বাজেটে বৈদেশিক নির্ভরতা কমছে

0
143

বাজেট প্রণয়ন ও সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে বৈদেশিক সাহায্য নির্ভরতা ক্রমেই কমছে। বাজেট তৈরিতে বৈদেশিক সহায়তার পরিমাণ মোট বাজেটের ৫ শতাংশ ধরলেও সরকার এখন নিজস্ব সম্পদ দিয়েই বাৎসরিক বাজেট তৈরি করছে এবং তা বাস্তবায়ন করছে। গত কয়েক বছর ধরেই সরকার বৈদেশিক সহায়তার পরিমাণ মূল বাজেটের মাত্র পাঁচ শতাংশ হারে ধরেই বাজেট তৈরি করছে। যদিও সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে কম হোক বেশি হোক বৈদেশিক সহায়তা অপরিহার্য। এর মধ্যে অনুদান ও ঋণ দুই ধরনের সহায়তাই রয়েছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ ও অর্থ বিভাগ সূত্রে এমন তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানিয়েছে, দেশের উন্নয়ন কর্মপরিকল্পনায় আর্থিক ঘাটতি পূরণের জন্য বৈদেশিক সহায়তার প্রয়োজন হয়, যা সংগ্রহের দায়িত্ব প্ল্যান করে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ বা ইআরডি। একইসঙ্গে ইআরডি ঋণ প্রোফাইল ও বাজেট তৈরি, ঋণ পরিশোধ, ঋণের হিসাব সংরক্ষণ এবং সার্বিক বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, বাজেটে বৈদেশিক সহায়তার পরিমাণ ক্রমেই কমিয়ে আনা হচ্ছে। এখন মাত্র পাঁচ শতাংশ ধরা হয়। নানা কারণে অনেক সময় সহায়তার এ অর্থ ছাড়ে জটিলতা হয়। এরপরও কোনও সমস্যা নেই। বাংলাদেশ এখন নিজস্ব সম্পদ দিয়ে বাজেট প্রণয়ন করছে। বংলাদেশ এখন সেই সক্ষমতা অর্জন করেছে। তিনি জানান, আগামী বাজেটেও বৈদেশিক সহায়তার পরিমাণ ৫ শতাংশ ধরেই বাজেট প্রণয়ন করা হতে পারে।

ইআরডি সূত্রে জানা গেছে, ড. ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছর এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের ১০ বছর মিলিয়ে মোট ১২ বছরে সরকার বৈদেশিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি পেয়েছে ৭৯ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলারের, বিপরীতে এই সময়ে ছাড় হয়েছে মাত্র ৩৫ দশমিক ৭১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে হয়তো সহায়তা বাবদ পাওয়া প্রতিশ্রুতির অর্থ ছাড়ের এ পরিমাণ আরও কিছুটা বাড়ানো যেতো। তবে এতে বাজেট বাস্তবায়নে তেমন কোনও সমস্যাই তৈরি হয়নি।

ইআরডি সূত্রে জানা গেছে, ২০০৫-০৬ অর্থবছর থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছর পর্যন্ত সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী বৈদেশিক সহায়তা বাবদ পাওয়া মোট প্রতিশ্রুতির পরিমাণ ৭৯ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে অনুদানের পরিমাণ ৮ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা শতকরা হিসেবে ১০ দশমিক ৬১ শতাংশ এবং ঋণের পরিমাণ ৭১ দশমিক ১৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা শতকরা হিসেবে ৮৯ দশমিক ৩৯ শতাংশ। আলোচ্য ১২ বছরে সহায়তা বাবদ দাতা দেশগুলো ছাড় করেছে মাত্র ৩৫ দশমিক ৭১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে অনুদান ৭ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, শতকরা হিসেবে এ হার ২১ দশমিক ৬ শতাংশ এবং ঋণের পরিমাণ ২৭ দশমিক ৯৮ শতাংশ, শতকরা হিসেবে এ হার ৭৮ দশমিক ৪ শতাংশ।

ইআরডি সূত্র জানিয়েছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছর বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে বিশ্বব্যাংক থেকে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ বৈদেশিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি পেয়েছে, যার পরিমাণ ২ হাজার ৯৩৫ দশমিক ৬৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর পরের অবস্থানেই রয়েছে জাপান। এই সময়ে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগী দেশ হিসেবে জাপান থেকে বছরে বৈদেশিক সহায়তা প্রতিশ্রুতির গড় পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৮১৩ দশমিক ২১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। গত ১০ বছরে বৈদেশিক সহায়তার প্রতিশ্রুতির গড় পরিমাণ ছিল ৭ হাজার ২৭৪ দশমিক ৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। দেশের স্বাধীনতা উত্তরকালে সর্বোচ্চ প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে ২০১৬-১৭ অর্থবছর, যার পরিমাণ ছিল ১৭ হাজার ৯৬১ দশমিক ৮৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

ইআরডি জানিয়েছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছর বৈদেশিক সহায়তার জন্য বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর সঙ্গে মোট ৯৮টি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। যার মধ্যে অনুদান চুক্তি ৫০টি এবং ঋণ চুক্তি ৪৮টি এবং মোট ১৪ হাজার ৬১২ দশমিক ১৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে, যা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।

সূত্র জানিয়েছে, ২০০৫-০৬ অর্থবছর থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছর পর্যন্ত মোট বৈদেশিক সহায়তা ছাড়ের পরিমাণ ৩৫ দশমিক ৭১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে অনুদান ৭ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, শতকরা হিসেবে যা ২১ দশমিক ৬ শতাংশ এবং ঋণের পরিমাণ ২৭ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা শতকরা হিসেবে ৭৮ দশমিক ৪ শতাংশ। গত ১০ বছরে বৈদেশিক সহায়তা ছাড়ের গড় পরিমাণ ছিল ৩০৪৪ দশমিক ৮৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

উল্লেখ্য, ২০১৬-১৭ এবং ২০১৭-১৮ এই অর্থবছরই মোট ৩২ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বৈদেশিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে, যা আগামী ৪ থেকে ৫ বছরের মধ্যে ছাড় করা সম্ভব হবে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. এ বি মীর্জ্জা আজিজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘বৈদেশিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি এবং ওই অর্থ ছাড়ের বিষয়টি নির্ভর করে সহায়তাকারী দেশ বা সংস্থার মর্জির ওপর। তারা টাকা ছাড়ের ক্ষেত্রে বেশকিছু শর্ত দেয়। ওই শর্ত পূরণ করা না করার ওপরই নির্ভর করে সহায়তার অর্থ ছাড় কী পরিমাণ হবে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় শর্ত হচ্ছে ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার বিষয়টি। এ তিনটি বিষয় নিশ্চিত করতে পারলে অর্থ ছাড় ত্বরান্বিত হয় বলে আমি মনে করি।’

এ প্রসঙ্গে সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, গত ১০ বছরে বৈদেশিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি ও অর্থছাড়ের পরিমাণ খুবই সন্তোষজনক ছিল। আমার সময়কালের শেষ দুই বছর সর্বোচ্চ সহায়তার প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। একইসঙ্গে ছাড়ের পরিমাণও ভালো ছিল। তবে এখন আর বৈদেশিক সহায়তার ওপর বাজেট তৈরি নির্ভর করতে হয় না। নিজস্ব সম্পদ দিয়েই বাজেট তৈরি সম্ভব।