আশুলিয়ায় শ্রমিকদের কাজে যোগদানে পুলিশের মাইকিং, ২০ কারখানা বন্ধ

আশুলিয়া প্রতিনিধি : গার্মেন্ট শ্রমিকদের ঘোষিত মজুরি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে ৬ গ্রেডে বেতন বাড়ানো হয়েছে। এমন সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে আশুলিয়ায় ঢাকা জেলা পুলিশের উদ্যোগে শ্রমিকদের কাজে যোগদানের জন্য মাইকিং চলছে। এতে আশুলিয়ার অধিকাংশ কারখানার শ্রমিকরা কাজে যোগদান করলেও কতিপয় কারখানার শ্রমিকরা কর্মস্থলে কাজে যোগদান করেননি এবং কিছু কারখানায় যোগদান করলেও তারা উৎপাদন বন্ধ রেখে বিশৃঙ্খলা ছাড়াই কারখানা থেকে বের হয়ে চলে যান। এমন পরিস্থিতিতে মাহমুদ ফ্যাশন ওয়্যার নামে একটি পোশাক কারখানার ৪০ শ্রমিককে ছাঁটাইয়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ওই শ্রমিকদের নামে ভাংচুরের অভিযোগে আশুলিয়ায় থানায় মামলা হয়েছে বলেও জানা গেছে।

আজ সোমবার শিল্পাঞ্চল আশুলিয়ার বিভিন্ন এলাকার প্রাপ্ত তথ্যমতে উল্লেখিত বিষয় সম্পর্কে জানা যায় এবং বাড়ইপাড়া এলাকার মাহমুদ ফ্যাশন ওয়্যার লিমিটেড নামে একটি পোশাক কারখানার ১২ শ’ শ্রমিকের মধ্যে ভাংচুরের সঙ্গে জড়িত থাকার অপরাধে ৪০ শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

সকাল থেকে ঢাকা জেলা পুলিশ-এর উদ্যোগে জামগড়া, বেরণ, নরসিংহপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং করে শ্রমিকদের কাজে যোগদানের জন্য বলা হয়। ঘোষণায় বলা হয়, ‘এতদ্বারা শান্তিপ্রিয় গার্মেন্টস শ্রমিক ভাই বোনদের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, আপনাদের দাবি বিবেচনা করে সরকার বিভিন্ন পর্যায়ে বেতন বৃদ্ধি করা হয়েছে। সুতরাং আপনারা আপনাদের কর্মস্থলে কাজে যোগদান করেন। যারা কাজ করবেন তারা বেতন পাবেন। আর যারা কাজ না করে যত্রতত্র ঘোরাফেরা করছেন তাদের নামের তালিক তৈরি হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এখনও যারা কাজে যোগ দেননি তারা দ্রুত কাজে যোগদান করুন। আর যারা কাজ করবেন না তারা আশুলিয়া অঞ্চল ছেড়ে চলে যান। কোনক্রমেই বিশৃঙ্খলা করবেন না। ঢাকা জেলা পুলিশ আপনাদের সাথে রয়েছেন।’ এ আহ্বানে সাড়া দিয়ে আশুলিয়ার অধিকাংশ পোশাক কারখানার শ্রমিকরা তাদের কাজে যোগদান করেছেন।

তবে শিল্পাঞ্চল আশুলিয়ায় সোমবারও কমপক্ষে ২০টি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা কাজে যোগদান করেনি। কারখানাগুলো হলো-হলিউড গার্মেন্টস, বাড্স গ্রুপ, সফি নিট প্লাস, ফাউনটেন কারখানার ৫০% কাজে যোগদান করেনি, হিয়ন এ্যাপারেলস, শারমিন গ্রুপ, ডেকো গ্রুপ, বন্ধু গার্মেন্টস, আনজুম, ইথিক্যাল, উইন্ডি, এএম ডিজাইন, স্টার্লিং অ্যাপারেলস, স্টালির্ং ক্রিয়েশন, ইয়াগি বাংলাদেশ, নাসা গ্রুপ, নিউএজ, সেতারা গ্রুপ, পলমল গ্রুপ, সাফা নিট ওয়্যারসহ প্রায় ২০-২৫টি পোশাক কারখানা।

আশুলিয়ায় যে সকল কারখানার শ্রমিকরা তাদের কারখানার অভ্যন্তরে ভাংচুর ও বিশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে এমন গুরুতর অভিযোগে আশুলিয়া থানায় ৬টি মামলা দায়ের হয়েছে। যেসকল কারখানা মামলা করেছে তারা হলো-বাড়ইপাড়া এলাকার মাহমুদ নিট ওয়্যার লিঃ, নরসিংহপুর এলাকার নিট এশিয়া, হা-মীম গ্রুপ, এ আর জিন্স লিঃ, জিরাবো এলাকার অরবিট ফ্যাশন লিঃ ও গোরাট এলাকার শিন শিন গার্মেন্টস লিঃ। এতে জ্ঞাত অজ্ঞাত প্রায় কয়েক হাজার শ্রমিককে আসামী করা হয়েছে।

এদিকে বাড়ইপাড়া এলাকার মাহমুদ নিট ফ্যাশন লিমিটেড এর শ্রমিকরা বলেন, সোমবার সকালে কাজে যোগদান করতে গেলে তারা প্রধান গেটে ৪০ শ্রমিককে ছাঁটাইয়ের নোটিশ দেখতে পান। এছাড়া আরো অনেক শ্রমিকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে বলে তারা জানতে পেরেছেন। তারা আরো বলেন, এমন সাজানো অভিযোগে ৪০ জন শ্রমিকের বিরুদ্ধে ছাঁটাইয়ের নোটিশ সাঁটিয়ে দিয়েছে কারখানা কর্তৃপক্ষ তা তাদের মনগড়া। মূলত কারখানাটিতে ভাংচুরের কোন ঘটনা ঘটেনি। তবে বেতন বৈষম্য ও বেতন বৃদ্ধির আন্দোলনে তারা অগ্রণী ভূমিকায় ছিল। এতে শ্রমিকদের মাঝে ব্যাপক আতঙ্ক বিরাজ করছে। কারখানা কর্তৃপক্ষের অপর একটি নোটিশে বলা হয়, কারখানার সকল কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শ্রমিকদের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, ১৪ জানুয়ারি, সোমবার থেকে কারখানার সকল শাখা ওয়াশিংসহ কার্যক্রম চালু থাকবে। তাই সকলকে কারখানায় উপস্থিত হয়ে কাজে যোগদানের জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। নোটিশ সত্ত্বেও মামলা আতঙ্কে শ্রমিকরা কাজে যোগদান করেনি বলেও জানায়।

নিট এশিয়ার শ্রমিকরা জানান, শ্রমিকদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা হয়েছে। এ আতঙ্কে তারা কাজে যোগদানের ব্যাপারে ভীতির মধ্যে রয়েছেন। একই অবস্থা বিরাজ করছে যেসকল কারখানার শ্রমিকদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তাই তারা নিজেদেরকে পুলিশী হয়রানি থেকে রক্ষা পেতেই কাজে যোগদান করেননি।

জানতে চাইলে, শিল্প পুলিশ-১ এর পরিচালক সানা সামিনুর রহমান শামীম বলেন, অধিকাংশ কারখানার শ্রমিকরা কাজে যোগদান করেছেন। কিছু কারখানার শ্রমিকরা কাজে যোগদান করেননি। আশা করি তারাও কাজে যোগদান করবেন। শিল্প এলাকায় অনাকাঙ্খিত ঘটনা এড়াতে পোশাক কারখানার সামনে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন রয়েছে।

এদিকে আশুলিয়ায় কয়েকটি শ্রমিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ শ্রমিকদের বেতন বৈষম্য নিরসন করে গ্রেড অনুযায়ী বেতন বৃদ্ধি করায় সরকারকে ধন্যবাদ জানান। সোমবার বিকেলে আশুলিয়া প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে সরকারকে ধন্যবাদ জানানোর পাশাপাশি সাভার আশুলিয়ার সকল পোশাক কারখানার শ্রমিকদের কাজে যোগদানের জন্য আহ্বান জানান। সংগঠনগুলো হলো-বাংলাদেশ বস্ত্র ও পোশাক শ্রমিক লীগ, স্বাধীন বাংলা গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন, জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন, জাগো বাংলা গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন, বাংলাদেশ টেক্সটাইল এন্ড গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন, ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র, রেডিমেট গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন, পোশাক শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র, তৃণমূল গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনসহ ১৫টি শ্রমিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।