হত্যা মামলার পলাতক আসামির সঙ্গে বিচারকের ছবি নিয়ে তোলপাড়

0
54

কুষ্টিয়া সংবাদদাতা : আক্তারুজ্জামান আক্তার। কুমারখালী থানার বাঁশগ্রামের আওয়ামী লীগ কর্মী আজম মুন্সী হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত ৪ নম্বর আসামি। পুলিশের খাতায় তিনি পলাতক। অথচ ঢাকায় এই হত্যা মামলার আসামিকে সঙ্গে নিয়ে একজন বিচারক সরকার থেকে দেয়া নতুন গাড়ি গ্রহণ করছেন। সেই ছবি তুলে বিচারক তার নিজের ফেসবুক পেজে আপলোডও করেছেন। সন্ত্রাসীর সঙ্গে বিচারকের ছবি দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন আক্তারের গ্রামের লোকজন।

ওই বিচারকের নাম এসএম নাসিম রেজা। তিনি বর্তমানে হবিগঞ্জ জেলায় অতিরিক্ত জেলা জজ হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। এর আগে তিনি ২০১০ সালে কুষ্টিয়া ও পরে মেহেরপুরে কর্মরত ছিলেন।

কুমারখালী থানা সূত্র জানিয়েছে, শুধু এ হত্যা মামলায় নয় আক্তারের বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা, অস্ত্র, ডাকাতি ও অপহরণের মামলা রয়েছে। এর মধ্যে সম্প্রতি ওই বিচারকের সহযোগিতায় কুষ্টিয়া আদালত থেকে একটি অপহরণ মামলা থেকে তিনি মুক্তি পেয়েছেন বলেও কানাঘোষা রয়েছে।

এলাকাবাসী জানান, কুষ্টিয়ায় থাকাকালীন ওই বিচারককে বাড়িতে দাওয়াত করে এনে ভুরিভোজ করান আক্তার। পুকুরে বড়শী দিয়ে মাছও ধরেন তিনি। বিষয়টি বাঁশগ্রামের লোকজন সবাই জানে। আক্তারের সঙ্গে ওই বিচারকের বিভিন্ন সময় তোলা ছবিও রয়েছে।

বাগুলাট ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন বলেন, ‘আক্তারের বাবা স্বাধীনতাবিরোধী ছিলেন। তার ভাইও সন্ত্রাসী ছিল। আক্তারের সঙ্গে চরমপন্থী দলের সম্পৃক্ততা ছিল। পুলিশ এর আগে একটি বাড়িতে সন্ত্রাসীদের অবস্থান জেনে ঘিরে ফেলে। সারারাত বন্দুকযুদ্ধ হয়। পরে ওই বাড়ি থেকে আক্তারসহ ৭ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ৬টি ভারি অস্ত্র উদ্ধার করে। এছাড়া অপহরণ, ডাকাতি ও হত্যার মতো নানা অপরাধে সে জড়িত। নাসিম রেজা নামে ওই বিচারকের সঙ্গে তার গভীর সখ্যতা। তার নাম ভাঙিয়ে আক্তার নানা অপরাধ করে বেড়ায়।’

স্থানীয়রা জানান, গত ২০ জুন কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার বাঁশগ্রামে আওয়ামী লীগ সমর্থিত এক পরিবারের ওপর হামলা চালিয়ে আজম মুন্সী নামে এক আওয়ামী লীগ সমর্থককে কুপিয়ে হত্যা এবং অপর ২ জনকে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে প্রতিপক্ষের লোকজন। এ ঘটনায় ২৭ জনকে আসামি করে কুমারখালী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন নিহতের ছেলে মুসফিকুর রহমান জিল্লু। ওই হত্যা মামলার ৪নং আসামি আক্তারুজ্জামান আক্তার। মামলার পর থেকেই পলাতক রয়েছেন আক্তারসহ মামলার অন্য আসামিরা। হত্যাকাণ্ডের ১৬ দিন অতিবাহিত হলেও পুলিশ অভিযান চালিয়ে আক্তারকে গ্রেফতার করতে পারেনি।

এদিকে হঠাৎ করেই ১ জুলাই রাত ৮টার দিকে হবিগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ এসএম নাসিম রেজা তার নিজের ফেসবুক আইডিতে আসামি আক্তারুজ্জামান আক্তারের সঙ্গে তোলা একটি ছবি পোস্ট করেন। ছবির ক্যাপশনে তিনি লেখেন ‘নতুন গাড়ি পেলাম, সকলের দোয়া চাই।’

ওই ছবিতে দেখা যাচ্ছে ‘ঢাকা মেট্রো-গ ৪২-৭৮১৫’ নম্বরের সিলভার রঙের কার গাড়ির সামনে দুই পাশে দুই যুবককে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন অতিরিক্ত জেলা জজ এসএম নাসিম রেজা। ছবির বাম পাশে গেঞ্জি পরে দাঁড়িয়ে থাকা যুবকই কুষ্টিয়ার কুমারখালী থানার হত্যা মামলার পলাতক আসামি আক্তারুজ্জামান আক্তার।

কুমারখালী থানা পুলিশের ওসি এসএম মিজানুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, আমরা শোনার সঙ্গে সঙ্গে হবিগঞ্জের পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। মামলার নথিপত্র হবিগঞ্জ সদর থানার ওসির কাছে পাঠানো হয়েছে। ওখানকার পুলিশ তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা করছে।

তিনি বলেন, কুমারখালী থানায় ২১ জুন দায়ের হওয়া ১২নং হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত চার নম্বর আসামি আক্তারুজ্জামান। পূর্বেও তার বিরুদ্ধে নানা অপরাধের রেকর্ড রয়েছে।

হবিগঞ্জ সদর থানা পুলিশের ওসি সহিদুর রহমান জানান, কুমারখালী থানার ওসির সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ চলছে। তারা মামলার সকল কাগজ আমাদের কাছে পাঠিয়েছেন। পুলিশ সবদিকে নজর রেখেছে। আসামিকে ধরতে আমরা কাজ করছি।

হত্যা মামলার আসামির সঙ্গে সখ্যতার বিষয়ে হবিগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ এসএম নাসিম রেজা জানান, আমি হবিগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা জজ। সরকার আমাকে একটি নতুন গাড়ি দিয়েছে। দুই-তিন দিন আগে গাড়িটি আনতে আমি ঢাকায় যাই। ঢাকাতেই আক্তারের সঙ্গে আমার দেখা হয়। সেখান থেকে গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে একটি ছবি তুলে আমি নিজেই ফেসবুকে পোস্ট করি। আমি জানতাম না আক্তার হত্যা মামলার পলাতক আসামি।

আক্তারের সঙ্গে কিভাবে পরিচয় হয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে ওই বিচারক বলেন, আক্তার আমার ছোট ভায়ের মতো। আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম, তখন কুষ্টিয়ার বাঁশগ্রাম কলেজের এক শিক্ষক আমার সঙ্গে পড়ত। ওই শিক্ষকের ছাত্র ছিলেন আক্তার। তার মাধ্যমে আক্তারের সঙ্গে আমার পরিচয়। ঢাকাতেই আমার সঙ্গে সে ঘুরেছে। এরপর সে কোথায় আছে আমার জানা নেই।

কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের সদস্য বাগুলাট ইউনিয়নের বাসিন্দা মফিজ উদ্দিন বলেন, আক্তারের পরিবারের সদস্যরা সবাই সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে জড়িত। আক্তার নিজেই একাধিক হত্যা ও ডাকাতি মামলার আসামি। তার বাবা মৃত মনছুর আলীও একাধিক হত্যা ও ডাকাতি মামলার আসামি ছিলেন। ১৯৯৭ সালে সন্ত্রাসীরা তাকে গুলি করে হত্যা করে। বড় ভাই আব্দুস ছাত্তারও হত্যা ও ছিনতাই মামলার আসামি ছিলেন। ২০১০ সাল থেকে তিনি নিখোঁজ আছেন।