অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স ও মহাবিপর্যয়

0
150

অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের কুফল নিয়ে সবখানে চলছে ব্যাপক আলোচনা। এ নিয়ে লিখেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহের ফার্মাকোলজি বিভাগের প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর ড. কাজী রফিকুল ইসলাম পর্ব ২ অ্যান্টিবায়োটিক রেসিডিউ : অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের পর প্রাণীদেহে এর যে অংশ নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত জমা হয়ে থাকে এবং মাংস, দুধ, ডিম, মলমূত্রের সঙ্গে বের হয়ে আসে, তাই অ্যান্টিবায়োটিক রেসিডিউ।

ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচারাল অর্গানাইজেশন (এফএও)-এর জরিপ মতে, পৃথিবীতে উৎপাদিত অ্যান্টিবায়োটিকের অর্ধেকের বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে প্রাণী চিকিৎসায়। প্রাণী চিকিৎসায়, রোগ প্রতিরোধ এবং কিছু কিছু প্রাণিজ আমিষ উৎপাদনে গ্রোথ প্রোমোটর হিসেবে অ্যান্টিবায়োটিকে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এটি ব্যবহারের পর তা প্রাণীর মাংস, দুধ, ডিমে অবশিষ্ট আকারে থেকে যায়। তাই প্রতিটি ওষুধ ব্যবহারের পর একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ওই প্রাণীর মাংস, ডিম, দুধ, খাওয়া থেতে বিরত থাকতে হয়, যা অ্যান্টিবায়োটিকের প্রত্যাহার নামে পরিচিত। এই প্রত্যাহার কাল সঠিকভাবে না মানলে সেই প্রাণীর দেহে অ্যান্টিবায়োটিকের রেসিডিউ থেকে যায়।

এই রেসিডিউর পরিমাণ সর্বোচ্চ অবশিষ্ট মাত্রা (এমআরএল) অথবা গড় দৈনিক গ্রহণ (এডিআই) থেকে বেশি হলে মানুষের দেহে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে এবং এই স্বল্পমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া অ্যান্টিবায়োটিকের প্রতি রেজিস্ট্যান্ট করে তোলে। আরেকটি বিষয়, মানুষ, প্রাণী এবং মাছের চিকিৎসায়, প্রতিরোধে অথবা গ্রোথ প্রোমোটার হিসেবে যে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহৃত হচ্ছে তার মধ্যে হাঁচি, কাশি এবং মলমূত্র দ্বারা কিছু কিছু অ্যান্টিবায়োটিক অ্যাকটিভ অবস্থায় পরিবেশে আসে। পরিবেশে থাকা অ্যান্টিবায়োটিক রেসিডিউগুলো পানি ও মাটিতে জন্মানো শাকসবজিতে চলে যায়। অন্যদিকে এই অ্যান্টিবায়োটিকগুলো অ্যাকটিভ অবস্থায় স্বল্পমাত্রায় পানি, বাতাস ও মাটিতে থাকে, যা পরিবেশে অবস্থানকারী ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করার চেষ্টা করে। কিন্তু স্বল্পমাত্রায় হওয়ায় এটি রেসিডিউ ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করতে পারে না। উপরন্তু ব্যাকটেরিয়া ওই অ্যান্টিবায়োটিকের প্রতি রেজিস্ট্যান্স হতে বাধ্য হয় ।

অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স ও মহাবিপর্যয় বিশ্বের অনুন্নত দেশগুলোয় সবচেয়ে বেশি অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার হয়ে থাকে। এই সব দেশে অ্যান্টিবায়োটিক প্রায় সর্বত্রই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া গ্রহণ করা হয়। এক জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে মাত্র ৮% অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসকের উপদেশে বিক্রি করা হয়। অনেকেই সাধারণ ভাইরাসজনিত জর-সর্দি-কাশির জন্য অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করে থাকেন, যেখানে এটি সম্পর্র্ণ অকার্যকর। উন্নত বিশ্বেও এ সমস্যা বিদ্যমান।

সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল (সিডিসি), আমেরিকা-এর এক জরিপে দেখা গেছে, চিকিৎসকদের অ্যান্টিবায়োটিক প্রেসক্রিপশনের মধ্যে কানের সংক্রমণের জন্য ৩০%, সাধারণ ভাইরাসজনিত ঠাণ্ডার জন্য ১০০%, গলা ব্যথার জন্য ৫০% অ্যান্টিবায়োটিক প্রেসক্রিপশন অপ্রয়োজনীয়। সারা বিশ্বের বিশেষ করে অনুন্নত দেশগুলোয় খামারিরা কম সময়ে অধিক লাভবান হওয়ার আশায় গবাদিপশু ও মুরগিতে যথেচ্ছ অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করেন। এই নিয়ন্ত্রণহীন অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার মানুষের জন্য বয়ে আনছে ব্যাপক স্বাস্থ্য ঝুঁকি।

অনেক খামারি গ্রোথ প্রোমোটর হিসেবে খাবারের সঙ্গে অ্যান্টিবায়োটিক মিশিয়ে দিচ্ছেন গবাদিপশু মোটাতাজাকরণ অথবা ব্রয়লার উৎপাদনে। ফলে যেসব পশুপাখি অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ানো হচ্ছে, সেসব পশুপাখির শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট জীবাণু তৈরি হচ্ছে এবং তা মলমূত্র ত্যাগ করার মাধ্যমে পরিবেশের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। সেখানে অন্যান্য জীবাণুও রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়ার সংস্পর্শে এসে জিন ট্রান্সফরমেশন এবং মিউটেশনের মাধ্যমে রেজিস্ট্যান্ট হচ্ছে।

এভাবে একটা মহামারী নীরবে ঘটে যাচ্ছে। অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে আমরা আবার ফিরে যাব সেই যুগে, যে যুগে অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার হয়নি, যখন মানুষ সাধারণ সর্দি, কাশি, কাটাছেঁড়ায় মারা যেত। অন্যদিকে বিগত কয়েক দশকে নতুন অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার না হওয়ায় অথবা ভবিষ্যতে যদি নতুন অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার না হয় এবং অ্যান্টিবায়োটিকের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে যদি অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স সহনীয় মাত্রায় নিয়ে আসা না যায়, তবে তা চিকিৎসা সেবায় মহাবিপর্যয় নিয়ে আসতে পারে।