কুরআন সুন্নাহর মাপকাঠিতে শবে বরাত

0
121

মাওলানা মুফতী মোঃ ওমর ফারুক

চন্দ্র বৎসরের ৮ম মাসের নাম শা’বান মাস। এই মাসের ১৪ই তারিখ দিবাগত রাতকে লাইলাতুল বরাত বা শবে’বরাত বলা হয়। “শবে’বরাত” দুটি শব্দে গঠিত একটি ব্যাপক পরিচিত ধর্মীয় অনুষ্ঠানের নাম। “শব” শব্দটি ফারসি। যার অর্থ হচ্ছে রাত্রি। আর বরাত শব্দের অর্থ অদৃষ্ট ভাগ্য, খঁপশ ইত্যাদি। সুতরাং শবে’বরাত মানে হচ্ছে ভাগ্য রজনি।
আমাদের দেশের সাধারণ মুসলমানদের ধারণা বদ্ধমূল যে এ রাতটি হলো এমন একটি রাত যে রাতে আল্লাহ মানুষের এক বছরের বাজেট নির্ধারণ করেন। এক বছরের জন্য কে কী খাবে, কী করবে তা লিপিবদ্ধ করেন।
অনেকে মনে করেন যে যদি এ রাতে ভাল খাবার খাওয়া যায়, ভাল কাপড় পড়া যায় তা হলে সারা বছরই ভাল অবস্থায় দিন যাবে। আবার অনেকে মনে করেন, এ রাতে সন্ধ্যায় এবাদতের নিয়তে গোসল করলে প্রত্যেকটি ফোঁটায় ৭০ জন করে ফেরেস্তা তৈরী হয় এবং তারা সারারাত ওই ব্যক্তির জন্য দোয়া করে, মাগফিরাত কামনা করেন।
গ্রামে গঞ্জে এখনও দেখা যায় যে, এই রাত আসার আগ থেকেই প্রত্যেক মসজিদে মসজিদে বিশেষ দোয়া মুনাজাত ও বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। বাসা বাড়ীতে রুটি, হালুয়া, পোলাও, কোরমা, ফিরনি ইত্যাদি তৈরী করে ধুমধাম করে আনন্দের সাথে খেতে দেখা যায়। এই দিনে দেরীতে বাজারে গেলে গোশত পাওয়া মুসকিল। এইভাবে সকল প্রকার আয়োজন সম্পন্ন হয়ে থাকে শবে’বরাত উদযাপন করার জন্য।
অনেকে এমন আছেন যে, নতুন জামা নতুন টুপি পড়ে আতর গোলাপ মেখে রাতভর নফল নামাজ, যিকিরে কাটিয়ে দেন। সকালে ফজরের নামায আদায় না করেই ঘুমিয়ে যান পরদিন ১০টায় জাগেন। এমন অনেক আছেন যারা মনে করেন এই দিন বড় পীর আব্দুল কাদির জিলানী (রহঃ) হয়ে যাবেন ভাবটা এমন। কিন্তু এই শ্রেণীর লোক ফরজ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ যথাযথভাবে আদায় করেন না।
একটি কথা সকলেরই জানা থাকা জরুরী যে, একশ কোটি রাকাত নফল নামাজ এক রাকাত ফরজ নামাজের সমান নহে। তবে হ্যাঁ নফল নামাজে অনেক সওয়াব রয়েছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু তা কখনো ফরজ নামাজের সমান নহে। অনেকে এইভাবে সারারাত ইবাদতের শেষে পরদিন যখন আবার ভাল কিছু পায় না অথবা ভাগ্যে জুটে না তখন বলে থাকেন শবে বরাতে আল্লাহ প্রথম দিকে এমপি মন্ত্রী শিল্পপতি ও সমাজের বড় বড় লোকদের ভাগ্য লিখতে লিখতে আল্লাহর কলমের কালি শেষ হয়ে গেছে পরে আমাদের ভাগ্যে “সাবেক হুকুম ” বহাল (নাউজুবিল্লাহ)ফলে আমাদের ভাগ্য বদলায় না ।
এ সকল ধারণার জন্ম কোত্থেকে? এ সকল ধারণার পিছনে মূলত কতিপয় দূর্বল, বানোয়াট ও মনগড়া কথা যা হাদিস বলে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে আর কিছু সংখ্যক অদূরদর্শী অল্প শিক্ষিত আলেম এ জাতীয় হাদিসগুলো কে পূজি করে রঙ ঢঙ লাগিয়ে আলোচনা করার ফলে সমাজে এর প্রচলন হয়ে গেছে এবং সর্ব সাধারণের কাছে তা নেক আমল ও ছওয়াবের বিষয় হিসাবে পরিগণিত হয়েছে এবং ইসলামের মৌলিক বিষয় সমূহের ন্যায় এটি পালন, এ রাতে মসজিদে খিচুরী অথবা বিরিয়ানী খাওয়ার আয়োজন করতে হবে এলাকার সকল মুসুল্লী কে দলে দলে মসজিদে গিয়ে বরাতের আলোচনা নফল ইবাদতে সারারাত কাটিয়ে দেওয়াটা কে আবশ্যক বিষয় হিসাবে নেওয়া হয়েছে এবং ইসলামের মৌলিক বিষয়াবলীর উপর এর অবস্থান দেখা যাচ্ছে। আর যুবক ছেলেরা দল বেধে এই মসজিদ থেকে ঐ মসজিদে দৌঁড়াদৌঁড়ি করবে মাঝে মধ্যে দু/চার রাকাত নামাজ আদায় করবে এবং বলাবলি করবে কে কত রাকাত নামাজ আদায় করল? কে কতবার দুরুদ পড়ল? আবার বেশীর ভাগ সময় ফটকা বাজি করবে , আতশ বাজি করবে, ফটকা বোমা ফুটাবে, মটর সাইকেলের বহর নিয়ে খুব জোরে সোরে এদিক ও দিক ছুটাছুটি করবে আর বাসা বাড়ীতে খোরমা পোলাও পায়েশ ও নানা রঙের খাবার তৈরীতে মা বোনেরা এতই ব্যস্ত হয়ে পড়বে যে ফরজ নামাজের কথাও ভুলে যাবে অথবা নামাজ আদায় করার সময় পাবে না! অধিকাংশ এলাকায় এমনটিই দেখা যায়, তা হলে বিষয়টি কেমন হলো? শবে’বরাতের অর্থ কি দাঁড়ালো?
প্রকৃত বিষয় হচ্ছে ইসলামে যে বিষয়টি যেভাবে আছে তার চেয়ে কিছু বাড়িয়ে অথবা কাঁটছাট করে কমবেশী করার কোন সুযোগ নাই। যেমন মাগরীবের ফরজ নামাজ তিন রাকাত, কেহ ইচ্ছ করে ইহাকে চার রাকাত অথবা দুই রাকাত আদায় করলে যেমন ছওয়াবের পরিবর্তে গুনাহ হবে তদ্রুপ ইসলামের অপরাপর বিষয় সমুহের ক্ষেত্রেও তাই। অর্থাৎ শরীয়তের কোন বিধানে বাড়ানো বা কমানোর কোন ক্ষমতা কারো নাই।
শবে বরাতের অস্তিত্ব:
(ক) আসলে আমাদের দেশে সাধারণ মানুষ শবে বরাত কে যে অর্থে যেভাবে পালন করছে ইসলামী শরীয়তে এ অর্থে মূলত কোন রাত আছে বলে কোন মুহাক্কিক আলেম বলেন না। ইসলামী জীবন বিধানের মূলনীতি বর্ণিত হয়েছে মহাগ্রন্থ আল কুরআন ও হাদিসে রাসুল (সাঃ) থেকে। এ দুটোই আরবী ভাষায় ফলে শরীয়তের যে সকল বিষষ ইসলাম স্বীকৃত তার আরবী পরিভাষা গোটা পৃথিবীতে ব্যাপৃত। পরবতীতে সেগুলো অনুবাদ হলে ও আরবী পরিভাষা বিলুপ্ত হয়ে যায় নি যেমন সালাত, সাওম, হজ¦ ইত্যাদি। তাই বুঝা গেল যে শবে বরাত যেমন আরবী পরিভাষা নয় তেমনি ইহা ইসলামী পরিভাষা ও নয়।
(খ) ইসলামী শরীয়তে কতগুলো ইবাদত অনুষ্ঠান বা মর্যাদা সম্পন্ন দিন রয়েছে তার একটি ও বছরে একই নামে দু’বার উদযাপিত হয় না অনেকে লাইলাতুল কদর অর্থে শবে বরাত করে থাকেন তাদের মনে রাখা দরকার যে, লাইলাতুল কদর রমজান মাসে শাবান মাসে নয় সুতরাং শবে বরাত আর লাইলাতুল কদর একই অর্থে নয়।
(গ) কোন সময়ের মর্যাদা কতটুকু তা বর্ণনা করার অধিকার একমাত্র আল্লাহ তায়ালা এবং মুহাম্মদ সা: ছাড়া অন্য কেউ নয়। এমন একটি সহীহ হাদিস বা কুরআনের উদ্ধৃতি পাওয়া যাবে না যেখানে শবে বরাত কে আমরা যে ভাবে উদযাপন করছি তেমনটি করার কথা বর্ণিত হয়েছে।
শাবানের মধ্যবর্তী রাত বা “নিছফুস” শাবানের মর্যাদা ও আমাদের করণীয় বর্জনীয়:
০১. হযরত আলী রা: রাসুল সা: হতে যে দীর্ঘ হাদিস বর্ণনা করেছেন তিনি বলেছেন যখন শাবান মাসের মধ্যরাত্রি আসবে তখন সে রাত ইবাদতের মাধ্যমে কাটাবে আর দিন কাটাবে রোযা রাখার মাধ্যমে। কেননা আল্লাহ ওই দিন সুর্যাস্তের সাথে সাথে ১ম আকাশে অবতরণ করে বলেন কোন ক্ষমা প্রার্থনাকারী আছে কি? যাকে আমি ক্ষমা করব, কোন রিজিক অণে¦ষণকারী আছে কি? যাকে আমি রিযিক দিবো? কোন বিপদগ্রস্ত আছে কি? যাকে আমি বিপদ হতে উদ্ধার করব? ইত্যাদি।
০২. হযরত আয়শা রা: হতে এক দীর্ঘ হাদিস বর্ণিত আছে তিনি বলেন আমি একদা রাসুলুল্লাহ সা: কে রাতে খুঁজে পাচ্ছিলাম না তখন আমি তাকে খুঁজতে বেরিয়ে দেখি যে তিনি জান্নাতুল বাকীতে আকাশের দিকে হাত উত্তোলন করে দোয়া করছেন। হযরত আয়শা রা: বলেন যে আমি বললাম হে আল্লাহর রাসুল আমি ধারণা করেছিলাম যে আপনী আপনার অন্য কোন স্ত্রীর কাছে পর্দাপণ করেছেন । তখন রাসুল সা: বললেন শাবান মাসের মধ্যরাতে আল্লাহ প্রথম আকাশে অবতীর্ণ হন অত:পর বিশাল সংখ্যক মানুষ কে ক্ষমা করে দেন ।
০৩. হযরত আবু মূসা রা: নবী করীম (সাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন-তিনি বলেছেন আল্লাহ শাবান মাসের মধবর্ত্যী রাতের এক বিশেষ ভূমিকায় অবতীর্ণ হন এবং মুশরিক ও হিংসুক ব্যতীত সকলকে ক্ষমা করে দেন। উল্লেখিত হাদিস ব্যতীত আরো অনেক হাদিস রয়েছে যে সকল হাদিসে শবে বরাতের মর্যাদার কথা পাওয়া যায়। উল্লেখিত হাদিস সমূহ সনদের দিক থেকে দুর্বল।
০৪. কিন্তু একটি হাদিস ও এরূপ নেই, যে হাদিসে বলা হয়েছে এই রাতে পুরুষ লোক দলে দলে মসজিদে বা কোন বিশেষ স্থানে একত্রিত হয়ে মিষ্টি, খুরমা, পোলাও বিরিয়ানী খাবে বা একত্রে দোয়া মুনাজাত করবে, একত্রে নফল নামাজ আদায় করবে এবং মহিলারা সারাদিন পিঠা পায়েশ তৈরীতে ব্যস্ত থাকবে ফরজ নামাজ আদায় করার ও সময় পাবে না যেমনটা অনেক বিয়ে বাড়ীতে ঘটে থাকে। তদুপরি আমাদের দেশে শবেবরাত কে কেন্দ্র করে যা ঘটে, যেমন যুবক ছেলেরা নামকা ওয়াস্তে ২/৪ রাকাত নামাজ আদায় করে-ই রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায় হুন্ডার বহর নিয়ে এদিক ওদিক ছুটে বেড়ায়, আতশবাজি, ফটকা ফুটানো খেলনা বোমা ফুটানো ইত্যাদি অপকর্ম করে রাতভর জেগে থাকে সকালে অনেকেই ফজর নামাজ আদায় না করে ঘুমিয়ে থাকে যা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও কুসংস্কার। শুধু তাই নয় হাটে বাজারে গোশতের দোকানগুলোতে দীর্ঘ লাইন পড়ে যায় অবস্থার আলোকে মনে হয় যেন আজকেই গোশত খাওয়ার শেষ দিন! যে কোন মূল্যে গোশত চাই! এতে অসাধু ব্যবসায়ীরা সময়ের সদ্বব্যবহার করে থাকেন ফলে কারো একান্ত কোন প্রয়োজন থাকলে অথবা পূর্ব নির্ধারীত কোন অনুষ্ঠান থাকলে তাকে অতিরিক্ত মাশুল দিতে হয় যা কোন সমাজের ও কাম্য নয় ইসলামের ও বিধান নয়।
০৫. ইহা ইসলামী সংস্কৃতির নামে পরোক্ষভাবে ইসলামকে হেয় ও ইসলামের অবমাননার শামিল। যা হতে পারে না, হতে দেওয়া উচিৎ নয়। আলেম ওলামা ও সরকারের উচিৎ এ বিষয়ে জনসাধারণকে পূর্বেই সতর্ক করা যেন কোন দিবস কে কেন্দ্র করে বিশেষ কোন মহল ফায়দা হাসিল করার সুযোগ না পায়।
আমাদের করণীয় ঃ
এ রাতে ইবাদত করতে চাইলে ফরজ নামাজ জামাতে আদায় করে একাকী কিংবা পরিবার কে সাথে নিয়ে নিরিবিলি ইবাদত করার পদ্ধতিই অপেক্ষাকৃত উত্তম।
শুধুমাত্র শবে বরাতের রাতেই আল্লাহ তায়ালা শেষ রাতে বান্দাকে মাগফিরাতের জন্য আহব্বান করেন নি বরং সারাবছরের প্রতি রাত্রেই রাতের শেষভাগে আল্লাহ বান্দাকে বিশেষভাবে ক্ষমা করার জন্য আহব্বান করে থাকেন, তাই আল্লাহর প্রিয় বান্দারা তাহাজ্জুত নামাজ আদায়ের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে থাকেন। তাহাজ্জুত নামাজ মনিবের কাছে গোলামের চাওয়া পাওয়ার সর্বোত্তম মাধ্যম এবং শরীরের মেদভূড়ি ও বাথ কমানোর জন্য এক অনন্য উপাদান, এ উপাদান টি যে দেশে যত বেশী কাজে লাগাবে সে দেশের জনগণ ততবেশী শান্তি, সমৃদ্ধি লাভ করবে, পরনির্ভরশীলতা দূর হবে, আর্দশ জাতি হিসাবে পরিগণিত হবে। আমাদের উচিৎ এ উপাদানটি কে শক্ত করে ধারণ করা।
রাতের বেলা সুরমা সুগন্ধি ও ভাল পোশাক পরে ভাল খাবার খেয়ে নিজস্ব পরিবেশে থেকে নফল নামাজ, যিকির, দোয়া দরুদ পড়ে রাত্রি জাগা অন্যের ইবাদতে বিঘœ না ঘঠানো অসীম ছওয়াবের কাজ (আর ইহা শুধু শবে’বরাতেই নির্দিষ্ট নয়) তাতে কোন সন্দেহ নেই, দিনের বেলা রোজা রাখার জন্য ও হাদিসে উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। আর প্রতি মাসেই কমপক্ষে তিনটি নফল রোজা রাখার কথা হাদিসে পাওয়া যায় আর রাসুল সা: শাবান মাসেই সবচেয়ে বেশী নফল রোজা রেখেছেন এই দৃষ্টিকোণ থেকে শাবান মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ এই তিনটি রোজা রাখাই উত্তম প্রতি মাসে তিনটি রোজা রাখলে সুস্বাস্থ্য লাভ করা যায়, শরীরের ওজন ঠিক থাকে, ভূড়ি কমাতে সাহায্য করে। শরীর স্লিম রাখতে চাইলে, ধূমপানের মত মারাত্থক বাজে অভ্যাস ত্যাগ করতে চাইলে, এই আমলটি নিয়মিত করতে পারেন।

তবে সাথে সাথে এ কথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, এই দিনে গোশত পোলাও, রুটি হালুয়া ইত্যাদি খেতেই হবে, যে কোন মূল্যে এসবের ব্যবস্থা করতেই হবে এ রাতে এসব খাবার না খেলেই নয়! হালুয়া রুটি বিতরণ না করলেই নয়! ইত্যাদি ধারণা পোষণ করা মোঠেই ঠিক নহে এ সমস্ত ধারণা পোষণ করা ঈমান আকিদার পরিপন্থি।
কিন্তু এই ধারণা পোষণ করা যাবে না যে, শবে বরাত মানেই মসজিদে জড়ো হওয়া আবশ্যক, শবে বরাত মানেই গোটা বছরের ভাগ্য নির্ধারণ করা, শবে বরাত মানেই হালুয়া রুটি খাওয়া বা বিতরণ করা। আল্লাহ আমাদের সকল কে সঠিক বুঝ দান করেন আমীন।

লেখক, কলামিস্ট, কবি, সাহিত্যতিক ও বিশিষ্ট ব্যাংকার
ঙভধৎড়য়১২৬৬২@মসধরষ.পড়স