বাংলাদেশের ফুটবলার ঘণ্টায় ৩২ কিমি গতিতে দৌড়ায়!

বাংলাদেশের কোনো ফুটবলার বল নিয়ে এত জোরে দৌড়াতে পারেন!

আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচে কম্বোডিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের গোলটি দেখে অনেকেরই এমন আশ্চর্যসূচক প্রশ্ন। রবিউল হাসানের গোলটি যতটা না মাধুর্য ছড়িয়েছে, এর চেয়ে ঢের বেশি প্রশংসনীয় হয়েছে বলের জোগানদাতা মাহবুবুর রহমান সুফিলের ভোঁদৌড়। প্রতিআক্রমণে ঝড়ের গতিতে ওই একটা মুভই তো খুলে দিয়েছে গোলমুখ। 

লেফট ব্যাক সুশান্তের এরিয়াল থ্রু নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বাঁ প্রান্ত দিয়ে বল নিয়ে ঝড়ের বেগে ছুটছেন সুফিল। বাংলাদেশের এই উইঙ্গারের সঙ্গে দৌড়ে কুলিয়ে উঠতে না পেরে একেবারেই ছিটকে গেলেন কম্বোডিয়ান ডিফেন্ডার। বক্সে ঢুকে গোললাইনের কাছাকাছি গিয়ে আলতো কাট ব্যাকে বলটি গোলমুখে রবিউল হাসানের সামনে সাজিয়ে দিলেন। বলটা পোস্টে না রাখতে পারলেই অন্যায় হতো বুঝি! মিস হয়নি বলেই প্রায় তিন বছরের বেশি সময় পর বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের জয়। না, কম্বোডিয়ার বিপক্ষে এক জয় নিয়ে আর কোনো কথা নয়। কিন্তু সুফিলের গতির নাড়িনক্ষত্র খুঁজতে গিয়ে অবাক হতেই হলো। চুলচেরা বিশ্লেষণের পরিসংখ্যানটা চোখ কপালে তুলে দেওয়ার মতো।

১৯ বছর বয়সী সুফিলের গতি জানার আগে নিজের মনকেই একটা প্রশ্ন করুন, বাংলাদেশের এক ফুটবলার সেকেন্ডে কত মিটার বা ঘণ্টায় কত কিলোমিটার দৌড়ানোর সামর্থ্য রাখতে পারেন? এবার পড়ুন, প্রতি সেকেন্ডে সর্বোচ্চ ৮.৯ মিটার (হিসাবটা গত বছরের) দৌড়াতে পারেন সুফিল। ঘণ্টায় ৩২.০৪ কিলোমিটার। ভাবা যায়! প্রশ্নটা হলো, এই তথ্য বিশ্লেষণ কীভাবে জানা গেল? গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম বা জিপিএস যন্ত্রটির রিপোর্টেই এসেছে সুফিলের গতির নাড়িনক্ষত্র, যা সংরক্ষিত আছে বাংলাদেশের অন্যতম সেরা ও দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র উয়েফা লাইসেন্সধারী কোচ মারুফুল হকের কম্পিউটারে।

গত মৌসুমে আরামবাগ ক্রীড়াসংঘ দিয়ে দেশের ফুটবলে প্রথমবারের মতো জিপিএস প্রথার সূচনা করেন মারুফুল। দলটির অধিনায়ক ছিলেন সুফিল। প্রায় প্রতিটি ম্যাচেই জিপিএস চিপ জার্সির নিচে পরে মাঠে নামতেন ক্লাবপাড়ার খেলোয়াড়েরা। ফলে খুব সহজেই বের হয়ে এসেছে তথ্যটি। সে অনুযায়ী অবাক করার মতো তথ্য আছে আরও একটি। উইঙ্গার বা ফুলব্যাক হিসেবে খেললে ১৯ বছর বয়সী এই ফুটবলার ম্যাচে গড়ে দৌড়ান ১২ কিলোমিটার। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসে বসে কম্পিউটার খুলে তথ্যগুলো নিজেই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন সুফিলের সাবেক কোচ মারুফুল, সুফিল সেকেন্ডে ৮.৯ মিটার দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে। ও এই শক্তিটা মূলত পেয়েছে প্রকৃতিগতভাবে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে নিয়মতান্ত্রিক কঠোর পরিশ্রম। তবে জন্মগতভাবে না পেলে কঠোর অনুশীলন করে গতি খুব বেশি বাড়ানো যায় না।

এবার আসা যাক বিদেশি ফুটবলারদের সঙ্গে সুফিলের গতির পার্থক্যের তুলনায়। গত বছরের শেষ দিকের তথ্য অনুযায়ী, সর্বোচ্চ গতিসম্পন্ন ফুটবলার গ্যারেথ বেল। রিয়াল মাদ্রিদের এই ফুটবলার ২০১৮ সালে সর্বোচ্চ গতি তুলেছিলেন ঘণ্টায় প্রায় ৩৬.৯ কিলোমিটার। ফ্রান্সকে বিশ্বকাপ জেতানো কিলিয়ান এমবাপ্পে ৩৬ কিলোমিটার। তালিকায় ১০ নম্বরে থাকা বেয়ার লেভারকুসেনে খেলা জার্মানির করিম বেলারাবির গতি ৩৫.২৭ কিলোমিটার। স্বাভাবিকভাবে বিশ্ব মাতানো ফুটবলারদের চেয়ে পিছিয়ে আছেন বাংলাদেশের সুফিল। তবে তাঁর পরিসংখ্যানটা বিশ্বমানের বলেই জানালেন মারুফুল।

কথাটা ফেলনার নয়, সে প্রমাণটাও পাওয়া গেল সহজেই। রাশিয়া বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গতিতে দৌড়ানো ৫০ জন ফুটবলারের তালিকায় শেষ ১৫ জনের গতি সুফিলেরই সমান ৩২.০৪ কিলোমিটার। ১৫ জনের সে তালিকায় আছেন আর্জেন্টিনার ফরোয়ার্ড পাভোন, ফ্রান্সের এমবাপ্পে ও গ্রিজমানের মতো তারকারা। সর্বোচ্চ ৩৪ কিলোমিটার গতিতে দৌড়েছেন ক্রোয়েশিয়ার ফরোয়ার্ড আন্তে রেবিচ।

সুফিলের এই গতির রহস্য তাঁর মুখ থেকেই শুনুন, আমি ছোটবেলা থেকেই অনেক জোরে দৌড়াই। সাধারণত অনুশীলনে স্পিড ওয়ার্কের সময় অনেকেই ঢিলেমি করে। কিন্তু আমি সব সময় সেরাটা দিয়েই দৌড়াই। কখনো দ্বিতীয় হওয়ার জন্য দৌড়াই না। আমার লক্ষ্য সব সময় প্রথম। সেই ছোটবেলা থেকেই, যা এখনো আছে।

শুধু গতি দিয়েই তাক লাগান না শ্রীমঙ্গলের ছেলে, দুর্দান্ত গোল করতেও জুড়ি নেই তাঁর। গত বছর সেপ্টেম্বরে ঘরের মাঠে সাফ ফুটবলে ভুটানের বিপক্ষে আন্তর্জাতিক দ্বিতীয় ম্যাচেই চোখজুড়ানো গোল করেছিলেন। সতীর্থ মিডফিল্ডার ইমন বাবুর লব বক্সের ডান প্রান্তে পড়তেই গতিতে ভুটানিজ ডিফেন্ডারদের পেছনে ফেলে ভলি, দূরের পোস্ট দিয়ে বল জালে। বাংলাদেশের স্ট্রাইকারদের বল প্রথম দফায় নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পরও ঠিকঠাক পোস্টে রাখতে না পারার বদনাম আছে। সেখানে সুফিল প্রথম স্পর্শেই বল সরাসরি জড়িয়ে দিলেন জালে! তাও একটু দুরূহ কোণ থেকে।

এর আগে মার্চে লাওসের বিপক্ষে অভিষিক্ত হওয়া ম্যাচেও করেছিলেন গোল। সুফিলের গায়ে জাতীয় দলের জার্সি তুলে দিয়েছিলেন অ্যান্ড্রু ওর্ড। ভিয়েনতিয়েনের সে ম্যাচে ২-১ গোলে হারের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছিল বাংলাদেশ। কিন্তু ৯২ মিনিটে ত্রাণকর্তা হয়ে হাজির বদলি নামা অভিষিক্ত সুফিল। নতুন জার্সির ঘ্রাণ গায়ে লেগে থাকতে থাকতে গোল করে বাংলাদেশকে ফিরিয়েছিলেন সমতায়।

নিশ্চয় ভুলে যাওয়ার কথা নয়, কদিন আগে শেষ হওয়া এশিয়ান গেমসের কথা। সেখানেও করেছিলেন এক গোল। থাইল্যান্ডের বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র হওয়া ম্যাচে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়েছিলেন তিনিই। সিনিয়র বা অনূর্ধ্ব-২৩ দল ছাড়াও বয়সভিত্তিক অন্য জাতীয় দলেও তাঁর পায়ে গোল দেখা গেছে নিয়মিতই। গত বছর ভুটানে অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-১৮ সাফে ভারতের বিপক্ষে ৩-০ গোলে পিছিয়ে পড়ে ৪-৩ গোলে ম্যাচ জয়ের কথাও নিশ্চয়ই ভোলেননি? ওই ম্যাচে সমতাসূচক গোলটি এসেছিল তাঁর হেডেই। তাজিকিস্তানে অনুষ্ঠিত এএফসি অনূর্ধ্ব-১৯ বাছাই পর্বেও তিন ম্যাচ খেলে গোল করেছিলেন ৩টি। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৪-০ গোলের জয়ের ম্যাচে জোড়া গোল এসেছিল সুফিলের পা থেকে। আর মালদ্বীপের বিপক্ষে তাঁর একমাত্র গোলেই জয় পেয়েছিল বাংলাদেশ।

সুফিলের গল্প শেষ করার আগে আন্তর্জাতিক অভিষেক ম্যাচে গোল করা রবিউলের গতির পরিসংখ্যানটা জেনে নেওয়া যাক। এই বিচারে সুফিলের চেয়ে অনেক পিছিয়ে আছেন তাঁর বন্ধু রবিউল। আরামবাগের বর্তমান অধিনায়ক সেকেন্ডে সর্বোচ্চ ৭.৭৯ মিটার দৌড়াতে পারেন আর ঘণ্টায় ২৮.০৪ কিলোমিটার। স্পষ্টত আরামবাগের সাবেক অধিনায়কের চেয়ে অনেক পিছিয়ে আছেন বর্তমান অধিনায়ক। তবে আরও ভালো খবর হলো, সুফিলের চেয়েও বাংলাদেশে দ্রুত গতির ফুটবলার আছেন। তাঁর গল্পটা তোলা থাকল আগামীকালের জন্য।