সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে যত উদ্যোগ

গরিব ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে আর্থিক সহায়তাসহ সম্ভাব্য সব ধরনের সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থাই হলো সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী। সরকারের দারিদ্র্য বিমোচন কৌশলপত্র (পিআরএসপি) ১৮টি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চিহ্নিত করেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর ‘সামাজিক নিরাপত্তা’, ‘সামাজিক ক্ষমতায়ন’ ও ‘সামাজিক সুরক্ষা’ শিরোনামে বিভিন্ন কার্যক্রমে বরাদ্দ রয়েছে। নগদ হস্তান্তর, খাদ্য নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানসহ নানা কর্মসূচি রয়েছে। কর্মসূচি, কার্যক্রম ও প্রকল্প মিলিয়ে মোট ১৩০টি খাতে এ বছর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে সামাজিক সুরক্ষাবাবদ বরাদ্দ রয়েছে ৬৪ হাজার ১৭৭ কোটি টাকা, যা বাজেটের ১৩ দশমিক ৮১ শতাংশ এবং জিডিপির ২ দশমিক ৫৩ শতাংশ। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের মূল বাজেট ব্যয় পরিকল্পনায় সামাজিক সুরক্ষায় বরাদ্দ ছিল ৫৪ হাজার ২০৬ কোটি টাকা, যা বাজেটের ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ ও জিডিপির ২ দশমিক ৪৪ শতাংশ। যদিও পরে সংশোধিত বাজেটে এর পরিমাণ কমিয়ে ৪৮ হাজার ৫২৪ কোটি টাকা করা হয়, যা সংশোধিত বাজেটের ১৩ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ এবং জিডিপির ২ দশমিক ১৭ শতাংশ।

বয়স্ক ভাতা:সরকারি তথ্য অনুযায়ী মোট জনসংখ্যার শতকরা ৭ ভাগ মানুষ বয়স্ক। এদের মধ্যে ২০ ভাগ মানুষ এ বেষ্টনীর আওতাভুক্ত। এ কর্মসূচির আওতায় বিধবা ও দুঃস্থ নারী ভাতা পান ৭ লাখ উপকারভোগী। দৈহিক অক্ষমতাসম্পন্ন দুঃস্থ ভাতায় দুই লাখ মানুষ উপকারভোগী।

দরিদ্র মায়েদের ভাতা: অন্যান্য বেষ্টনীর মতো এ বেষ্টনীর পরিধি সীমিত হওয়া সত্ত্বেও এটি পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়িত হচ্ছে। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে চালু করা এ বেষ্টনীর আওতায় মোট তিন হাজার ইউনিয়ন রয়েছে। এতে ইউনিয়ন প্রতি উপকারভোগী ১৫ জন।

যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ভাতা: মুক্তিযুদ্ধে আহত ব্যক্তিদের এ ভাতা দেওয়া হয়। দেশের প্রায় ১০ হাজার উপকারভোগী এ বেষ্টনীর আওতাভুক্ত।

অনাথ আশ্রম কর্মসূচি: এ কর্মসূচি দুটি ধারায় কাজ করছে। প্রথমটি হলো সরকার পরিচালিত শিশু পরিবার আশ্রম এবং দ্বিতীয়টি বেসরকারি অনাথ আশ্রম। প্রথমটির আওতায় প্রায় দশ হাজার অনাথ শিশু সুবিধা ভোগ করে। দ্বিতীয়টির সুবিধাভোগীর সংখ্যা প্রায় ৪৫ হাজার।

প্রান্তিক চাষিদের জন্য ভর্তুকি:জ্বালানি তেলের ভর্তুকি ডিজেলের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রান্তিক চাষিদের জন্য ভর্তুকি দিয়ে সেচ কাজ পরিচালনার জন্য এ সুবিধা দেওয়া হয়।  ২০০৭-০৮ অর্থবছরে মোট ভর্তুকি বরাদ্দ ছিল ৭৫০ কোটি টাকা।

ঝরেপড়া ছাত্রভাতা:এ কর্মসূচির আওতায় সারাদেশে প্রায় ৫৫ লাখ ছাত্রকে সাহায্য দেওয়া হচ্ছে। স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে প্রাথমিক স্কুলের এমন প্রায় পাঁচ লাখ ছাত্র এর আওতাভুক্ত হয়েছে। ছাত্রীভাতার আওতায় ৩০ লাখ সুবিধাভোগী রয়েছে।

প্রতিবন্ধী ছাত্রভাতা:সব পর্যায়ের প্রতিবন্ধী ছাত্রছাত্রী এ কর্মসূচির আওতাভুক্ত। ভাতার পরিমাণ পর্যায়ভিত্তিক কম-বেশি।

হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মস্থান: দেশের উত্তরাঞ্চলের পাঁচটি জেলায় এ ধরনের বেকারত্ব প্রকট। বেকার ব্যক্তিদের সহায়তার জন্য এ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছিল। সাময়িক এ বেকারত্ব সমস্যাটি ‘মঙ্গা’ বলে পরিচিত। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে এক মাসের জন্য হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মস্থান কর্মসূচিটি চালু হয়েছিল। কর্মসূচি বাস্তবায়নে মোট বরাদ্দ ছিল ১০০ কোটি টাকা। ওই বছরেই এ কর্মসূচিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়।

গ্রামীণ দুঃস্থ মায়েদের সুদমুক্ত ক্ষুদ্রঋণ: গ্রামীণ মাতৃকেন্দ্র (আরএমপি) কর্মসূচির আওতায় গ্রামীণ দুঃস্থ মায়েদের সুদমুক্ত ক্ষুদ্র ঋণ দেওয়া হয়। ৩১৮টি উপজেলায় সুবিধাভোগীর সংখ্যা ১২ হাজার ৯৬৫ জন। সুবিধাভোগীদের প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা, জন্মনিয়ন্ত্রণ ও অনানুষ্ঠানিক শিক্ষার জন্য প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে।

মাতৃস্বাস্থ্য ভাউচার কর্মসূচি: এ কর্মসূচি স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় বাস্তবায়ন করছে। এর আওতায় গ্রামীণ দরিদ্র ও গর্ভবতী নারীদের নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির কমিউনিটি পুষ্টি কর্মসূচির উদ্দেশ্য হলো গ্রামের দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে পুষ্টিহীনতা থেকে রক্ষা করা। দেশের ৫৪ জেলার ৩০৫টি উপজেলায় এ কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে।

খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি: খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি প্রধানত দুই ধরনের। ১. সনাতনী টেস্ট রিলিফ এবং ২. কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা)। কাবিখা কর্মসূচির মধ্যে দুই ধরনের কার্যক্রম রয়েছে। একটি হলো ভালনারেবল গ্রুপ ফিডিং (ভিজিএফ)। এ কর্মসূচির আওতায় হতদরিদ্রদের বিনা মূল্যে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়। অন্যটি হলো ভালনারেবল গ্রুপ ডেভেলপমেন্ট (ভিজিডি)। এর আওতায় দলগঠন, প্রশিক্ষণ, দক্ষতাবৃদ্ধি ও সঞ্চয় কার্যক্রম রয়েছে। মৌলিক চাহিদার ব্যয়ভিত্তিক দরিদ্র জনসংখ্যার মধ্যে শতকরা মাত্র ৪০ ভাগ জনগোষ্ঠী বিভিন্ন কর্মসূচির আওতাভুক্ত।

পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি উপজেলার ২ নং সোহাগদল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুর রশিদ বলেন, ‘সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির আওতায় হতদরিদ্র জনসাধারণ ব্যাপক সুবিধা পাচ্ছেন। এর ফলে তাদের জীবনমানে ব্যাপক পরিবর্তনও এসেছে। প্রতিবছই এর পরিধি ও বরাদ্দ বাড়ছে।’

পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার পানপট্টি ইউনিয়ন পরিষদের বাসিন্দা রমিজা বেগম সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মর্সূচির বিধবা ও দুঃস্থ মহিলা ভাতা সুবিধাভোগী। তিনি বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে এ ধরনের সহায়তা পাওয়ায় খুবই উপকার হচ্ছে তার। একসময় কেউ তাদের খোঁজ রাখতো না। এখন এ চিত্র বদলে গেছে। অনেকেই তাদের খোঁজ-খবর নিচ্ছে।

জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তাফা কামাল বলেন, ‘দারিদ্র্য ও অসমতা কমাতে নিয়মিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বাইরে সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম হলো অন্যতম হাতিয়ার। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার আলোকে হতদরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দিকে লক্ষ রেখে প্রতিবছর সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়ানো হচ্ছে। বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষেত্রে বিবেচনা করা হচ্ছে দুর্যোগপ্রবণ ও অতিদরিদ্র এলাকা এবং জনসংখ্যার অনুপাত।’ আগামীতেও এ প্রবণতা বলবৎ থাকবে বলে জানান তিনি।

সমাজকল্যাণমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদ বলেন, সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতা এবং বরাদ্দ প্রতিবছরই বাড়ছে। আগামীতেও বাড়বে। এ কর্মসূচির আওতায় যাদের আনা হয়েছে তারা একসময় খুবই অবহেলিত ছিল। আজ এ সুবিধার আওতায় তারা সরকারের পক্ষ থেকে অর্থ ও খাদ্য সহায়তা পাচ্ছে যা তাদের জীবনমান উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।