যে কৌশলে বিদ্রোহ ঠেকাতে চায় বিএনপি

 দশ বছর পর সংসদ নির্বাচনে যাচ্ছে বিএনপি। তাই অনেকে এবারই প্রথম মনোনয়ন ফর্ম কিনেছেন। শো-ডাউন করে দলকে নিজের অবস্থান জানানোর চেষ্টাও করেছেন কেউ কেউ। আছে বঞ্চিত প্রার্থীদের বিদ্রোহের আশঙ্কাও।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে যায়নি বিএনপি। সংসদে তাদের কেউ ছিল না, তাই এবারের নির্বাচন নিয়ে সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস। তারা যেন ঘর ছেড়ে বাইরে আসার সুযোগ পেয়েছেন। প্রায় ১২ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকায় অনেকের মধ্যেই এবার নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় না হোক, সংসদ সদস্য হয়ে সংসদে যাওয়ার আশা জেগেছে। খবর ডয়েচে ভেলের।

গত সোমবার থেকে বিএনপি নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে মনোনয়ন ফর্ম বিক্রি ও জমা নেয়া শুরু করে। প্রথম দিন থেকেই সেখানে ছিল শত শত নেতা-কর্মী এবং মনোনয়নপ্রত্যাশীর ভিড়। তবে ছন্দপতন ঘটে বুধবার। এদিন পুলিশের সঙ্গে নয়াপল্টনে বিএনপি নেতা-কর্মীদের সংঘর্ষ হয়। তার জেরে মামলা হয়েছে তিনটি। বিএনপি নেতা নিপুণ রায় চৌধুরীসহ ৪০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এর ফলে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি হয়। তবে তা কাটিয়ে নির্বাচনি কার্যক্রম চলেছে পুরো দমে। শুক্রবার মনোনয়নপত্র বিক্রি শেষ হয়েছে। সংসদের ৩০০ আসনে মোট মনোনয়ন ফর্ম বিক্রি হয়েছে চার হাজার ৫৮০টি। প্রতি আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশী গড়ে ১৫ জনেরও বেশি।

বিএনপির মনোনয়ন ফর্মের দাম ৩০ হাজার টাকা। কেনার সময় ৫ হাজার ও জমা দিতে লাগছে ২৫ হাজার টাকা।

রবিবার থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার। গুলশানে দলের চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে এ সাক্ষাৎকার নেয়া হবে। মনোনয়ন বোর্ডে আছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যরা।

রংপুর বিভাগের পঞ্চগড় জেলার মনোনয়ন প্রত্যাশীদের প্রথমে সাক্ষাৎকার নেওয়া হবে। এরপর নেওয়া হবে রাজশাহী বিভাগের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার। বাকি বিভাগের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকারের সময় পরে জানিয়ে দেওয়া হবে।

নওগাঁ-৩ আসনে এবার বিএনপি থেকে সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপ্রত্যাশী ফজলে হুদা বাবুল। তিনি নওগাঁ জেলা বিএনপির সদস্য এবং বাদলগাছি উপজেলা বিএনপির সভাপতি। এবারই প্রথম তিনি সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে চান।

তিনি বলেন, ‘বিএনপিতে প্রার্থী অনেক হলেও দলের সিদ্ধান্ত মেনে দল যাকে মনোনয়ন দেবে, তার জন্যই কাজ করবেন সবাই। কারণ, আমরা ঐক্যবদ্ধ। আমাদের টার্গেট এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করে আনা। এই নির্বাচন আমাদের জন্য একটা চ্যালেঞ্জ। তাই দলের মধ্যে কোনো বিদ্রোহ বা অসন্তোষ হওয়ার আশঙ্কা দেখি না।’

এত প্রার্থী কেন? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘পাঁচ বছর পর আমরা নির্বাচনে যাচ্ছি। ফলে অনেকেরই প্রত্যাশা জেগেছে। আর বড় দল হওয়ায় নেতাও অনেক বেশি। তরুণ নেতৃত্বও তৈরি হয়েছে।’

কিশোরগঞ্জ-৬ আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি শরিফুল আলম। তিনি বলেন, ‘বিএনপি বড় দল আর অনেক দিন পর আমরা নির্বাচনে যাচ্ছি, তাই মনোনয়নপ্রত্যাশী বেশি হওয়াই স্বাভাবিক। কেউ কেউ নিজেকে জানান দিতেও মনোনয়ন ফর্ম কিনেছেন। আর অনেকের মধ্যে নতুন করে প্রত্যাশাও সৃষ্টি হয়েছে’।

তিনি আরেক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘মনোনয়ন বঞ্চিত হলে বিদ্রোহী হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ, আমাদের দলের চেয়ারপার্সন জেলে। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দেশের বাইরে। তাই আমাদের একটা কমিটমেন্ট আছে। আমরা একটা সংকটের মধ্য দিয়ে নির্বাচনে যাচ্ছি। তাই আমার মনে হয় না কেউ বিদ্রোহী হবেন। যাকে মনোনয়ন দেয়া হবে, তার জন্যই সবাইএক হয়ে কাজ করবেন বলে আমাদের আশা’।

মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা এরই মধ্যে দলের চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনা পেয়েছেন৷

তাদের বলা হয়েছে, এই নির্বাচনকে সংকট থেকে উত্তরণের নির্বাচন হিসেবে গ্রহণ করতে। সেই বিবেচনা করে দল যাকে মনোনয়ন দেয়, তার জন্য সবার কাজ করার নির্দেশনা আছে। বিএনপিও প্রার্থীদের নিয়ে জরিপ করেছে। কোন এলাকায় বিএনপির কোন প্রার্থী জনপ্রিয়, সেই তালিকা তাদের হাতে আছে৷

বিএনপির চেয়ারপার্সনের মিডিয়া উইংয়ের সদস্য শাইরুল কবির খান বলেন, ‘প্রত্যেক নির্বাচনি এলাকায় যে কজন মনোনয়নপ্রত্যাশী থাকবেন তাদের সবার সাক্ষাৎকার একসঙ্গে নেয়া হবে। আর তাদের দলের চেয়ারপার্সন ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নির্দেশনা জানিয়ে দেয়া হবে। ফলে আমরা মনে করি, এই সংকটের সময় দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কেউ বিদ্রোহী হবেন না’।

এবার জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যান্য দল গণফোরাম, জেএসডি, নাগরিক ঐক্য, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করবে। অন্যদিকে ২০ দলীয় জোটও আছে। এই জোটের জামায়াত স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করবে। এ সব হিসাব-নিকাশ চূড়ান্ত করেই বিএনপি তার মনোনয়ন চূড়ান্ত করবে।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, ‘আমরা শরিকদের জন্য অবশ্যই আসন ছাড়ব৷ কতটা ছাড়ব সেটা মুখ্য নয়৷ আমরা মনে করি, ৬৫-৭০ ভাগ ভোট আওয়ামী লীগের বাইরে। সেই হিসেব করেই আমরা প্রার্থী দেবো, যাতে ৩০-৩৫ ভাগ ভোটের বাইরে যে ভোট আছে, সেইসব ভোটই আমাদের দিকে আসে। শুধু জামায়াত কেন, আমরা আরো অনেক বিষয় বিবেচনা করছি। ভোটের নয়, যাদের বুদ্ধিবৃত্তিক কাজে প্রয়োজন আছে, তাদেরও আমরা ছাড় দেবো’।

এবার বিএনপিতে মনোনয়নপ্রত্যাশী বেশি হওয়ার চারটি কারণ জানান তিনি৷

তিনি বলেন, ‘আগের নির্বাচন আমরা করিনি। পাঁচ বছর পর নির্বাচন করছি। ফলে স্বাভাবিক কারণেই প্রার্থী বেশি। অনেকেই যারা ছাত্রদল বা যুবদল করেছেন, তাদের নির্বাচনে এখন প্রার্থী হওয়ার বয়স হয়েছে। তারাও প্রার্থী হতে চান। বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া জেলে। তাই তরুণদের একটি অংশ এই নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে প্রার্থী হতে চায়। বিএনপি তো দল হিসেবে ঐক্যবদ্ধ আছে। আন্দোলনের অংশ হিসেবে নির্বাচনে যাচ্ছে। তাই অনেকে লড়াইয়ের অংশ হিসবেই প্রার্থী হতে চান’।

জানা গেছে, মনোনয়ন নিয়ে যাতে দলে কোনো বিদ্রোহ না হয়, সেজন্য বেশ কয়েকটি কৌশল নিয়েছে বিএনপি৷

সেগুলো হলো:
১. একটি আসনের সব মনোনয়নপ্রত্যাশীকে ডেকে একসঙ্গে কথা বলে মনোনয়ন চূড়ান্ত করা
২.নির্বাচনকে দলের সংকট উত্তরণের একটি উপায় হিসেবে তুলে ধরা
৩. স্থানীয় জরিপে কার কী অবস্থান তা তুলে ধরা এবং
৪. দলের চেয়ারপার্সন এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সনের ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচন করার নির্দেশ জানিয়ে দেয়া

শামসুজ্জামান দুদু বলেন, ‘প্রত্যেক আসনে প্রথম চার জন মনোনয়নপ্রত্যাশী কারা হতে পারেন তা তো আমাদের জানা আছে। এরপর আমাদের একটা পরিসংখ্যান আছে। আমরা যদি একটি আসনের মনোনয়নপ্রতাশীদের একসঙ্গে বসিয়ে সিদ্ধান্ত দিয়ে দেই তাহলে আশা করি বিদ্রোহী প্রার্থী কেউ হবেন না’।