ফেসবুকে পরিচয়, প্রেম, অতঃপর…

মেয়েটি কলেজে পড়ত। এই অল্প বয়সেই তার জীবনে এমন গল্প তৈরি হয়েছে, যা নাটকীয়তায় ভরা কোনো সিনেমার কাহিনিকেও হার মানায়।

ফেসবুকে ভুয়া আইডির এক ছেলের সঙ্গে প্রেম হয় মেয়েটির। একটানা দেড় বছর কথা হয় ফেসবুকে। একদিন ছেলেটা জানায়, সে খুব অসুস্থ। হাসপাতালে ভর্তি। প্রেমের টানে মেয়েটি একা কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামে ছুটে যায়। সেখানে গিয়েই প্রথম জানতে পারে, ফেসবুকে যার সঙ্গে প্রেম, প্রোফাইলে যে ছবি, তার সঙ্গে বাস্তবে দেখা ছেলেটির কোনো মিল নেই। এস কে আরিফ নামের যে ছেলেটির সঙ্গে প্রেম, আসলে সে আবদুল্লাহ। এরপর থেকেই মেয়েটির জীবনের গল্প নানা চড়াই-উতরাইয়ে ঘুরপাক খেতে থাকে।

গত ২৭ নভেম্বর দুপুরের পর রাজধানীর সায়েদাবাদে শ্যামলী বাস কাউন্টারে মেয়েটিকে পাওয়া যায়। সে সময় তার গায়ে ছিল কালো একটি বোরকা। পরনে ছিল লাল টুকটুকে বিয়ের শাড়ি। মাথায় টিকলি, গলা ও কানে সিটি গোল্ডের বড় বড় গয়না।

মেয়েটি প্রায় অচেতন অবস্থায় ছিল। শুধু বুক চাপড়াচ্ছিল, মুখ ফুটে কিছু বলতে পারছিল না। এভাবেই সেদিন মেয়েটিকে উদ্ধারের বর্ণনা দিলেন যাত্রাবাড়ী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ জহুরুল ইসলাম।

জহুরুল ইসলামের তথ্যমতে, মেয়েটির সঙ্গে একটি ব্যাগ ও একটি লাগেজ ছিল। তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করার পর চিকিৎসকেরা তার পাকস্থলী ওয়াশ করে জানান, হাসপাতালে নিতে দেরি হলে বড় কোনো অঘটনও ঘটে যেতে পারত। হাসপাতালে মেয়েটিকে ভর্তি করা হয়।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসায় মেয়েটি কিছুটা সুস্থ হলেও তখনো সে তার জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনা মনে করতে পারছিল না। তখন হাসপাতাল থেকে আবার থানার হস্তান্তর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

মেয়েটি ফেসবুকে প্রতারণার শিকার হয়েছে বটে, তবে ফেসবুকের মাধ্যমেই মেয়েটিকে উদ্ধারে এগিয়ে আসেন একজন। তিনি যমুনা ব্যাংকের ফার্স্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট শামীম আহমেদ। ফেসবুকেই এক শুভাকাঙ্ক্ষী শামীম আহমেদকে বধূ বেশে মেয়েটির উদ্ধারের ছবি পাঠিয়ে দেন। কিন্তু পারিবারিক দায়িত্বের কারণে তখনই তিনি মেয়েটির কাছে যেতে পারেননি। তারপর যখন মেয়েটিকে হাসপাতাল থেকে থানায় হস্তান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়, তখন শামীম আহমেদ হাসপাতালে গিয়ে জানান, মেয়েটিকে তিনি সাহায্য করতে চান এবং পরিবারকে খুঁজে বের করে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করবেন।

তারপর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পুলিশ ফাঁড়িতে লিখিত মুচলেকা দিয়ে যাত্রাবাড়ী থানার মাধ্যমে মেয়েটিকে নিজ জিম্মায় নেন শামীম আহমেদ।

শামীম আহমেদ রাস্তায় পড়ে থাকা মানসিক প্রতিবন্ধী একাধিক নারী ও শিশুর চিকিৎসা এবং চিকিৎসা শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে বেশ পরিচিতি পেয়েছেন। বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান থেকে পেয়েছেন স্বীকৃতি।

মেয়েটি কানে কিছু শুনত না। কোনো কিছু লিখে দিলে সে লিখেই উত্তর দিত। যাত্রাবাড়ী থানা থেকে শামীম আহমেদ মেয়েটিকে নিয়ে যান আরেকটি বেসরকারি হাসপাতালে। মেয়েটিকে ভর্তি করেন কানের চিকিৎসার জন্য। সে হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক মেয়েটির কান পরীক্ষা করে জানান, মেয়েটির কানে কোনো সমস্যা নেই। বিষজাতীয় কিছু খাওয়ানোর ফলে মেয়েটি কিছু মনে করতে পারছে না এবং কথা শোনায় সমস্যা হচ্ছে। প্রস্রাবের সঙ্গে বিষ বের হয়ে গেলে মেয়েটি আস্তে আস্তে শুনতে পাবে, তাই তাকে হাসপাতালে ভর্তি করার প্রয়োজন নেই।

মেয়েটিকে কোথায় রাখবেন, তা নিয়ে শামীম আহমেদ বিপাকে পড়েন। পরে স্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করে মেয়েটিকে রাজধানীর আদাবরে নিজের বাসায় নিয়ে যান ৩ ডিসেম্বর। পারিবারিক পরিবেশে থাকার পর মেয়েটি আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হতে থাকে। একপর্যায়ে কানে শুনতে পায় এবং অজ্ঞান হওয়ার আগ যা যা ঘটেছিল, সবই মনে পড়ে।

আজ বুধবার সকালে শামীম আহমেদের বাসায় বসে কথা হয় মেয়েটির সঙ্গে। সে এখন বেশ স্বাভাবিক। জানাল, আবদুল্লাহ (ফেসবুকেও এ নামে আইডি আছে) নামের এক ছেলেকে বিয়ে করতে বাধ্য হয়। ফেসবুকে পরিচয়ের সূত্রে প্রেম। প্রেমিকের অসুস্থতার খবরে তাকে দেখতে গিয়ে ফাঁদে পড়ে সে। বন্ধুর বাসায় চার দিন মেয়েটিকে আটকে রেখে শারীরিক সম্পর্ক করতে বাধ্য করে ছেলেটি। চার দিন পর মেয়েটি বাড়ি ফেরে। এ সময় ছেলেটিও সঙ্গে ছিল।

মেয়ের আবার পরিবারে সমস্যা। বাবা মারা গেছেন। দুই ভাই আলাদা থাকেন। মা আর ছোট এক বোনকে নিয়েই মেয়েটির সংসার। ছেলেটির সঙ্গে বাড়ি ফিরলে এলাকার লোকজন ছেলেটির সঙ্গেই বিয়ের আয়োজন করেন। এটা তিন-চার মাস আগের ঘটনা। ছেলেটিও বিয়েতে রাজি হয়। তারপর বিয়ে করা বউকে নিয়ে ছেলেটি চট্টগ্রামে ফিরে যায়।

ছেলের মা যৌতুক ছাড়া মেয়েটিকে বাড়ির বউ বলে মেনে নিতে রাজি হননি। ছেলেটি মেয়েকে নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যেতে বাধ্য হয়। পরে মেয়েটিকে নিয়ে আরেক বাসায় ওঠে সে। যৌতুকের জন্য চাপ দেয়। চলে নির্যাতন। এরপর একদিন কিছু না বলে ছেলেটি হাওয়া। ছেলেটি উধাও হয়ে যাওয়ার পর বিচার ও সালিসের আশ্বাসে এগিয়ে আসা একজন মেয়েটিকে তাঁর বাসায় নিয়ে যান।

ওই লোক মেয়েটির সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক গড়তে চান। মেয়েটি মাকে ফোন করে জানান ঘটনা। আবার ছেলেটির বাসায় ঢোকার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয় মেয়েটি। তারপর মেয়েটি অনেক সংগ্রাম করে আবার কক্সবাজারে ফিরে যায়। এর দুই সপ্তাহের মাথায় ছেলেটি আবার ফোন করে বলে, মা আটকে রাখায় এত দিন সে যোগাযোগ করতে পারেনি। আবার সে সংসার শুরু করতে চায়। মেয়েটি আবার ছেলেটির ফাঁদে পা দেয়।

ছেলের কথা অনুযায়ী সাজগোজ করে লাগেজ নিয়ে বাড়িতে কাউকে না বলে বেরিয়ে পড়ে মেয়েটি। মেয়েটি জানত, তাকে চট্টগ্রামে নিয়ে যাচ্ছে স্বামী। তবে পরে জানতে পারে, সে ঢাকায় এসেছে। পথে মেয়েটিকে স্বামী জোর করে অনেক কিছু খাওয়ায়। বাসস্ট্যান্ডে নামার পর ছেলেটি কৌশলে আবার উধাও হয়ে যায়। মেয়েটি ব্যাগ খুলে দেখে, তার মুঠোফোন আর সঙ্গে করে আনা ১৩ হাজার টাকাও নিয়ে গেছে স্বামী।

এরপরই মেয়েটি বুঝতে পারে, তার চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। এরপর আর কিছু মনে নেই। হাসপাতালে জ্ঞান ফেরার পরও অনেক কথাই সে মনে করতে পারেনি। তবে আস্তে আস্তে তার সবকিছু মনে পড়ছে।

শামীম আহমেদ জানান, ফেসবুকেই পোস্ট দিয়ে মেয়েটির পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়েছে। মেয়েটির মা ঢাকায় এসে মেয়েকে নিয়ে যাবেন। যাত্রাবাড়ী থানার মাধ্যমেই মেয়েটিকে হস্তান্তর করা হবে। মেয়েটি অপেক্ষায় আছে বাড়ি ফেরার। একই সঙ্গে জানিয়ে দিল আর কোনো মেয়ে যাতে তার মতো ফেসবুকে প্রতারণার শিকার না হয়। একইভাবে মেয়েটি চায়, তাকে বিয়ে করা ছেলেটির কঠোর শাস্তি হোক, যাতে সে আর অন্য কোনো মেয়েকে ফাঁদে ফেলতে না পারে।