উপজেলায় প্রার্থী বাছাই, উপেক্ষিত কেন্দ্রের নির্দেশনা

 

উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস-চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস-চেয়ারম্যান পদে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে কেন্দ্রের নির্দেশনা তৃণমূল মানছে না।

কাউন্সিলরদের মতামতকে তোয়াক্কা না করে এমপিরা একক সিদ্ধান্তে প্রার্থীর তালিকা কেন্দ্রে পাঠাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে ত্যাগী নেতারা বাদ পড়ছেন, সুসময়ের কোকিল, মাদক ব্যবসায়ী ও সম্পদশালীরা গুরুত্বপূর্ণ এই নির্বাচনে সুবিধা পাচ্ছেন।

৫ ধাপে সারা দেশের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ইতোমধ্যে ১০ মার্চ প্রথম ধাপে ৮৭ উপজেলায় নির্বাচনের তফসিল দিয়েছে ইসি।

এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ, দলীয় প্রার্থীদের মধ্যে মনোনয়ন ফরম বিক্রি করছে। একইসঙ্গে দলটির তৃণমূলকে প্রার্থীদের তালিকা প্রেরণ করতে নির্দেশ দিয়েছে।

জেলা-উপজেলা কমিটির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক অথবা আহ্বায়ক-যুগ্ম আহ্বায়কের কাছে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, উপজেলা নির্বাচনের প্রতিটি পদে একক অথবা তিনজন প্রার্থীর নামের সুপারিশ-সংবলিত একটি প্যানেল তৈরি করতে হবে। দলের উপজেলা শাখা প্রতিটি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে বর্ধিত সভা করে এ প্যানেল তৈরি করে দলের জেলা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কাছে পাঠাবে। এরপর জেলা আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট সব উপজেলার প্রার্থী তালিকা আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে পৌঁছে দেবে। এই প্রার্থী তালিকা জেলা ও উপজেলা শাখার সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক অথবা আহ্বায়ক ও যুগ্ম-আহ্বায়কদের যৌথ স্বাক্ষরসহ পাঠাতে হবে।

কেন্দ্রীয়ভাবে আওয়ামী লীগের এ নির্দেশনা মানছেন না বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা নেতারা। কিছু জায়গায় বর্ধিত সভা পর্যন্ত করা হয়নি। কোথাও আবার বর্ধিত সভা করে তৃণমূলের ভোট নিলেও তালিকায় তার প্রতিফলন ঘটেনি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এমপি বা স্থানীয় প্রভাবশালী নেতার ব্যক্তিমতকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। এতে অজনপ্রিয়, মাদক ব্যবসায়ী বা সুসময়ের দলে ভেড়া লোকেরা প্রাধান্য পেয়েছেন।

ঠাঁই পাননি সর্বাধিক ভোট পাওয়ারা
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, টাঙ্গাইলের সদর উপজেলায় মনোনয়নের বর্ধিত সভায় প্রার্থী ঠিক করা নিয়ে কাউন্সিলরদের মধ্যে ভোট হয়। এতে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন খান (তোফা) ২২ ভোট, যুগ্ম-সম্পাদক শাহজাহান আনসারী ১৮ ভোট ও ৮ ভোট পেয়েছেন যথাক্রমে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বর্তমান চেয়ারম্যান খোরশেদ আলম এবং জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সাইফুজ্জামান সোহেল।

অথচ কেন্দ্রে পাঠানো তালিকায় সবচেয়ে কম ভোট পাওয়া সোহেল ও খোরশেদকে ১ ও ২ নম্বরে রাখা হয়। তৃতীয় নম্বরে রাখা হয় কম ভোট পাওয়ার দিক থেকে দ্বিতীয় শাহজাহান আনসারীকে। সর্বাধিক ভোট পাওয়া তোফাজ্জল হোসেন খানের নাম তালিকাতেই নেই।

তালিকার শীর্ষে মাদক কারবারি
কুমিল্লার ব্রাক্ষণপাড়া উপজেলায় বর্ধিত সভায় কোনো ভোট হয়নি। সেখানে স্থানীয় এমপি চেয়ারম্যান পদে যে তিনজনের নাম ঘোষণা করেছেন, তাই কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। আর এই তালিকার এক নম্বরে স্থান পেয়েছেন স্থানীয়ভাবে মাদক কারবাবি হিসেবে পরিচিতি জাহাঙ্গীর খান চৌধুরী।

জানা গেছে, ২০১৮ সালের ৯ জানুয়ারি চট্টগ্রাম বিভাগের কয়েকটি জেলার অবৈধ মাদক চোরাকারবারী/পাচারকারী, এদের পৃষ্ঠপোষক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জড়িত সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেয়া হয়।

এর মধ্যে কুমিল্লা জেলার অবৈধ মাদক ব্যবসায়ী/চোরাকারবারিদের পৃষ্ঠপোষক/আশ্রয়-প্রশ্রয়দানকারী ১৬ জনের নামের তালিকা ছিল। তালিকার ১২ নং ক্রমিকে জাহাঙ্গীর খান চৌধুরীর নাম রয়েছে।

এ ছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশনেও (দুদক) জাহাঙ্গীর খান চৌধুরীর বিরুদ্ধে ব্রাক্ষণপাড়া উপজেলায় মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ আছে। ২০১৮ সালের ১৩ আগস্টে এ অভিযোগ গ্রহণ করে দুদক।

এ ছাড়া মনোনয়নের তালিকায় ২ ও ৩ নম্বরে স্থান পেয়েছেন অ্যাডভোকেট এমএ বারী ও মুহাম্মদ আবু তাহের।

শুধু টাঙ্গাইল সদর ও কুমিল্লার ব্রাক্ষণপাড়া নয়, দেশের বেশিরভাগ জেলার উপজেলাগুলোতে একই অবস্থা। সংগঠনের নির্দেশ অনুযায়ী কেউ বর্ধিত সভা করেনি বা করলেও সবার ঐক্যমতের প্রার্থী দেয়ার বিষয়টি মানা হয়নি। যার কারণে নিজেদের সিদ্ধান্ত বদল করেছে আওয়ামী লীগ।

দলটি তৃণমূলের তালিকায় থাকা লোকদের কাছে মনোনয়ন ফরম বিক্রি করার ঘোষণা দিলেও এটি এখন সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছে।

এ বিষয়ে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেছেন, ‘উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে তৃণমূলের মনোনয়নে অনিয়ম হলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

সোমবার মনোনয়ন ফরম বিক্রির সময় দলীয় সভাপতির ধানমন্ডির কার্যালয়ে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘ফরম কেনাটা আমরা ওপেন করে দিয়েছি। ফরম কেনা তো নমিনেশন পাওয়া না। তাই সেটা আমরা ওপেন করে দিয়েছি।’