাক্ষর ভূয়া ও জাল প্রমাণিত হয়েছে ইতিমধ্যে।  যে কারণে পিতাসহ তারা চারজনই আজ দুদকের দায়ের করা মামলার আসামি। দুদকের ঊর্ধ্বতন একটি সূত্র এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, ডাঃ মোঃ ইসমাইল হোসেনের কাছে থাকা মুক্তিযোদ্ধার সনদের ক্রমিক নং-৫২৭৯৯, যা ২০০১ সালের ১২ জানুয়ারি ইস্যু দেখানো হয়।  এই সনদে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের চেয়ারম্যান আব্দুল আহাদ চৌধুরীর স্বাক্ষর রয়েছে। এছাড়া আছে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদের পৃষ্ঠপোষক ও প্রধান উপদেষ্টা শেখ হাসিনারও প্রতিস্বাক্ষর। সনদে তিনি পাবনার একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা দাবি করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করার ঘোষণা দিয়েছেন।  অথচ দুদকের যাচাই-বাছাইয়ে সবকিছু জাল ও ভূয়া, এমনকি বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলে রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে ২০১২ সালের ২৮ জুন তার ছেলে মোঃ সালাহউদ্দিন আল-মামুন সাব-ইন্সপেক্টর অব পুলিশ (এসআই) পদে নিয়োগের জন্য উপ-মহাপুলিশ পরিদর্শক (ডিআইজি), রাজশাহী রেঞ্জ বরাবর আবেদন করেন। আবেদনপত্রে অন্যান্য কাগজপত্রের সাথে তার পিতা ডা. মো. ইসমাইলের নামে মুক্তিযোদ্ধার ভূয়া সনদ দাখিল করেন।  ওই সনদ দেখিয়ে মামুন মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ২০১৩ সালের ১৭ নভেম্বর পুলিশ হেডকোয়ার্টারে ও ক্যাডেট এস.আই হিসেবে সারদা পুলিশ একাডেমিতে যোগদান করেন। এরপর ২০১৪ সালের ৩ ডিসেম্বর এস.আই হিসেবে বগুড়ার গাবতলী মডেল থানায় যোগদান করেন।  বর্তমানে তিনি নওগাঁয় আত্রাই থানায় কর্মরত।

অনুরূপভাবে ডা. ইসমাইল হোসেনের অপর সন্তান ও মোঃ সালাহউদ্দিন আল-মামুনের ভাই মোঃ শাহাবউদ্দিন ২০১২ সালের ১ জুলাই মুক্তিযোদ্ধার জাল সনদ দেখিয়ে সাব-ইন্সপেক্টর অব পুলিশ পদে নিয়োগের জন্য আবেদন করেন ও পরে ২০১৫ সালের ২২ ডিসেম্বর সাব-ইন্সপেক্টর পদে স্থায়ী নিয়োগ পান। বর্তমানে তিনি রাজশাহীর পুলিশ সুপারের কার্যালয় কর্মরত।  

অনুসন্ধানে প্রাপ্ত নথিপত্র ও তাদের বক্তব্যে দুদক স্পষ্ট প্রমাণ পেয়েছে তারা দু’জনই পিতার মুক্তিযোদ্ধার ভূয়া সনদ দেখিয়ে প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে নিজেদেরকে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান দাবি করেছেন।

অনুসন্ধানকালে আরো দেখা যায় যে, আসামি ডাঃ মোঃ ইসমাইল হোসেনের তৃতীয় সন্তান মেয়ে মোছাঃ রুখসানা ইয়াসমিন মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ২০১২ সালের ৩ ডিসেম্বর সহকারী শিক্ষক হিসেবে আবেদন করে নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষে ২০১৩ সালের ১৯ নভেম্বর পাবনার চাটমোহরে ৫০ নং সোন্দভা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিয়োগ পান। বর্তমানে তিনি ওই স্কুলেই কর্মরত।  এক্ষেত্রেও তিনি বাবার মুক্তিযোদ্ধার জাল সনদ দেখিয়ে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নিয়োগ পান বলে অনুসন্ধানে প্রমাণিত হয়েছে।  শুধু তাই নয়, দুদকের অনুসন্ধানে দেখা গেছে তিনি জেনেশুনে প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে নিজেকে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান দাবি করে সহকারী শিক্ষক পদে চাকুরিরত থেকে সরকারি সুযোগ-সুবিধাদি ভোগ করে আসছেন।

দুদকের অনুসন্ধানে ডাঃ মোঃ ইসমাইল হোসেন ও তার ওই তিন সন্তান অন্যায়ভাবে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ পাওয়ার জন্য প্রতারণা-জালিয়াতির মাধ্যমে সংগৃহীত মুক্তিযোদ্ধার ভুয়া ও জাল সনদ সরবরাহ কাজে সরাসরি যুক্ত হয়েছেন। যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ অবস্থায় জাল মুক্তিযোদ্ধা সনদ সংগ্রহ, তৈরি এবং জেনেশুনে ভুয়া সনদকে খাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে ‘মুক্তিযোদ্ধার সন্তান কোটায়’ চাকরি নিয়ে ও চাকরিতে কর্মরত থেকে বেতন-ভাতা ও যাবতীয় সুযোগ-সুবিধাদি গ্রহণ করে ৪২০/৪৬৭/৪৬৮/৪৭১/১০৯ দণ্ডবিধি এবং ১৯৪৭ সনের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা মোতাবেক শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন বলে প্রমাণিত হয়েছে।

যে কারণে কমিশনের অনুমোদনক্রমে গত ২৮ আগস্ট পাবনা সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে দুদকের সহকারী পরিচালক মো. ওয়াহিদুজ্জামান বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন।

মামলার বাদী মো. ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধার জাল সনদে সরকারি চাকুরি নিয়ে সরকারি যাবতীয় সুবিধা গ্রহণ করার অভিযোগে মামলাটি দায়ের করা হয়েছে।  কমিশনের অনুমোদনক্রমে মামলাটি দায়ের করা হয়েছে। এর বেশি কিছু বলা যাবে না।’